শাহজাদপুরের অবহেলিত উন্নয়নে ২৫ দফা দাবি: নাগরিক কমিটির স্মারকলিপি ও বিশাল মানববন্ধন

শাহজাদপুরের অবহেলিত উন্নয়নে ২৫ দফা দাবি: নাগরিক কমিটির স্মারকলিপি ও বিশাল মানববন্ধন
ছবি: সংগৃহীত
 প্রতিবেদন: সুফিয়ান নোমান / দিগন্ত বাংলা নিউজ

শাহজাদপুর: সিরাজগঞ্জ জেলার অন্যতম প্রাচীন, শিল্প-সমৃদ্ধ এবং ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জনপদ শাহজাদপুর উপজেলা। বিশ্বকবি রবীন্দ্র স্মৃতিবিজড়িত এবং তাঁতশিল্পের অন্যতম রাজধানী হিসেবে খ্যাত এই অঞ্চলের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন দীর্ঘকাল ধরে উপেক্ষিত রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। এই অবহেলার অবসান ঘটিয়ে শাহজাদপুরকে একটি আধুনিক, উন্নত এবং মাদকমুক্ত মডেল উপজেলা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে এক অভূতপূর্ব নাগরিক জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। এলাকার সার্বিক অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক খোলনলচে বদলে দিতে ২৫টি সুনির্দিষ্ট ও অতীব গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবিতে রাজপথে নেমেছেন সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ। ‘শাহজাদপুর উন্নয়ন পরিকল্পনা কমিটি’-এর ব্যানারে গতকাল বৃহস্পতিবার (৯ই জুন) সকালে স্থানীয় উপজেলা পরিষদ চত্বরে এক বিশাল ও স্বতঃস্ফূর্ত মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে।

​উক্ত প্রতিবাদী ও দাবিমূলক মানববন্ধনে উপজেলার বিভিন্ন স্তরের পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী এবং সাংস্কৃতিক কর্মীরা দলে দলে অংশগ্রহণ করেন। প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী চলমান এই শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল মানববন্ধনে বক্তারা শাহজাদপুরের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার কথা তুলে ধরেন এবং অতি দ্রুত সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। সমাবেশ শেষে নাগরিক নেতৃবৃন্দের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং শাহজাদপুর পৌরসভার বর্তমান পৌর প্রশাসক সাবরিনা শারমিনের কার্যালয়ে গিয়ে তাঁর হাতে ২৫ দফা সংবলিত একটি বিস্তারিত স্মারকলিপি হস্তান্তর করেন।

​ইতিহাসের আলোয় শাহজাদপুর: কেন এই ২৫ দফা দাবি সময়ের দাবি?

​শাহজাদপুর কেবল সিরাজগঞ্জের একটি সাধারণ উপজেলা নয়, বরং উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার এবং দেশের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। এখানকার তাঁতশিল্প ও দুগ্ধ খামার সারা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কোটি কোটি টাকার জোগান দেয়। তা সত্ত্বেও ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক কারণে এই অঞ্চলের মানুষ আধুনিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। দীর্ঘদিন ধরে এখানকার সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ জমছিল। ‘শাহজাদপুর উন্নয়ন পরিকল্পনা কমিটি’ সেই সুপ্ত ক্ষোভকে একটি নিয়মতান্ত্রিক ও ইতিবাচক আন্দোলনের রূপ দিয়েছে।

আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে নিখোঁজের ২ দিন পর সবুজের মরদেহ উদ্ধার: শরীরে আঘাতের চিহ্ন, নেপথ্যে অপরাধ চক্রের দ্বন্দ্ব?

​বক্তাদের মতে, একটি অঞ্চলের সুষম উন্নয়নের জন্য উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিনোদন কেন্দ্র এবং যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয় রোধ করা জরুরি। এই ২৫ দফা দাবির মধ্যে শাহজাদপুরের অবামুক্ত অর্থনৈতিক বিকাশ ও তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার চাবিকাঠি লুকিয়ে রয়েছে।

​মানববন্ধনে উত্থাপিত ২৫ দফার প্রধান ও যুগান্তকারী দাবিসমূহ

​স্মারকলিপিতে এবং মানববন্ধনের ব্যানারে শাহজাদপুরের প্রগতিশীল অগ্রযাত্রার জন্য ২৫টি যৌক্তিক দাবি উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে প্রধান ও উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দাবি নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

  • রেললাইন নেটওয়ার্ক স্থাপন: শাহজাদপুরের ব্যবসা-বাণিজ্যকে আরও গতিশীল করতে এবং ঢাকা ও উত্তরবঙ্গের সাথে সরাসরি সাশ্রয়ী যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে দ্রুত শাহজাদপুরকে রেলওয়ে নেটওয়ার্কের আওতায় আনার জোরালো দাবি জানানো হয়।
  • রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস: বিশ্বকবির নামে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ দ্রুত ত্বরান্বিত করা, যাতে উচ্চশিক্ষার জন্য এই অঞ্চলটি একটি আধুনিক শিক্ষানগরী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
  • সাংস্কৃতিক বিকাশ ও মুক্তমঞ্চ নির্মাণ: শাহজাদপুরের তরুণ সমাজকে অপসংস্কৃতি থেকে দূরে রাখতে এবং সুস্থ ধারার বিনোদনের সুযোগ তৈরি করতে একটি আধুনিক ও সুপরিসর ‘মুক্তমঞ্চ’ স্থাপন করা।
  • আধুনিক পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা: জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে সর্বস্তরের পাঠক ও শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল সুযোগ-সুবিধা সংবলিত একটি সমৃদ্ধ কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরি বা গণগ্রন্থাগার গড়ে তোলা।
  • আঞ্চলিক স্টেডিয়াম ও ক্রীড়া উন্নয়ন: যুবসমাজের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য এবং স্থানীয় ক্রীড়াবিদদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে একটি আন্তর্জাতিক মানের আঞ্চলিক স্টেডিয়াম নির্মাণ।
  • শিশুপার্ক ও বিনোদন কেন্দ্র: পৌর এলাকার ভেতর পরিবারের সদস্য ও শিশুদের স্বস্তিতে সময় কাটানোর জন্য একটি আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত শিশুপার্ক স্থাপন করা।
  • মাদকের ভয়াল থাবা নির্মূল: শাহজাদপুরের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়া মাদকের নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ ধ্বংস করা এবং তরুণদের রক্ষায় প্রশাসনের বিশেষ জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করা।

​নাগরিক নেতৃবৃন্দের ক্ষোভ ও নীতি নির্ধারণী বক্তব্য

​শাহজাদপুর উপজেলা পরিষদ চত্বরে আয়োজিত এই মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন শাহজাদপুর উন্নয়ন পরিকল্পনা কমিটির সম্মানিত আহ্বায়ক ও বিশিষ্ট আইনজীবি অ্যাডভোকেট আনোয়ার হোসেন। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, "শাহজাদপুর কোনো পিছিয়ে পড়া জনপদ নয়। এ দেশের অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে আমাদের অবদান অনস্বীকার্য। অথচ আজ আমাদের একটি স্থায়ী ক্যাম্পাস, একটি পাবলিক লাইব্রেরি কিংবা একটি স্টেডিয়ামের জন্য রাজপথে নামতে হচ্ছে। আমরা কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এখানে আসিনি; আমরা এসেছি আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এবং শাহজাদপুরের মাটিকে মাদকমুক্ত করতে। আমাদের এই ২৫ দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন থামবে না।"

​কমিটির সদস্য সচিব ভিপি কে এম এ ওয়ারেছ রুবেল তাঁর বক্তব্যে বলেন, "রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণে ধীরগতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। শাহজাদপুরের যুবসমাজকে বাঁচাতে হলে মাঠ ও পার্কের প্রয়োজন, সাংস্কৃতিক চর্চার জন্য মুক্তমঞ্চের প্রয়োজন। আমরা আশা করি, বর্তমান জনবান্ধব সরকার আমাদের এই ন্যায়সঙ্গত দাবিগুলো দ্রুত বিবেচনা করবেন।"

আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জে যাত্রীবাহী বাসের পেছনে সজোরে ধাক্কা: অটোরিকশার মা-ছেলে নিহত, আহত ৩

​উক্ত নাগরিক সমাবেশে সংহতি প্রকাশ করে আরও বক্তব্য রাখেন শাহজাদপুর বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নেতা রবিন আকন্দ, তরুণ সমাজসেবক আলামিন হোসেন, শিক্ষাবিদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ শহিদুল ইসলাম শাহীন এবং বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কাজী শওকত হোসেনসহ প্রগতিশীল ছাত্র ও যুবনেতৃবৃন্দ। ব্যবসায়ী নেতা রবিন আকন্দ হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও রেললাইন স্থাপন করা হলে শাহজাদপুরের কাপড়ের বাজার সারা দেশে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে, তাই অবিলম্বে এই দাবিগুলো মানা দরকার।

​স্মারকলিপি গ্রহণ ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ইতিবাচক আশ্বাস

​বিশাল এই মানববন্ধন কর্মসূচি শেষে শাহজাদপুর উন্নয়ন পরিকল্পনা কমিটির একটি প্রতিনিধি দল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাবরিনা শারমিনের কার্যালয়ে প্রবেশ করেন এবং অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে ২৫ দফা দাবির স্মারকলিপিটি তার হাতে তুলে দেন। স্মারকলিপি গ্রহণকালে ইউএনও এবং পৌর প্রশাসক সাবরিনা শারমিন উপস্থিত নাগরিক সমাজ ও সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত ইতিবাচক ও গঠনমূলক বক্তব্য রাখেন।

​তিনি শাহজাদপুরের ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা স্মরণ করে বলেন, "শাহজাদপুর একটি অনন্য এবং ঐতিহ্যবাহী উপজেলা। এখানকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে যেসব দাবি উত্থাপন করা হয়েছে, তার প্রতিটিই অত্যন্ত যৌক্তিক এবং জনগুরুত্বপূর্ণ। আমি ব্যক্তিগতভাবে শাহজাদপুরের যেকোনো ভালো ও কল্যাণকর কাজের সাথে অতীতেও ছিলাম, বর্তমানেও আছি এবং ভবিষ্যতেও থাকব।"

​তিনি প্রতিনিধি দলকে আশ্বস্ত করে আরও বলেন, "একটি অঞ্চলের উন্নয়ন রাতারাতি সম্ভব নয়। তবে পর্যায়ক্রমে যাতে এই সকল যৌক্তিক ও জনকল্যাণমুখী দাবিগুলো সরকার বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেন, সেজন্য আমি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এই ২৫ দফা দাবির অনুলিপি অচিরেই সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সমূহে পাঠিয়ে দেব। আমি আশা করি, সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে খুব দ্রুতই শাহজাদপুরের জন্য ভালো কোনো ঘোষণা আসবে।"

​সমাপনী ও আন্দোলনের ভবিষ্যৎ রূপরেখা

​শাহজাদপুরের সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করছেন, এই মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদানের ঘটনাটি উপজেলার ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। দীর্ঘদিন পর কোনো রাজনৈতিক ব্যানারের বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ অরাজনৈতিকভাবে সর্বস্তরের মানুষ নিজেদের অধিকার আদায়ে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। কমিটির নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, প্রথম ধাপে প্রশাসনের কাছে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ উপায়ে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। যদি অদূর ভবিষ্যতে এই দাবিগুলোর দৃশ্যমান অগ্রগতি না দেখা যায়, তবে শাহজাদপুরের স্বার্থে পরবর্তীতে আরও বৃহত্তর ও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। তবে তারা আশা প্রকাশ করেন, প্রশাসনের আন্তরিকতায় এবং সরকারের সদিচ্ছায় শাহজাদপুর অচিরেই একটি আধুনিক ও পরিকল্পিত মডেল জোন হিসেবে গড়ে উঠবে।

নিউজ সূত্র: শাহজাদপুর উন্নয়ন পরিকল্পনা কমিটির অফিশিয়াল প্রেস রিলিজ।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন