প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের নদীমাতৃক ও ঐতিহ্যবাহী জনপদ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত সিরাজগঞ্জ জেলার অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন জলাশয়, নদী এবং মৎস্য খামারগুলোর জীববৈচিত্র্য রক্ষা করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানোর লক্ষ্যে উপজেলা মৎস্য অফিস ও প্রশাসন সর্বদা অত্যন্ত তৎপর ও কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে। পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এবং দেশীয় প্রজাতির মাছের অস্তিত্ব ধ্বংসকারী নিষিদ্ধ ঘোষিত বিভিন্ন ধরনের বিদেশি মাছের অবাধ বিপণন রোধ করার জন্য নিয়মিত নজরদারি ও আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করা একটি অপরিহার্য প্রশাসনিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়। সিরাজগঞ্জ জেলার বিভিন্ন উপজেলা এলাকার মৎস্য সম্পদ রক্ষা করতে এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের চক্র ভেঙে দিতে মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে পরিচালিত এমনই একটি অত্যন্ত সফল, সুদূরপ্রসারী ও গঠনমূলক আভিযানিক কার্যক্রমের মাধ্যমে পুরো অঞ্চলে জনসচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষার ক্ষেত্রে এক অনন্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে, যা স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মাঝে ব্যাপক স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত এই সফল অভিযানটি অবৈধ মাছ ব্যবসায়ীদের মাঝে এক কঠোর বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।
আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জে জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে চুরি যাওয়া মোটরসাইকেল উদ্ধার করল পুলিশ
ঘটনার সম্পূর্ণ পটভূমি এবং সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জ উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে প্রাপ্ত দাপ্তরিক ও অনুসন্ধানী তথ্যাবলি থেকে বিস্তারিতভাবে জানা যায় যে, ক্যালেন্ডারের পাতা অনুযায়ী আজকের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিনটি অর্থাৎ ১৯ আগস্ট ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের বুধবার সকালেই এই বিশেষ ও সফল অভিযানটি পরিচালিত হয়েছিল। রায়গঞ্জ উপজেলার অধীনস্থ অত্যন্ত পরিচিত ও জনবহুল বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে খ্যাত রায়গঞ্জ পৌরসভার ধানগড়া মৎস্য আড়ত এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশের জন্য অত্যন্ত হুমকিস্বরূপ নিষিদ্ধ ঘোষিত আফ্রিকান মাগুর মাছ অবৈধভাবে কেনাবেচা হয়ে আসছে বলে একটি গোপন সংবাদ এসে পৌঁছায়। মৎস্য বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কাছে আসা ওই সংবাদের সত্যতা যাচাই করার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে একটি বিশেষ আভিযানিক দল গঠন করা হয়, যা মুহূর্তের মধ্যে নির্দিষ্ট লক্ষ্যস্থলের দিকে যাত্রা করে। স্থানীয় বাজারে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা চিন্তা করে এবং নিষিদ্ধ মাছের বিস্তার রোধ করতে এই অভিযানটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে পরিগণিত হয়েছে।
উক্ত সফল অভিযান পরিচালনার নেপথ্য নেতৃত্ব ও কৌশল সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে মৎস্য অফিস জানিয়েছে যে, রায়গঞ্জ পৌরসভার ধানগড়া মৎস্য আড়তে পরিচালিত এই আকস্মিক অভিযানে সরাসরি নেতৃত্ব প্রদান করেন রায়গঞ্জ উপজেলার সম্মানিত সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম। তাঁর সাথে থাকা অন্যান্য দক্ষ কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় তাঁরা অত্যন্ত সুকৌশলে আড়তের প্রতিটি কোণায় তল্লাশি চালান এবং সন্দেহভাজন স্থানগুলো খতিয়ে দেখেন। মৎস্য কর্মকর্তার সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনায় পরিচালিত এই সাড়াশি অভিযানের মুখে আড়ত চত্বরে মুহূর্তের মধ্যে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে এবং অবৈধ ব্যবসায়ীরা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই পুঙ্খানুপুঙ্খ তল্লাশির ফলে নিষিদ্ধ ঘোষিত আফ্রিকান মাগুর মাছের বিশাল একটি চালান হাতেনাতে ধরে ফেলতে সক্ষম হয় মৎস্য বিভাগের এই চৌকস আভিযানিক দলটি।
আরও পড়ুন: বাগেরহাটে চোরাই ইজিবাইক ও ব্যাটারিসহ গ্রেফতার চোর চক্রের ২ সদস্য
অভিযান চলাকালীন সময়ে আড়ত থেকে উদ্ধারকৃত অবৈধ মালামালের পরিমাণ ও পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, ধানগড়া মৎস্য আড়তের ভেতরে সাধারণ মানুষের অগোচরে বিক্রির উদ্দেশ্যে অত্যন্ত অবহেলায় সাজিয়ে রাখা হয়েছিল প্রায় ১০০ কেজি নিষিদ্ধ আফ্রিকান মাগুর মাছ। পরিবেশ অধিদপ্তরের কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং সরকারের সুনির্দিষ্ট আইন অমান্য করে এই ক্ষতিকর মাছগুলো বাজারে ছাড়ার পাঁয়তারা চলছিল, যা মানবদেহের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারত। তবে আভিযানিক দলটি যখন সফলভাবে মাছগুলো জব্দ করে, তখন অভিযানের উপস্থিতি টের পেয়ে সংশ্লিষ্ট মাছ বিক্রেতা বা অসাধু ব্যবসায়ীরা তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থল থেকে সটকে পড়ে এবং তাদের কাউকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। ব্যবসায়ীরা পালিয়ে গেলেও তাদের ফেলে যাওয়া শত কেজি অবৈধ মাছ অক্ষত অবস্থায় জব্দ করতে সক্ষম হয় মৎস্য অফিস, যা এই অভিযানের অন্যতম একটি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পরবর্তীতে সকল দাপ্তরিক নিয়ম ও আইনি প্রক্রিয়া অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সম্পন্ন করার পর জব্দকৃত এই বিশাল পরিমাণ নিষিদ্ধ মাছের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় এবং তা জনসমক্ষে ধ্বংস করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। জব্দকৃত প্রায় ১০০ কেজি আফ্রিকান মাগুর মাছ আড়ত থেকে সরাসরি রায়গঞ্জ উপজেলা পরিষদ চত্বরে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে স্থানান্তরিত করা হয় এবং সেখানে নিরাপদ দূরত্বে একটি নির্দিষ্ট গর্ত খোঁড়া হয়। উপজেলা প্রশাসনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ও মৎস্য কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলামের উপস্থিতিতে জব্দকৃত সমস্ত মাছ কেটে টুকরো করা হয় এবং পরবর্তীতে তা গভীর মাটিতে পুঁতে চিরতরে ধ্বংস করে ফেলা হয়। পরিবেশ এবং দেশীয় মৎস্য প্রজাতির সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে এই ধরনের ধ্বংসাত্মক মাছ বাজারে যেন আর কখনো প্রবেশ করতে না পারে, তার জন্য কঠোর হুশিয়ারিও উচ্চারণ করা হয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে মৎস্য অফিসের উদ্যোগে পরিচালিত এই অভিযানটি প্রমাণ করে যে ক্ষতিকর ও নিষিদ্ধ মাছের কারবারিরা যতই চালাক হোক না কেন, প্রশাসনের নজরদারি থেকে তারা রেহাই পাবে না। সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন এই সাহসী অভিযান স্থানীয় জলাশয়ের পরিবেশ রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আমরা আশা করি, রায়গঞ্জসহ সমগ্র সিরাজগঞ্জ জেলায় এ ধরনের বিশেষ অভিযান ভবিষ্যতেও নিয়মিতভাবে অব্যাহত থাকবে এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য চিরতরে বন্ধ হবে। সবার সম্মিলিত সচেতনতা, আইন মেনে চলার মানসিকতা এবং প্রশাসনের কঠোর নজরদারিই একটি সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশ বিনির্মাণের প্রধান শর্ত হিসেবে সবসময় অতন্দ্র প্রহরীর মতো কাজ করে যাবে।
সূত্র: রায়গঞ্জ উপজেলা মৎস্য অফিস প্রেস নোট ও স্থানীয় সংবাদাতা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।