প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘ আলোচনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি পদে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে চূড়ান্ত মনোনয়ন প্রদান করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট ২০২৬) সকালে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত দলের শীর্ষ ও জ্যেষ্ঠ নীতিনির্ধারক মহলের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এই যুগান্তকারী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সকাল ৯টার দিকে অত্যন্ত গোপনীয়তা ও গুরুত্বের সাথে এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক সূত্রে পরবর্তীতে নিশ্চিত করা হয় যে, দলের শীর্ষ নেতৃত্ব সর্বসম্মতিক্রমে মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে প্রার্থী করার ব্যাপারে চূড়ান্ত ঐকমত্যে পৌঁছেছে।
আরও পড়ুন: কাজিপুরে ২০ পিস ইয়াবাসহ যুবক আটক, ৬ মাসের কারাদণ্ড
এদিকে দলীয় প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত হওয়ার পরপরই দুপুরের দিকে সচিবালয়ে উপস্থিত সংবাদকর্মী ও সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য নিশ্চিত করেন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার স্বার্থে এবং রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পাওয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর বর্তমান সরকারি ও দলীয় পদসমূহ থেকে পদত্যাগ করেছেন। তিনি একযোগে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর পদ, বিএনপির মহাসচিব পদ এবং দলের মূল নীতিনির্ধারক ফোরাম স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। তাঁর এই আত্মত্যাগী ও নজিরবিহীন পদক্ষেপে রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আরও পড়ুন: বেগমগঞ্জে ৯৯৯-এ কলে পর্নোগ্রাফি চক্রের ৫ সদস্য গ্রেপ্তার, ৪ তরুণী উদ্ধার
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত কিছুদিন ধরেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন তা নিয়ে নানা গুঞ্জন ও চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছিল। সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় বেশ কয়েকটি নাম শোনা গেলেও শেষ পর্যন্ত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামই সবচেয়ে জোরালোভাবে সামনে আসে এবং আজ দলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তা ঘোষিত হলো। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা প্রতিকূলতা, জেল-জুলুম এবং রাজপথের আপসহীন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে দলের অন্যতম অপরিহার্য নেতায় পরিণত করেছেন। ২০১১ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিলে তাঁকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। বিশেষ করে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ কারাবন্দিত্ব এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সুদীর্ঘ প্রবাস জীবনের কঠিন সময়ে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দলকে আগলে রেখেছিলেন এবং মূল নেতৃত্ব দান করেছিলেন।
স্বৈরাচারী ও দলীয়করণের বিগত সরকারের শাসনামলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে মির্জা ফখরুলকে অসংখ্যবার কারাবাস করতে হয়েছে। ফ্যাসিস্ট সরকারের নানামুখী নিপীড়ন, মিথ্যা মামলা ও শারীরিক হেনস্তার মুখেও তিনি দলের নেতা-কর্মীদের মনোবল ভেঙে পড়তে দেননি, বরং রাজপথে থেকে অবিচলভাবে নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন। তাঁর এই দীর্ঘ রাজনৈতিক সুদীর্ঘ পথচলা তাঁকে দেশজুড়ে এবং দলমতনির্বিশেষে একজন অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য, মার্জিত ও পরিশীলিত রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছে। পরবর্তীতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। এরপর বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং সফলভাবে তা পালন করে আসছিলেন।
উল্লেখ্য, গত ২৪ জুলাই ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত ও পলায়ন করতে বাধ্য হওয়া সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের মনোনীত রাষ্ট্রপতি মোড. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপর থেকে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করে আসছেন। দেশের প্রচলিত সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ঘোষিত সুনির্দিষ্ট নির্বাচনী তপশিল অনুযায়ী আজকের দিন অর্থাৎ ১৩ আগস্ট বিকেল ৪টার মধ্যে আগ্রহী বা মনোনীত প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার চূড়ান্ত সময়সীমা নির্ধারিত রয়েছে। মনোনয়নপত্র জমাদানের পর নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রার্থিতা যাচাই-বাছাই করা হবে এবং আগামী ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ধার্য করা হয়েছে। যদি একাধিক বৈধ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে থাকেন, তবে আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি পদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে সংসদ ভবনে ভোটাগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
এদিকে ক্ষমতাসীন দল ও জোটের বাইরে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐকমত্যের পক্ষ থেকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সম্মানিত সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমকে রাষ্ট্রপতি পদে যৌথ প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। আজ সকালের দিকে কর্নেল (অব.) অলির পক্ষে প্রয়োজনীয় স্বাক্ষর ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র দাখিল করা হয়েছে। যদি শেষ পর্যন্ত কোনো প্রার্থী নিজেদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করে না নেন, তবে প্রায় দীর্ঘ ৩৫ বছর পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর আগে ১৯৯১ সালে সর্বশেষ রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোট হয়েছিল। পরবর্তীতে বিগত প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থীরাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে অভিষিক্ত হয়ে আসছেন এবং বিরোধী দল থেকে কোনো শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী রাখা হতো না।
সংবিধানের মূল বিধান অনুযায়ী, দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন জাতীয় সংসদের সম্মানিত সংসদ সদস্যদের গোপন ভোটের মাধ্যমে। বর্তমান জাতীয় সংসদের দলীয় আসন বিন্যাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তাদের সমমনা জোটের সংসদের দুই-তৃতীয়াংশের চেয়েও অনেক বেশি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াতসহ বিরোধী জোটের পক্ষে সংরক্ষিত নারী আসনসহ সব মিলিয়ে সংসদ সদস্যের সংখ্যা মোটে ৯০ জনের কাছাকাছি। ফলশ্রুতিতে, আসন্ন নির্বাচনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হলেও বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিজয় প্রায় নিশ্চিত ও অবধারিত বলেই মনে করছেন সংসদীয় রাজনীতির অভিজ্ঞ বিশ্লেষকগণ। সব সমীকরণ মিলিয়ে দেশের পরবর্তী ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অভিষেক এখন কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
সূত্র: বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রেস উইং, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও নির্বাচন কমিশন সচিবালয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।