প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত এবং এর পরিধিভুক্ত বিভিন্ন অঞ্চলের পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি দীর্ঘদিনের। প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাধারণ গ্রাহকদের জীবনযাত্রার ব্যয় যখন লাগামহীনভাবে ঊর্ধ্বমুখী, ঠিক সেই মুহূর্তে অস্বাভাবিক এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের বোঝা তাদের জীবনকে আরও বেশি দুর্বিষহ করে তুলছে। নিয়মমাফিক বাড়িতে গিয়ে সরাসরি বিদ্যুৎ মিটারের রিডিং বা পরিমাপ গ্রহণ না করেই মনগড়া ও কাল্পনিক উপায়ে বিল প্রস্তুত করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রায়শই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাওয়া যায়। এই ধরনের দায়িত্বহীন অনিয়মের কারণে সাধারণ মানুষ মাসের পর মাস আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং প্রতিবাদ করতে গেলে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহক ভোগান্তির অবসান ঘটানোর জন্য ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ এখন নিজেরাই সংঘবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ গড়ে তুলতে শুরু করেছেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে সেবা খাতের অনিয়মের বিরুদ্ধে সাধারণ গ্রাহকদের সোচ্চার হওয়ার এই প্রবণতা প্রমাণ করে যে মানুষ আর নিরবে শোষণ সহ্য করতে রাজি নয়। সম্প্রতি সিরাজগঞ্জ জেলার একটি জনবহুল জনপদে পল্লী বিদ্যুতের এমন একটি চরম অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছেন শত শত ক্ষুব্ধ গ্রাহক।
আরও পড়ুন: বেড়ায় কালবেলা প্রতিনিধির ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে প্রাণনাশের হুমকির ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এবং স্থানীয় সংবাদ সূত্রে প্রাপ্ত অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য তথ্যানুযায়ী, সম্প্রতি সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলায় এই চাঞ্চল্যকর বিক্ষোভের ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছে। চলতি সপ্তাহের গত বৃহস্পতিবারের নির্ধারিত সময়ে বেলা এগারোটার দিকে উল্লাপাড়া এলাকায় অবস্থিত সিরাজগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর মূল কার্যালয়ের সামনে এই কর্মসূচি পালিত হয়। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী বা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এলাকার সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগী গ্রাহকরা একত্রিত হয়ে কার্যালয়ের চত্বরে এসে উপস্থিত হন এবং কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে শুরু করেন। বিক্ষুব্ধ গ্রাহকদের প্রত্যেকের হাতে সেসময়ে নিজেদের হাতে থাকা অস্বাভাবিক অংকের বিদ্যুৎ বিলের কাগজ বা কপির বান্ডিল শোভা পাচ্ছিল। এই অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার মূল দায়ভার হিসেবে তারা সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তার পদত্যাগের দাবি জানিয়ে তীব্র স্লোগানে চারপাশ প্রকম্পিত করে তোলেন।
বিক্ষোভের সময় উপস্থিত ক্ষুব্ধ গ্রাহকদের পক্ষ থেকে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগ গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরা হয়, যা পল্লী বিদ্যুতের সেবামূলক কার্যক্রমের ভঙ্গুর দশা স্পষ্ট করে। গ্রাহকদের মূল বক্তব্য অনুযায়ী, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির নিয়োজিত মিটার রিডার বা মাঠপর্যায়ের কর্মীরা কখনো বাড়িতে গিয়ে সশরীরে মিটার দেখে রিডিং সংগ্রহ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না। এর পরিবর্তে তারা অফিসে বসে বা নিজেদের সুবিধামতো সম্পূর্ণ মনগড়া ও খেয়ালখুশি অনুযায়ী অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল তৈরি করে গ্রাহকদের হাতে ধরিয়ে দিচ্ছেন। প্রকৃত বিদ্যুৎ ব্যবহারের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি অর্থ বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে যুক্ত করার কারণে সাধারণ আয়ের মানুষগুলো এখন চরম আর্থিক সংকটে ও দিশাহারা অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। দিনের পর দিন এই অমানবিক হয়রানি নীরবে সহ্য করতে করতে সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে এবং তারা বাধ্য হয়ে রাজপথে নেমে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেছেন।
আরও পড়ুন: ঢাবিতে পড়ুয়া দুই মেধাবী বোনের পড়াশোনার খরচে খাদ্যমন্ত্রীর মানবিক সহায়তা
পরিস্থিতি যখন চরম আকার ধারণ করে এবং কার্যালয়ের ভেতরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার উপক্রম হয়, তখন বাধ্য হয়ে কর্তৃপক্ষের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সামনে এসে কথা বলেন [cite: সিরাজগঞ্জে পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়ে গ্রাহকদের বিক্ষোভ, মিটার না দেখে বিল লেখার অভিযোগ]। চলমান এই তীব্র বিক্ষোভের ঠিক একপর্যায়ে সিরাজগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর সম্মানিত মহাব্যবস্থাপক নুরুল হুদা সরাসরি আন্দোলনরত গ্রাহকদের মুখোমুখি হন এবং তাদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। তিনি বিক্ষুব্ধ গ্রাহকদের উত্থাপিত সমস্ত সমস্যার কথা ধৈর্যসহকারে শোনেন এবং বর্তমান বিদ্যুৎ বিলসংক্রান্ত জটিলতা ও ভুলত্রুটিগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে সমাধানের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দৃঢ় আশ্বাস প্রদান করেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এমন সুনির্দিষ্ট ও ইতিবাচক আশ্বাসের বাণী শোনার পর আন্দোলনকারী গ্রাহকরা তাদের পূর্বনির্ধারিত বিক্ষোভ কর্মসূচি সমাপ্ত ঘোষণা করে শান্তিপূর্ণভাবে স্থান ত্যাগ করে চলে যান। তবে স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন যে কেবল সাময়িক আশ্বাস দিয়ে এই দীর্ঘমেয়াদী সংকটের স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব হবে না, বরং মাঠপর্যায়ের দুর্নীতিবাজ কর্মীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিদ্যুৎ খাতের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সেবামূলক সংস্থায় এ ধরনের জনদুর্ভোগ এবং অনিয়মের ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না বলে মনে করেন এলাকার বুদ্ধিজীবীরা। সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থের একটি বড় অংশ যদি এভাবে অযৌক্তিক বিদ্যুৎ বিলের পেছনে চলে যায়, তবে তা নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনবে। অতীতেও এই কার্যালয়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল, কিন্তু সঠিক তদারকির অভাবে তা বার বার ধামাচাপা পড়ে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান ঘটনার পর পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে এবং ভবিষ্যতে আর কখনোই মিটার না দেখে বিল তৈরি করার দুঃসাহস কেউ দেখাবে না বলেই সাধারণ গ্রাহকদের প্রত্যাশা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক উপস্থিতির কারণে পুরো আন্দোলন চলাকালীন সময়ে বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার সুযোগ হয়নি, যা পরিস্থিতি শান্ত রাখতে সহায়তা করেছে।
পরিশেষে বলা যায় যে, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়ের সামনে গ্রাহকদের এই স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ এবং অতিরিক্ত বিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দেশের সেবা খাতের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। প্রশাসনের উচিত প্রতিটি অঞ্চলে মিটার রিডারদের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে মনিটরিং করা এবং ভুতুড়ে বিল পাঠানোর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। গ্রাহকদের ন্যায্য অধিকার ও হয়রানিমুক্ত সেবা প্রদানের মাধ্যমেই কেবল একটি আস্থার সম্পর্ক পুনরায় গড়ে উঠতে পারে—এটাই আজকের দিনে আমাদের সকলেরকান্ত প্রত্যাশা।
প্রতিবেদনের সূত্র: স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম ও পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয় সূত্র [cite: সিরাজগঞ্জে পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়ে গ্রাহকদের বিক্ষোভ, মিটার না দেখে বিল লেখার অভিযোগ]।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।