ব্রেকিং নিউজ

দেশের বাজারে ফার্নেস অয়েলের দাম রেকর্ড বেড়েছে, লিটারে ১৮.৮৫ টাকা বৃদ্ধি

দেশের বাজারে ফার্নেস অয়েলের দাম রেকর্ড বেড়েছে, লিটারে ১৮.৮৫ টাকা বৃদ্ধি

অর্থনীতি ডেস্ক, দিগন্ত বাংলা নিউজ: 

বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং মার্কিন ডলারের অনিয়ন্ত্রিত বিনিময় হারের প্রত্যক্ষ প্রভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে আবারও রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে ফার্নেস অয়েলের দাম। নতুন নির্ধারিত মূল্য তালিকা অনুযায়ী, ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েলের দাম একলাফে ১৮ টাকা ৮৫ পয়সা বাড়িয়ে সর্বমোট ১১৩ টাকা ৫৪ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। আজ সোমবার (১৮ মে) বিকেলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) তাদের প্রধান কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক জরুরি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই মূল্যবৃদ্ধির আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত দেশবাসীকে জানিয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, আজ দিবাগত মধ্যরাত তথা ১২টা থেকেই সারা দেশে এই নতুন বর্ধিত দাম কার্যকর ও বলবৎ হবে।

​দেশের শিল্প উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ঘটনাটি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে এক বড় ধরণের মনস্তাত্ত্বিক ও আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে বেসরকারি খাতের আইপিপি (Independent Power Producer) বা রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো, যা মূলত ফার্নেস অয়েলের ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল, সেগুলোর উৎপাদন খরচ এখন একলাফে বহুগুণ বেড়ে যাবে। এর আগে গত রোববার (১২ এপ্রিল) দেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েলের দাম ৭০ টাকা ১০ পয়সা থেকে এককালীন ২৪ টাকা বাড়িয়ে ৯৪ টাকা ৬৯ পয়সা করা হয়েছিল। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে দুই দফায় এই বিশাল অংকের মূল্যবৃদ্ধির ফলে দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাত এক বড় ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে।

​বিইআরসির বিশেষ কমিশন সভা এবং মূল্য সমন্বয়ের মূল কারণ

​বিইআরসির প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী, আজ সোমবার (১৮ মে) কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে এক বিশেষ ও উচ্চপর্যায়ের কমিশন সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং দেশের ব্যাংকিং খাতে মার্কিন ডলারের তীব্র সংকটের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করা হয়। কমিশন জানায়, গত ১৩ এপ্রিল হতে ১২ মে—এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেশে আমদানি করা পরিশোধিত ফার্নেস অয়েলের মে মাসের ক্রুড অয়েলের এফওবি (Free on Board) মূল্য এবং মার্কিন ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশি টাকার বিনিময় হারের ব্যাপক নেতিবাচক পরিবর্তনকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

​বর্তমান আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম যেমন বাড়ছে, ঠিক তেমনি দেশীয় বাজারে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন অব্যাহত রয়েছে। এলসি (Letter of Credit) খোলার ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ডলারের যে উচ্চ মূল্য রাখছে, তার ফলে আমদানিকারকদের আগের চেয়ে অনেক বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে। এই সামগ্রিক আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির ভারসাম্য বজায় রাখতেই মে মাসে ফার্নেস অয়েলের এই নতুন মূল্যহার সমন্বয় বা বৃদ্ধি করার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে কমিশন। আজ দিবাগত রাত ১২টার পর থেকে দেশের সমস্ত ডিপো এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এই নতুন দাম অনুযায়ী ফার্নেস অয়েল বিক্রি করতে আইনত বাধ্য থাকবে।

আরও পড়ুন: আকাশে জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা গেছে, ২৮ মে পবিত্র ঈদুল আজহা

আকাশে জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা গেছে, ২৮ মে পবিত্র ঈদুল আজহা

ফার্নেস অয়েলের দাম নির্ধারণ কমিটির সুপারিশ ও ব্যাকগ্রাউন্ড

​উল্লেখ্য, দেশের বাজারে ফার্নেস অয়েলের দাম নিয়মিত এবং যৌক্তিকভাবে সমন্বয়ের জন্য গত ১৫ মার্চ সরকারের বিশেষ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয় নীতিমালার আওতায় একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই বিশেষ কমিটি তাদের প্রাথমিক তদন্ত ও পর্যালোচনায় দেখতে পায় যে, মার্চ মাসে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সরাসরি ক্রুড বা অপরিশোধিত অয়েল আমদানি করা সম্ভব হয়নি। এই কারণে কমিটি মার্চ মাসে বিশ্ববাজারে পরিশোধিত ফার্নেস অয়েলের প্রকাশিত 'প্লাটস রেট' (Platts Rate - আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম নির্ধারণের স্বীকৃত সূচক)-এর সার্বিক গড় এবং দেশের অভ্যন্তরে মার্কিন ডলারের ক্রমবর্ধমান বিনিময় হারের ব্যাপক পরিবর্তন বিবেচনা করে এপ্রিল মাসের জন্য ফার্নেস অয়েলের মূল্যহার নির্ধারণ করার জন্য বিইআরসির কাছে সুনির্দিষ্ট লিখিত সুপারিশ পেশ করে।

​পরবর্তীতে গত ৫ ও ১২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত বিইআরসির পরপর দুটি বিশেষ কমিশন সভায় উক্ত কারিগরি কমিটির সুপারিশ অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা করা হয়। দীর্ঘ দর কষাকষি এবং দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতের ভর্তুকির চাপ কমাতে অবশেষে এপ্রিল মাসে ২৪ টাকা বৃদ্ধির অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মে মাসে এসে আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি এবং ডলারের মূল্য আরও বেশি লাগামহীন হয়ে পড়ায়, কমিশন মাত্র এক মাসের মাথায় আবারও ১৮ টাকা ৮৫ পয়সা বৃদ্ধি করতে বাধ্য হলো। বিইআরসির কর্মকর্তারা বলছেন, বিশ্ববাজারের সাথে দেশীয় বাজারের তেলের দামের সামঞ্জস্য না রাখলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার এবং আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বিপুল পরিমাণ লোকসানের বোঝা চেপে বসত, যা দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি কোনোভাবেই সহ্য করতে পারত না।

​দেশের বিদ্যুৎ খাত, শিল্প উৎপাদন ও সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব

​ফার্নেস অয়েলের এই রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধির সুদূরপ্রসারী এবং মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে যাচ্ছে দেশের বিদ্যুৎ খাতের ওপর। বাংলাদেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি বড় অংশ আসে ফার্নেস অয়েল চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে। জ্বালানির দাম লিটারে প্রায় ১৯ টাকা বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ইউনিট প্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ (Cost per Unit) উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাবে। এর ফলে সরকারকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে বেসরকারি কেন্দ্রগুলোকে আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ 'ক্যাপাসিটি চার্জ' এবং ভর্তুকি প্রদান করতে হবে। আর সরকার যদি এই অতিরিক্ত ভর্তুকির চাপ সামলাতে না পারে, তবে অচিরেই সাধারণ ভোক্তা পর্যায়ে খুচরা ও পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষণা আসতে পারে, যা দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে আরও দুর্বিষহ করে তুলবে।

​বিদ্যুৎ খাতের পাশাপাশি দেশের ভারী শিল্প কলকারখানা, টেক্সটাইল মিল, ইস্পাত ও সিমেন্ট কারখানাগুলোতেও ফার্নেস অয়েল অন্যতম প্রধান জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কাঁচামাল এবং পণ্য পরিবহনের পাশাপাশি নিজস্ব জেনারেটর সচল রাখতে এই তেলের ব্যবহার অপরিহার্য। শিল্প মালিকদের মতে, এমনিতেই দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, তার ওপর ফার্নেস অয়েলের এই আকাশচুম্বী দামের কারণে দেশীয় পণ্যের উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশি পণ্য প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা হারাবে এবং দেশীয় বাজারেও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আরও একদফা বৃদ্ধি পাবে। সামগ্রিকভাবে, বিইআরসির এই মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত দেশের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে (Inflation) আরও উসকে দিতে পারে বলে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদেরা।

​সূত্র: বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন