আলোচনা ব্যর্থ হলে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ইরান: হুঁশিয়ারি আরাগচির

আলোচনা ব্যর্থ হলে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ইরান: হুঁশিয়ারি আরাগচির

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, দিগন্ত বাংলা নিউজ: 

বিশ্ব রাজনীতির পটভূমিতে মধ্যপ্রাচ্য সংকট যখন এক নতুন ও জটিল মোড় নিয়েছে, ঠিক তখনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা শক্তিগুলোকে চরম হুঁশিয়ারি দিলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, চলমান কূটনৈতিক আলোচনা যদি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়, তবে ইরান যেকোনো মুহূর্তে পুনরায় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়াতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। তেহরানের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরাসরি সামরিক সংঘাতের পথ বেছে নিতেও তারা বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করবে না।

​ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এবং কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানা যায়, সম্প্রতি এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে বক্তব্য রাখার সময় আব্বাস আরাগচি ওয়াশিংটনের নীতি নির্ধারণী মহলকে উদ্দেশ্য করে এই কড়া বার্তা দেন। তিনি বলেন, ইরান সবসময় আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদী সমাধান চায়। কিন্তু এই আলোচনার অর্থ এই নয় যে, তেহরান কারো অন্যায় শর্ত বা একতরফা চাপ মেনে নেবে। যদি এই কূটনৈতিক দর কষাকষিতে ইরানের জনগণের জন্য একটি ন্যায়সংগত, সম্মানজনক এবং গ্রহণযোগ্য ফলাফল না আসে, তবে শান্তি আলোচনার টেবিল ছেড়ে সরাসরি রণক্ষেত্রে জবাব দেবে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরান।

​মার্কিন অর্থনীতিতে যুদ্ধের কালো ছায়া ও আরাগচির এক্স (টুইটার) বার্তা

​চলমান এই তীব্র সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কেবল সামরিক শক্তির হুমকি দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক নাজুক পরিস্থিতিকেও বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছেন। আরাগচি দাবি করেছেন যে, ওয়াশিংটন এবং তেল আবিব যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধংদেহী মনোভাব দেখাচ্ছে, তার চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে স্বয়ং আমেরিকার সাধারণ জনগণকে। মার্কিন নীতিনির্ধারকদের এই হঠকারী সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এক সুদূরপ্রসারী এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনছে।

​এই বক্তব্যের সপক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি তার অফিশিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার)-এ একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছবি ও তথ্য শেয়ার করেছেন। মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের (US Treasury Bonds) ক্রমবর্ধমান সুদের হারের একটি গ্রাফিকাল চিত্র বা ছবি পোস্ট করে তিনি বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছেন কীভাবে আমেরিকার ঋণ ও সুদের বোঝা দিন দিন আকাশচুম্বী হচ্ছে। ছবির ক্যাপশনে আরাগচি সরাসরি মার্কিন নাগরিকদের উদ্দেশ্য করে লিখেছেন, ‘আমেরিকানদের সাধারণ জনগণকে পরিষ্কারভাবে বলা উচিত যে, ইরানের বিরুদ্ধে তাদের সরকারের এই ইচ্ছাকৃত এবং চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের আকাশচুম্বী খরচ আসলে সাধারণ করদাতাদের পকেট থেকেই কেটে নেওয়া হচ্ছে।’ তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ জিইয়ে রাখতে গিয়ে মার্কিন প্রশাসন যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক মন্দাকে আরও ত্বরান্বিত করছে।

আরও পড়ুন: শিরোপা উৎসবে হামলার শিকার প্রতিপক্ষ ফুটবলাররা

শিরোপা উৎসবে হামলার শিকার প্রতিপক্ষ ফুটবলাররা

​হরমুজ প্রণালীর অবরুদ্ধ দশা ও বিশ্ব জ্বালানি সংকট

​আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকরা বলছেন, চলতি বছরের গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই বহুমাত্রিক সঙ্ঘাত কেবল বাগাড়ম্বরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সরাসরি ও মারাত্মক প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুটের ওপর। বিশেষ করে, ইরান ও মার্কিন-ইসরাইল জোটের এই সংঘাতের জেরে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ 'হরমুজ প্রণালী' (Strait of Hormuz)-র মধ্য দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

​ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে হরমুজ প্রণালীকে বলা হয় বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন বা প্রধান ধমনী। বিশ্বব্যাপী উৎপাদিত মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) একটি বিশাল বড় অংশ প্রতিদিন এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি করা হয়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো যেমন সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত এই রুটের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। ২৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। বিমা কোম্পানিগুলো এই রুটে চলাচলকারী জাহাজের প্রিমিয়াম বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, আরাগচির হুঁশিয়ারি অনুযায়ী যদি সত্যি এই আলোচনা পুরোপুরি ব্যর্থ হয় এবং হরমুজ প্রণালী দীর্ঘদিনের জন্য অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে, তবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এমন এক ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে যা সামাল দেওয়া পশ্চিমা বিশ্বের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।

​ওয়াশিংটনের দ্বিচারিতা এবং ইরানের চূড়ান্ত অবস্থান

​তেহরানের কূটনৈতিক মহল মনে করে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একদিকে শান্তির কথা বললেও অন্যদিকে ইরানের ওপর নতুন নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা (Sanctions) আরোপ করে চলেছে এবং ইসরাইলকে সামরিকভাবে মদদ দিচ্ছে। ওয়াশিংটনের এই দ্বিমুখী নীতির কারণেই শান্তি আলোচনা বারবার ভেস্তে যাচ্ছে। আব্বাস আরাগচি তার বক্তব্যে এই বিষয়টিই স্পষ্ট করতে চেয়েছেন যে, ইরান কোনো নিষেধাজ্ঞার ভয় পায় না এবং গত কয়েক দশক ধরে নিষেধাজ্ঞার মাঝেই তারা নিজেদের সামরিক ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিকে এক অপরাজেয় স্তরে নিয়ে গেছে।

​সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান যদি এবার সত্যি সরাসরি সামরিক সঙ্ঘাতে জড়ায়, তবে তা কেবল লেবানন বা সিরিয়ার মতো প্রক্সি যুদ্ধের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইরানের নিজস্ব দূরপাল্লার ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, হাইপারসনিক প্রযুক্তি এবং হাজার হাজার কামিকাজে ড্রোনের বহর সরাসরি পারস্য উপসাগরে থাকা মার্কিন নৌঘাঁটি এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত তাদের সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে সক্ষম। আরাগচির এই সময়োচিত হুঁশিয়ারি মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং তার প্রশাসনকে একটি চূড়ান্ত বার্তা দেওয়া—হয় ইরানকে সমান অংশীদার হিসেবে মেনে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে, অন্যথায় পারস্য উপসাগরে একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং বিধ্বংসী যুদ্ধের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত থাকতে হবে। এখন দেখার বিষয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ঠেকাতে ওয়াশিংটনকে একটি যৌক্তিক চুক্তিতে আসতে বাধ্য করতে পারে কিনা।

​সূত্র: মিডল ইস্ট আই

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন