শাহজাদপুরে পারিবারিক কলহের নৃশংস পরিণতি: ১৮ বছরের গৃহবধূ মিমকে গলাটিপে হত্যা, ঘাতক স্বামী আটক

শাহজাদপুরে পারিবারিক কলহের নৃশংস পরিণতি: ১৮ বছরের গৃহবধূ মিমকে গলাটিপে হত্যা, ঘাতক স্বামী আটক
ছবি: সংগৃহীত
 প্রতিবেদন: সুফিয়ান নোমান / দিগন্ত বাংলা নিউজ

শাহজাদপুর: উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার সিরাজগঞ্জ জেলার অন্যতম শিল্প ও ব্যবসা সমৃদ্ধ উপজেলা শাহজাদপুরে পারিবারিক অভ্যন্তরীণ বিরোধের এক চরম নৃশংস ও হৃদয়বিদারক বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। তুচ্ছ পারিবারিক কলহ ও বাদানুবাদের জেরে মোছাঃ মিম আক্তার (১৮) নামের এক অত্যন্ত উঠতি বয়সের তরুণী গৃহবধূকে নির্মমভাবে গলাটিপে শ্বাসরোধ করে হত্যা করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তার আপন স্বামী মোঃ রাসেলের (২০) বিরুদ্ধে। বিয়ের মাত্র কিছুদিনের মাথায় এক কিশোরী বধূর এমন করুণ ও অকাল পরিণতিতে পুরো এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয় থানা পুলিশ অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং অভিযুক্ত পাষণ্ড স্বামী মোঃ রাসেলকে ঘটনাস্থল থেকেই হাতেনাতে আটক করতে সক্ষম হয়েছে। গত ৯ই জুলাই, বৃহস্পতিবার রাতে শাহজাদপুর উপজেলার মশিপুর সরিষাকোল এলাকায় এই নৃশংস খুনের ঘটনাটি ঘটে, যা পুরো উপজেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং পারিবারিক সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।

​ঘটনার নির্মম পটভূমি: যেভাবে শুরু হলো দাম্পত্য বিবাদ

​স্থানীয় বাসিন্দা, প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শাহজাদপুর উপজেলার মশিপুর সরিষাকোল এলাকার বাসিন্দা মোঃ রাসেলের সাথে মিম আক্তারের বিয়ে হয়েছিল অল্প কিছুদিন আগে। তাদের সংসার জীবন শুরু হতে না হতেই নানা ধরণের ছোটখাটো পারিবারিক ও সাংসারিক বিষয় নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়শই মনোমালিন্য তৈরি হতো। গত ৯ই জুলাই, বৃহস্পতিবার রাতের খাবার খাওয়ার পর পারিবারিক একটি সাধারণ বিষয়কে কেন্দ্র করে মিম আক্তারের সাথে তার স্বামী রাসেলের তীব্র কথা-কাটাকাটি ও বাদানুবাদ শুরু হয়।

আরও পড়ুন: শাহজাদপুরের অবহেলিত উন্নয়নে ২৫ দফা দাবি: নাগরিক কমিটির স্মারকলিপি ও বিশাল মানববন্ধন

​রাত বাড়ার সাথে সাথে রাসেলের ক্ষোভ ও রাগের মাত্রা কোনো প্রকার নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়। একপর্যায়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে রাসেলের ভেতরের হিংস্র রূপটি প্রকাশ পায় এবং সে তার তরুণী স্ত্রী মিমের ওপর শারীরিক নির্যাতন শুরু করে। মিম আত্মরক্ষা করার চেষ্টা করলেও রাসেলের শারীরিক শক্তির কাছে তিনি পরাস্ত হন। একপর্যায়ে ক্ষিপ্ত ও উন্মত্ত রাসেল তার নিজের দুই হাত দিয়ে মিম আক্তারের গলা শক্ত করে চেপে ধরে। মিম বাঁচার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করলেও তীব্র শ্বাসরোধের ফলে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিছানায় ঢলে পড়েন এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু নিশ্চিত হয়।

​পুলিশের ঝটিকা অভিযান ও ঘটনাস্থল থেকে ঘাতক স্বামী আটক

​মশিপুর সরিষাকোল এলাকার ওই বাড়িটি থেকে অস্বাভাবিক গোঙানি এবং পরবর্তীতে নীরবতা দেখে প্রতিবেশীদের মনে সন্দেহের দানা বাঁধে। একপর্যায়ে মিমের নিথর দেহ ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় সচেতন নাগরিকেরা কালক্ষেপণ না করে বিষয়টি শাহজাদপুর থানা পুলিশকে অবহিত করেন। খবর পাওয়া মাত্রই শাহজাদপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. সাইফুল ইসলামের কড়া নির্দেশনায় পুলিশের একটি বিশেষ চৌকস টিম দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘটনাস্থলে রওনা হয়।

​গত ৯ই জুলাই রাত ঠিক ৯:০০ টার দিকে ওসির স্বশরীরে নেতৃত্বে পুলিশের দল উপজেলার মশিপুর সরিষাকোলের ওই দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। পুলিশ ঘরে প্রবেশ করে দেখতে পায় মিম আক্তারের নিথর দেহটি পড়ে রয়েছে। ঘটনার আকস্মিকতায় অভিযুক্ত স্বামী মোঃ রাসেল সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু পুলিশের বিচক্ষণতা ও চারদিক থেকে ঘেরাও করার কারণে পালানোর কোনো সুযোগ না পেয়ে ঘটনাস্থল থেকেই আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে ঘাতক রাসেল।

​সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি ও পুলিশের আইনি তৎপরতা

​ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর পুলিশ প্রথম কাজ হিসেবে পুরো অপরাধস্থলটিকে (Crime Scene) সাধারণ মানুষের প্রবেশ থেকে সুরক্ষিত করে। এরপর অফিসার ইনচার্জের উপস্থিতিতে নারী পুলিশ সদস্যদের সহযোগিতায় নিহতের মরদেহের প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট বা সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়।

​সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির সময় পুলিশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করেছে:

  • ​নিহতের গলার চারপাশে স্পষ্ট কালচে ও লালচে আঙুলের চাপের দাগ রয়েছে, যা প্রমাণ করে তাকে অত্যন্ত শক্তভাবে চেপে ধরে শ্বাসরোধ করা হয়েছিল।
  • ​মৃত্যুর পূর্বে ধস্তাধস্তির কারণে শরীরের কিছু অংশে সামান্য আঘাতের চিহ্ন পরিলক্ষিত হয়েছে।
  • ​সুরতহাল শেষে পুলিশ লাশটিকে ময়নাতদন্তের আইনানুগ প্রক্রিয়ার জন্য সম্পূর্ণ নিজেদের হেফাজতে নেয়।

​পিতৃ হৃদয়ের হাহাকার ও এলাকায় তীব্র গণক্ষোভ

​নিহত মিম আক্তার ছিলেন শাহজাদপুর স্থানীয় এলাকার অত্যন্ত সাধারণ ও খেটে খাওয়া মানুষ আব্দুল আলিমের আদরের মেয়ে। মিমকে বিয়ে দিয়ে সুখী দেখতে চেয়েছিলেন তার বাবা, কিন্তু বিয়ের অল্পদিনের মাথায় মেয়ের এমন বীভৎস ও রক্তাক্ত লাশের সংবাদ পেয়ে বৃদ্ধ পিতা আব্দুল আলিম বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। তার বুকফাটা আর্তনাদ ও চোখের পানিতে মশিপুর সরিষাকোল এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।

​এই নির্মম ও কাপুরুষোচিত হত্যাকাণ্ডের খবর পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে শত শত সাধারণ মানুষ রাসেলের বাড়ির সামনে ভিড় জমান এবং এই পৈশাচিক ঘটনার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। প্রতিবেশীরা জানান, রাসেল যে এতখানি ভয়ঙ্কর ও খুনি প্রকৃতির হতে পারে, তা তারা আগে কল্পনাও করতে পারেননি। সামান্য কথা-কাটাকাটির জেরে একটি ১৮ বছরের মেয়ের জীবন প্রদীপ এভাবে নিভিয়ে দেওয়ার বিচার চেয়ে এলাকাবাসী ঘাতক রাসেলের সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন।

​শাহজাদপুর থানার ওসির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও মামলার বিবরণ

​এই চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক গৃহবধূ হত্যার বিষয়ে শাহজাদপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমের কাছে আনুষ্ঠানিক তথ্য পেশ করেছেন। তিনি জানান, "আমরা ৯ই জুলাই রাতে ঘটনাটি জানার সাথে সাথেই অ্যাকশনে যাই। অত্যন্ত দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে মূল আসামিকে ঘটনাস্থল থেকেই গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে, অন্যথায় সে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যেত। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক একটি ঘটনা।"

আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জে যাত্রীবাহী বাসের পেছনে সজোরে ধাক্কা: অটোরিকশার মা-ছেলে নিহত, আহত ৩

​তিনি আরও জানান, এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের পিতা আব্দুল আলিম বাদী হয়ে শাহজাদপুর থানায় জামাতার বিরুদ্ধে একটি সুনির্দিষ্ট দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় নিয়মিত হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলার প্রেক্ষিতে ইতিমধ্যেই রাসেলকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। নিহত মিম আক্তারের মরদেহটি চূড়ান্ত এবং বৈজ্ঞানিক ময়নাতদন্তের (Post-Mortem) জন্য সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতাল (সিরাজগঞ্জ মেডিক্যাল) মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন হাতে পাওয়া মাত্রই আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে এবং দ্রুততম সময়ে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য পুলিশ সর্বোচ্চ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।

​পারিবারিক সহিংসতা ও সামাজিক অবক্ষয়: একটি সম্পাদকীয় বিশ্লেষণ

​শাহজাদপুরের মশিপুর সরিষাকোলের এই ঘটনাটি আমাদের দেশের বর্তমান সমাজব্যবস্থায় পারিবারিক সহিংসতা ও সহনশীলতাহীন দাম্পত্য জীবনের এক করুণ প্রতিচ্ছবি। মাত্র ১৮ বছর বয়সী মিম আক্তার এবং ২০ বছর বয়সী মোঃ রাসেলের এই দাম্পত্য জীবনের করুণ সমাপ্তি প্রমাণ করে যে, সমাজে অল্প বয়সে বিয়ের পর রাগ নিয়ন্ত্রণ ও মানসিক পরিপক্কতার কতটা অভাব রয়েছে। সামান্য পারিবারিক কলহ কীভাবে একটি খুন বা অপরাধে রূপ নিতে পারে, তা সমাজবিজ্ঞানীদের জন্য এক বড় উদ্বেগের কারণ। যুবসমাজের মধ্যে নৈতিক শিক্ষার অভাব এবং ক্ষণস্থায়ী রাগের বশবর্তী হয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা কঠোরভাবে দমন করা না গেলে নারীদের পারিবারিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। "দিগন্ত বাংলা নিউজ" মনে করে, ঘাতক রাসেলের বিরুদ্ধে দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা হলে তা সমাজের অন্যান্য অপরাধপ্রবণ ও সহিংস মনমানসিকতার স্বামীদের জন্য একটি কঠোর সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে। মিমের আত্মার শান্তি কামনা এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আমাদের গভীর সমবেদনা।

নিউজ সূত্র: শাহজাদপুর থানা পুলিশ প্রশাসন ও মশিপুর সরিষাকোল এলাকাবাসী।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন