ঘুমধুম সীমান্তে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে ৩ বাংলাদেশি নিহত: এলাকায় তীব্র আতঙ্ক
জাতীয় ও সীমান্ত ডেস্ক, দিগন্ত বাংলা নিউজ:
বাংলাদেশ ও মিয়ানমার অরক্ষিত সীমান্ত এলাকায় আবারও ঘটল এক ভয়াবহ ও মর্মান্তিক ল্যান্ডমাইন বা স্থল মাইন বিস্ফোরণের ঘটনা। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন ৪২ নম্বর পিলার এলাকায় এই শক্তিশালী মাইন বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই তিন নিরপরাধ বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন। রবিবারের এই আকস্মিক ও নৃশংস ঘটনার পর থেকে সমগ্র সীমান্ত জুড়ে স্থানীয় পাহাড়ি ও সমতল অধিবাসীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক, উদ্বেগ এবং চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। সীমান্ত সুরক্ষায় নিয়োজিত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থল ও তার আশেপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করেছে এবং সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থানে রয়েছে।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, আজ রবিবার (২৪ মে) বিকেল আনুমানিক ৩টার দিকে ঘুমধুম ইউনিয়নের প্রত্যন্ত ফাত্রাঝিরি গ্রামের বাইশফাঁড়ি বর্ডার অবজারভেশন পোস্ট (বিওপি) সংলগ্ন ৪২ নম্বর আন্তর্জাতিক সীমান্ত পিলারের কাছাকাছি এলাকায় এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। নিহত তিনজনই স্থানীয় বাসিন্দা এবং তারা জীবিকার তাগিদে বা পাহাড়ি সম্পদ আহরণের উদ্দেশ্যে সীমান্ত এলাকার কাছাকাছি গিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে রামিসা হত্যার বিচার সম্পন্ন হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
নিহতদের পরিচয় ও ঘটনার বিবরণ
সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে প্রাণ হারানো হতভাগ্য তিনজনই বান্দরবানের স্থানীয় ভালুকিয়া পাড়ার স্থায়ী বাসিন্দা এবং তারা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী চাকমা সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। নাইক্ষ্যংছড়ি থানা পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে নিহতদের নাম ও পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। নিহতরা হলেন—
- ১. লেঠাইয়া চাকমা (৪১): তিনি স্থানীয় বাসিন্দা সুনইয়ং চাকমার ছেলে।
- ২. অংক্যামং চাকমা (৫০): তিনি মৃত নিওমং চাকমার ছেলে।
- ৩. চিংক্যা অং চাকমা (৪০): তিনি অইমং চাকমার ছেলে।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও গ্রামবাসীরা জানান, প্রতিদিনের মতো এই তিন ব্যক্তি দুপুরের পর পাহাড়ি অঞ্চলের দিকে গিয়েছিলেন। বিকেল ৩টার দিকে আন্তর্জাতিক সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার খুব কাছাকাছি ৪২ নম্বর পিলারের পাশে পৌঁছালে বিকট শব্দে একটি স্থল মাইন বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে, আশেপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকা কেঁপে ওঠে। ল্যান্ডমাইনের স্প্লিন্টার এবং শক্তিশালী বিস্ফোরণের আঘাতে ঘটনাস্থলেই ওই তিন বাংলাদেশি নাগরিকের শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায় এবং তারা ঘটনাস্থলেই করুণ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে স্থানীয় বিজিবি ক্যাম্পের জওয়ান ও গ্রামবাসীরা দ্রুত দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান।
প্রশাসন, বিজিবি ও পুলিশের বক্তব্য
এই ন্যাক্কারজনক ও দুঃখজনক ঘটনার পরপরই বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। বিষয়টি রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর হওয়ায় বিজিবি সতর্কতার সাথে পদক্ষেপ নিচ্ছে। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বিজিবির কক্সবাজারের রামু সেক্টরের দায়িত্বপ্রাপ্ত জাঁদরেল কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ সংবাদমাধ্যমকে জানান, "ঘুমধুম সীমান্তের বাইশফাঁড়ি বিওপি সংলগ্ন এলাকায় ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে তিনজন বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার খবর আমরা পেয়েছি। বিজিবির একটি বিশেষ টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। তবে সীমান্ত এলাকার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত তদন্ত শেষে পরবর্তীতে প্রাতিষ্ঠানিক ও অফিশিয়াল ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে।"
অন্যদিকে, নাইক্ষ্যংছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাম্মেল হক ঘটনার আইনি ও উদ্ধার প্রক্রিয়ার বিষয়ে গণমাধ্যমকে ব্রিফ করেছেন। তিনি বলেন, "ঘুমধুমের দুর্গম পাহাড়ি সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণের ঘটনায় তিনজন নিহত হয়েছেন, যা অত্যন্ত মর্মান্তিক। খবর পাওয়ার সাথে সাথেই পুলিশ প্রশাসন ও বিজিবি যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্ত ও অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়ার জন্য স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে আসার কাজ চলছে। এই পাহাড়ি এলাকায় কীভাবে এবং কারা এই মাইন পুঁতে রেখেছিল, সে বিষয়ে গভীর তদন্ত করা হবে এবং আইনগত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"
সীমান্তে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর ল্যান্ডমাইন আতঙ্ক
আন্তর্জাতিক সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ল্যান্ডমাইন বা স্থল মাইন বিস্ফোরণের ঘটনা এটিই প্রথম নয়। বিগত কয়েক বছর ধরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সামরিক জান্তা বাহিনী এবং স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী 'আরাকান আর্মি'র মধ্যে চলমান তীব্র গৃহযুদ্ধের কারণে সীমান্ত পরিস্থিতি সবসময়ই অশান্ত থাকে। অভিযোগ রয়েছে, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও জেনেভা কনভেনশন সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী (তাতমাদৌ) বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন জিরো পয়েন্ট ও কাঁটাতারের বেড়ার একদম গা ঘেঁষে বিপুল পরিমাণ শক্তিশালী অ্যান্টি-পার্সোনেল ল্যান্ডমাইন বা স্থল মাইন এবং আইইডি (IED) পুঁতে রেখেছে।
মূলত রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা ও অন্যান্য নাগরিকদের বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোধ করতে এবং আরাকান আর্মির গেরিলা আক্রমণ প্রতিহত করতে মিয়ানমার জান্তা এই মাইন ফিল্ড তৈরি করেছে। কিন্তু এই আন্তর্জাতিক অপরাধের বলী হতে হচ্ছে নিরীহ বাংলাদেশি পাহাড়ি নাগরিকদের। জঙ্গল থেকে লাকড়ি কুড়াতে, বাঁশ কাটতে বা গরু-মহিষ চরাতে গিয়ে অসাবধানতাবশত এই সব মাইন লাইনে পা দিলেই মুহূর্তের মধ্যে প্রাণ হারাচ্ছেন বাংলাদেশিরা। অতীতেও এই ঘুমধুম, তুমব্রু ও আশারতলী সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে বহু বাংলাদেশি অঙ্গ হারিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন এবং অনেকে নিহত হয়েছেন। রবিবারের এই তিন খুনের ঘটনা সীমান্ত সুরক্ষায় নতুন করে বড় ধরণের উদ্বেগের জন্ম দিল। ঘটনার পর থেকে ঘুমধুম ও ফাত্রাঝিরি গ্রামের সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে গভীর আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
সূত্র: বিজিবি রামু সেক্টর ও স্থানীয় থানা পুলিশ প্রশাসন


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।