চুক্তি না হলে ইরানের কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না: হুশিয়ারি ট্রাম্পের

চুক্তি না হলে ইরানের কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না: হুশিয়ারি ট্রাম্পের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, দিগন্ত বাংলা নিউজ: 

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে উত্তেজনা এখন চরম ও চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানকে লক্ষ্য করে এবার এ যাবৎকালের সবচেয়ে ভয়াবহ ও নজিরবিহীন হুমকি দিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তেহরান যদি খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে একটি ওয়াশিংটনের দেওয়া শর্ত মেনে কোনো চুক্তিতে রাজি না হয়, তবে তাদের এক চরম ও বিধ্বংসী পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। ট্রাম্পের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি—চুক্তি না হলে ইরানের বুকে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই চরম আক্রমণাত্মক বিবৃতির পর বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এক ভয়াবহ যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

​প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল' (Truth Social)-এ দেওয়া এক বিশেষ ও জরুরি পোস্টে এই হুমকি দেন। সেখানে তিনি সরাসরি তেহরানের নেতৃত্বকে উদ্দেশ্য করে লিখেন, ইরানের জন্য আন্তর্জাতিক সময় খুব তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে আসছে। যদি তারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে চায়, তবে তাদের এখনই অতি দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে এবং মার্কিন প্রস্তাব মেনে নিতে হবে। অন্যথায়, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির মুখে ইরানের আর কোনো কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। ট্রাম্পের এই পোস্টের পর আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আলোচনার পথ এখন পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে এবং যেকোনো মুহূর্তে সেখানে এক বড় ধরনের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু হতে পারে।

​নেতানিয়াহুর সাথে ফোনালাপ ও টাইমস অব ইসরায়েলের চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট

​ইসরায়েলের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম 'টাইмс অব ইসরায়েল'-এর একটি বিশেষ ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ট্রাম্পের এই আকস্মিক হুমকির পেছনের মূল কারণটি উন্মোচন করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের এই ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টটি আসার ঠিক কিছু সময় আগে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সাথে তাঁর এক দীর্ঘ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপ অনুষ্ঠিত হয়। এই ফোনালাপে লেবানন, সিরিয়া এবং ইরানের অভ্যন্তরে চলমান সামরিক অভিযান ও পরবর্তী কৌশলগত পদক্ষেপ নিয়ে দুই নেতার মধ্যে নিবিড় আলোচনা হয়। নেতানিয়াহুর সাথে কথা বলার পরপরই ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই চরম হুমকি সামনে আসায় কূটনৈতিক মহল মনে করছে, ওয়াশিংটন ও তেল আবিব যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে এক চূড়ান্ত সামরিক অ্যাকশন নেওয়ার ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করে ফেলেছে।

​প্রকৃতপক্ষে, ইরানের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন কঠোর ও ধ্বংসাত্মক হুমকি এবারই প্রথম নয়। এর আগেও তিনি একাধিকবার হুমকি দিয়েছিলেন যে, যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে ইরান যদি আমেরিকার তৈরি করা খসড়া চুক্তিতে স্বাক্ষর না করে, তবে প্রয়োজনে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ইরানের পুরো প্রাচীন সভ্যতা ও সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়া হবে। মাত্র কয়েকদিন আগেই হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প আক্ষেপের সুরে বলেছিলেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধবিরতি বা শান্তি প্রক্রিয়া এখন পুরোপুরি ‘মুমূর্ষু অবস্থায়’ রয়েছে। ফলে এটি পরিষ্কার যে, ট্রাম্প প্রশাসন এখন কূটনৈতিক আলোচনার চেয়ে সামরিক শক্তি প্রয়োগের পথেই হাঁটতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে।

আরও পড়ুন: দেশের বাজারে ফার্নেস অয়েলের দাম রেকর্ড বেড়েছে, লিটারে ১৮.৮৫ টাকা বৃদ্ধি

দেশের বাজারে ফার্নেস অয়েলের দাম রেকর্ড বেড়েছে, লিটারে ১৮.৮৫ টাকা বৃদ্ধি

​আগামী এক-দুই দিনের মধ্যেই যুদ্ধের আশঙ্কা: দোহা ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণ

​চলমান এই তীব্র সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধাবস্থার মাঝে কাতার ভিত্তিক কাতার ডট নেট এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর নজর কেড়েছে কাতার ভিত্তিক বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান 'দোহা ইনস্টিটিউট অব গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ'-এর মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের অত্যন্ত প্রভাবশালী অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরির এক বিস্ফোরক বিশ্লেষণ। তিনি বর্তমান পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, পরিস্থিতি যেদিকে মোড় নিয়েছে তাতে মনে হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলি যৌথ বাহিনী আগামী এক বা দুদিনের মধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ পুনরায় শুরু করতে পারে।

​অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম 'আল জাজিরা'-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই সম্ভাব্য যুদ্ধের পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের চারপাশে বর্তমানে এমন কিছু লোক অবস্থান করছেন, যারা তাকে ক্রমাগত যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন এবং অত্যন্ত উগ্র সামরিক পরামর্শ দিচ্ছেন। এই যুদ্ধবাজ পরামর্শদাতাদের তালিকার শীর্ষে রয়েছেন স্বয়ং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। এর পাশাপাশি ট্রাম্পের নিজের প্রশাসনের ভেতরেই পেন্টাগন ও জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলে বেশ কয়েকজন ‘অত্যন্ত যুদ্ধবাজ ব্যক্তি’ (Hawkish Officials) গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণী পদে বসে রয়েছেন, যারা মনে করেন ইরান সংকটের একমাত্র সমাধান হলো দেশটির ওপর একতরফা সামরিক হামলা চালানো।

​ইরানি প্রতিরোধ, শি জিনপিংয়ের সাথে বৈঠক এবং ট্রাম্পের হতাশা

​অধ্যাপক এলমাসরি তার বিশ্লেষণে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দিক উন্মোচন করেছেন। তিনি জানান, ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর যে ধরণের চরম অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ সৃষ্টি করেছিলেন, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানিদের সম্পূর্ণভাবে আমেরিকার কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা। কিন্তু তেহরানের বর্তমান নেতৃত্ব ও বিপ্লবী গার্ডস (IRGC) মার্কিন চাপের মুখে বিন্দুমাত্র মাথা নত না করে উল্টো নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা বাড়িয়ে ওয়াশিংটনের সেই আশা ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। ইরানিদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত আত্মসমর্পণ না পেয়ে ট্রাম্পের মধ্যে এক ধরণের গভীর রাজনৈতিক ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে।

​এছাড়া, ট্রাম্প আশা করেছিলেন যে ইরানকে নিয়ন্ত্রণে আনতে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলো তাকে সাহায্য করবে এবং এই বিষয়ে শান্তি আলোচনা সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে এগোবে। বিশেষ করে চীনের বেইজিংয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের (Xi Jinping) সাথে সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত ট্রাম্পের উচ্চপর্যায়ের শীর্ষ সম্মেলনে (Summit) ইরান ইস্যুতে বেইজিংয়ের কাছ থেকে ট্রাম্পের এক বিশাল ও উচ্চ প্রত্যাশা ছিল। ট্রাম্প ভেবেছিলেন চীন হয়তো ইরানের তেল আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তেহরানকে চুক্তি করতে বাধ্য করবে। কিন্তু বেইজিং বিশ্ব বাণিজ্যের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষায় মার্কিন একতরফা নীতিতে সায় দেয়নি। চীনের এই ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান ট্রাম্পকে আরও বেশি ক্ষিপ্ত করে তুলেছে। যার ফলেই তিনি এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইসরায়েলকে সাথে নিয়ে ইরানের ওপর এক মহাবিদ্ধংসী হামলার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘমেয়াদী ধ্বংসযজ্ঞের মুখোমুখি করতে পারে।

​সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল ও আল জাজিরা

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন