আন্তর্জাতিক ডেস্ক, দিগন্ত বাংলা নিউজ:
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে সশস্ত্র প্রতিরোধ গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর একটি আত্মঘাতী ড্রোন হামলায় দখলদার ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এক শীর্ষ প্লাটুন কমান্ডার নিহত হয়েছেন। গত শনিবার (১৬ মে) ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) আনুষ্ঠানিকভাবে এই সেনা কর্মকর্তার মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে। বৈশ্বিক গণমাধ্যমে এই খবরটি প্রকাশিত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি এবং ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক মুখপাত্রের বরাতে জানা যায়, গত শুক্রবার লেবাননের দক্ষিণ সীমান্তে একটি অগ্রবর্তী ঘাঁটিতে দায়িত্ব পালনকালে ২৪ বছর বয়সী ক্যাপ্টেন মাওজ রেকানাতি হিজবুল্লাহর ড্রোনের আঘাতে প্রাণ হারান। নিহত এই সেনা কর্মকর্তা ইসরায়েলের অভিজাত ‘গোলানি ব্রিগেড’-এর ১২ নং ব্যাটালিয়নের প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। আইডিএফ জানিয়েছে, লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে সাম্প্রতিক পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ নিয়ে গোলানি ব্রিগেডের মোট সাতজন উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা নিহত হলেন।
বিয়ের এক মাস আগেই ট্র্যাজেডি
নিহত ক্যাপ্টেন মাওজ রেকানাতির এই আকস্মিক মৃত্যুতে ইসরায়েলের রাজনৈতিক মহলেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু তেল আবিবে এক বিশেষ শোক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, নিহত ক্যাপ্টেন মাওজের আগামী মাসেই তার বাগদত্তাকে বিয়ে করার কথা ছিল। পারিবারিক সব প্রস্তুতি সম্পন্ন থাকা সত্ত্বেও বিয়ের পিঁড়িতে বসার মাত্র এক মাস আগে যুদ্ধক্ষেত্রে তার জীবনাবসান ঘটল। এমন কঠিন ও বেদনাদায়ক সময়ে তিনি ক্যাপ্টেন মাওজের সঙ্গী এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে থাকার ও সর্বাত্মক রাষ্ট্রীয় সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে এই মৃত্যুর ঘটনাটি ইসরায়েলের সাধারণ জনগণের মধ্যে লেবানন অভিযানের যৌক্তিকতা নিয়ে নতুন করে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
যুদ্ধবিরতির আড়ালে ইসরায়েলি আগ্রাসন
গত মাসের মাঝামাঝি সময়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যস্থতায় হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সাধারণ মানুষ আশা করেছিল এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটবে। তবে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহার করেনি। উল্টো তারা যুদ্ধবিরতির এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে লেবাননের অভ্যন্তরে একটি স্থায়ী সামরিক 'বাফার জোন' বা নিরাপত্তা বলয় তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে।
এই বাফার জোন তৈরির উদ্দেশ্যে ইসরায়েলি বুলডোজার ও ড্রাম ট্রাক ব্যবহার করে লেবাননের দক্ষিণ সীমান্তের সাধারণ মানুষের প্রাচীন ঘরবাড়ি, ফসলি জমি এবং বেসামরিক গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করা অব্যাহত রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি ইসরায়েলি গোয়েন্দা ড্রোন ব্যবহার করে হিজবুল্লাহর স্থানীয় সদস্যদের অবস্থান লক্ষ্য করে প্রতিনিয়ত অতর্কিত হামলা ও স্নাইপার শ্যুটিং চালানো হচ্ছিল। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করে ইসরায়েলের এই একতরফা আগ্রাসনই মূলত হিজবুল্লাহকে পুনরায় অস্ত্র হাতে তুলে নিতে বাধ্য করেছে। নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ড রক্ষায় হিজবুল্লাহও তাই নতুন শক্তিতে পাল্টা প্রতিরোধমূলক হামলা শুরু করেছে।
হিজবুল্লাহর নতুন অস্ত্র: জ্যামার-প্রতিরোধী ফাইবার অপটিক ড্রোন
প্রতিরক্ষা ও সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের পাল্টা হামলায় হিজবুল্লাহ যে রণকৌশল ব্যবহার করছে তা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে পুরোপুরি হতবাক করে দিয়েছে। হিজবুল্লাহ তাদের এই নিখুঁত ও প্রাণঘাতী হামলায় সর্বাধুনিক প্রযুক্তির 'ফাইবার অপটিক সমৃদ্ধ ড্রোন' (Fiber-Optic Guided Drone) ব্যবহার করছে। বর্তমান আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি অত্যন্ত বিরল এবং অত্যন্ত কার্যকরী।
আরও পড়ুন: আলোচনা ব্যর্থ হলে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ইরান: হুঁশিয়ারি আরাগচির
সাধারণ ড্রোনগুলো মূলত রেডিও সিগন্যাল, জিপিএস (GPS) বা ওয়াই-ফাই তরঙ্গের মাধ্যমে রিমোট কন্ট্রোলারের সাহায্যে পরিচালিত হয়। ফলে ইসরায়েলের অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামারগুলো খুব সহজেই সেই রেডিও সিগন্যাল ব্লক করে ড্রোনগুলোকে মাঝ আকাশেই অকেজো করে দিতে পারে। কিন্তু হিজবুল্লাহর নতুন ফাইবার অপটিক ড্রোনের পেছনে অত্যন্ত সুক্ষ্ম ও শক্তিশালী ফাইবার তার যুক্ত থাকে, যা ড্রোনের ওড়ার সাথে সাথে রিল থেকে খুলতে থাকে। এই তারের মাধ্যমেই ড্রোনের লাইভ ক্যামেরা ফিড এবং কমান্ডারের কন্ট্রোল সিগন্যাল আদান-প্রদান হয়।
যেহেতু এতে কোনো বায়বীয় রেডিও তরঙ্গ ব্যবহার করা হয় না, তাই ইসরায়েলের কোটি কোটি ডলার মূল্যের আয়রন ডোম কিংবা শক্তিশালী ইলেকট্রিক জ্যামার দিয়ে এই ড্রোনগুলোকে আটকানো বা ট্র্যাক করা অসম্ভব। নিখুঁত ফাইবার অপটিক সিগন্যালের কারণে ড্রোন চালক সুদূর বাঙ্কার থেকে একদম শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তু দেখতে পান এবং ইসরায়েলি বাঙ্কারের জানালা বা সাঁজোয়া যানের ভেতরে সরাসরি ড্রোনটি আঘাত করতে পারেন। ফলে লেবাননের মাটিতে অবস্থান করা ইসরায়েলি সেনারা হিজবুল্লাহর এই অদৃশ্য ও জ্যামার-প্রতিরোধী ড্রোনের মুখে প্রতিনিয়ত ভারী হতাহতের শিকার হচ্ছেন এবং তাদের সামরিক মনোবল ভেঙে পড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, গোলানি ব্রিগেডের একজন প্লাটুন কমান্ডারের এই মৃত্যু কেবল ইসরায়েলের সামরিক ক্ষতিই নয়, বরং এটি বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর যুদ্ধনীতির জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ধাক্কা। ইসরায়েলের অভ্যন্তরে সাধারণ মানুষ এবং বিরোধী দলগুলো এখন চাপ সৃষ্টি করছে যেন লেবানন থেকে দ্রুত সেনা প্রত্যাহার করা হয়। কারণ, হিজবুল্লাহর ফাইবার অপটিক প্রযুক্তির সামনে ইসরায়েলি স্থল সেনাদের নিরাপত্তা এখন চরম হুমকির মুখে।
অন্যদিকে, এই হামলার মাধ্যমে হিজবুল্লাহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই বার্তাই দিল যে, যুদ্ধবিরতির নামে ইসরায়েলের যেকোনো ধরণের একতরফা বাফার জোন তৈরির চেষ্টা তারা সফল হতে দেবে না। লেবাননের মাটি থেকে শেষ ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তাদের এই ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত থাকবে। মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন সমীকরণ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, জাতিসংঘ বা বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলো যদি ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক আইন মানতে বাধ্য করতে না পারে, তবে এই আঞ্চলিক সংঘাত অচিরেই একটি বৃহত্তর ও দীর্ঘমেয়াদী মহাযুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।