প্রতিবেদন: আব্দুস ছাত্তার (শামীম) / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
নেপাল সীমান্ত সংলগ্ন পার্বত্য অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে আঘাত হানা ভয়াবহ প্লাবন ও পাহাড়ি ঢলে ব্যাপকভাবে বিধ্বস্ত হওয়া একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ সড়ক মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে অলৌকিক দক্ষতার সাথে পুনর্নির্মাণ সম্পন্ন করেছে প্রতিবেশী চীন। পাহাড়ি পরিবেশের বৈরী প্রকৃতির তোড়ে সড়কটির বিস্তীর্ণ অংশ ধসে গিয়ে এবং পানির তোড়ে ভেসে গিয়ে সীমান্ত এলাকার স্বাভাবিক পরিবহন ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ও স্থবির হয়ে পড়েছিল। চরম এই সংকটময় পরিস্থিতিতে কালক্ষেপণ না করে অতি দ্রুততম সময়ে বিশাল অবকাঠামোগত কর্মযজ্ঞের সূচনা করে চীনা প্রশাসন। অত্যাধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক যন্ত্রপাতি, অত্যন্ত দক্ষ অভিজ্ঞ প্রকৌশলী এবং শতাধিক শ্রমিকের নিরলস প্রচেষ্টায় নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই বিধ্বংসী বন্যায় ধ্বংস হওয়া সড়কটিকে পুনরায় পূর্ণাঙ্গ চলাচলের উপযোগীতে রূপান্তর করা সক্ষম হয়েছে। এর ফলে পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া সীমান্তবর্তী জনপদগুলোর পারস্পরিক যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে। ক্ষিপ্র গতিতে প্রকাণ্ড এই সীমান্ত অবকাঠামোর সমাধান নিশ্চিত করায় সীমান্তবর্তী অধিবাসীদের মাঝে স্বস্তি ও স্থায়িত্ব ফিরে এসেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।
আরও পড়ুন: তারেক রহমানের ১৯তম কারামুক্তি দিবস আজ
উচ্চ পার্বত্য ও অত্যন্ত স্পর্শকাতর সীমান্ত অঞ্চলে ঘটে যাওয়া এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর দ্রুততার সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা ছিল এক বিশাল প্রশাসনিক ও প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ। অতিরিক্ত পলি ও অতিবৃষ্টির ফলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ভূমিধসে সীমান্ত সংযোগকারী ওই সুনির্দিষ্ট সড়কটির স্থানে স্থানে গভীর গর্তের সৃষ্টি হয় এবং অনেক অংশ সরাসরি নদীর প্রবল স্রোতে বিলীন হয়ে যায়। সীমান্ত বাণিজ্য ও সীমান্তরক্ষীদের যাতায়াতের প্রধান পথটি নিশ্চিহ্ন হয়ে পড়ায় জরুরি রসদ ও খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ সম্পূর্ণ স্তব্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। এমন চরম জরুরি পরিস্থিতিতে চীন সরকারের অবকাঠামো উন্নয়ন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ কালবিলম্ব না করে পুনর্নির্মাণ কাজকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যক্রম শুরু করে। অঞ্চলটির ভৌগোলিক গঠন অত্যন্ত বিপজ্জনক ও খাড়া হওয়া সত্ত্বেও চীনা টেকনিশিয়ানগণ কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়ন করে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে কাজের ময়দানে নেমে পড়েন। দিন ও রাত ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে শিফট ভিত্তিক কাজ পরিচালনা নিশ্চিত করা হয়, যেন একক মুহূর্তের জন্যও নির্মাণ কাজ বন্ধ না থাকে।
দ্রুততম সময়ের মধ্যে অত্যন্ত সুদৃঢ়ভাবে কাজটি শেষ করার পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে চীনের আধুনিক নির্মাণ প্রযুক্তি এবং ভারী যন্ত্রপাতির সঠিক প্রয়োগ। ধসে যাওয়া পাহাড়ি সংযোগস্থলগুলোতে দ্রুততার সাথে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কংক্রিট রিটেইনিং ওয়াল বা প্রতিরক্ষা প্রাচীর তৈরি করা হয়, যেন আগামীতে যেকোনো ভারী ঢল কিংবা ভূমিধসের প্রভাব সহজেই প্রতিহত করা সম্ভব হয়। এর সাথে সাথে দ্রুত জমাট বাঁধা আধুনিক পিচ এবং উচ্চমানের প্রি-ফ্যাব্রিকেটেড সামগ্রী ব্যবহারের মাধ্যমে বিনষ্ট হওয়া রাস্তাটিকে সম্পূর্ণ নতুন ও টেকসই কাঠামো প্রদান করা হয়। দুর্গম পর্বতের বিপজ্জনক বাকগুলোতে ভারী ক্রেন, এক্সকাভেটর এবং বড় বুলডোজার নিরাপদে পরিচালনা করে প্রকৌশলী দলটি অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছে। কঠোর পরিশ্রম ও আধুনিক কৌশলের সুষম সমন্বয়ে এক সপ্তাহের মধ্যেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া যোগাযোগ মাধ্যমটিকে আগের চেয়েও মজবুত ও উন্নত রূপ দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
আরও পড়ুন: লোডশেডিং দ্রুত কমার আশা: বিদ্যুৎ ব্যবহারে থাকবে সুষম বণ্টন
মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে সড়কটি পুনঃনির্মাণ করে পুনরায় যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ায় নেপাল সীমান্ত ও পার্শ্ববর্তী চীনা ভূখণ্ডের অধিবাসী এবং ব্যবসায়িক মহলে স্বস্তি বিরাজ করছে। ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতার কারণে যেসব আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কার্গো ও স্থানীয় নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল আনা-নেওয়া পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, পথটি চালুর পর পুনরায় সেখানে যান চলাচল শুরু হয়েছে। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য পথ দ্রুত সচল হওয়ায় সীমান্ত অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। স্থানীয় অধিবাসীরা বিস্ময় প্রকাশ করে জানিয়েছেন, এত বড় বিপর্যয় ঘটার পর এত কম সময়ে মহাসড়ক পূর্বের চেহারায় ফিরিয়ে আনা বিরল ঘটনা। চীনের এই ত্বরিৎ পদক্ষেপে সার্বিক জনভোগান্তি লাঘব হওয়ার পাশাপাশি জরুরি সামাজিক ও মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ সুগম হয়েছে।
বন্যাবিধ্বস্ত এলাকাটিতে কেবল সড়ক সংস্কার করেই চীনের স্থানীয় প্রশাসন তাদের দায়িত্ব শেষ করেনি। সীমান্ত এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত অন্যান্য সরকারি ও সাধারণ অবকাঠামোগুলোকেও নতুন করে পুনর্নির্মাণের একটি বিস্তৃত মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। প্লাবনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ছোট-বড় সেতু, বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন এবং পানি নিষ্কাশন ক্যানালগুলোকে আরো বেশি টেকসই ও আধুনিক করে পুনরায় সচল করার কাজ ধাপে ধাপে এগোচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তৈরি হওয়া আকস্মিক প্রাকৃতির দুর্যোগ মোকাবিলা করতে সীমান্তজুড়ে অবকাঠামো শক্তিশালীকরণের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। এক সপ্তাহের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পুনর্নির্মাণের এই নজির বিশ্বজুড়ে চীনের প্রকৌশল বিদ্যা ও প্রযুক্তির দ্রুত বাস্তবায়নের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
সূত্র: আন্তর্জাতিক তথ্য ও সংবাদ সংস্থা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।