জাতীয় ডেস্ক: প্রতিবেদক: আবু সুফিয়ান নোমান / দিগন্ত বাংলা নিউজ
ঢাকা: দেশের অবহেলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এবং ছানিজনিত অন্ধত্বের অভিশাপ থেকে ১০ লাখ মানুষকে মুক্ত করতে এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ সরকার। ছানি অপারেশনের অভাবে দেশের যে বিশাল জনগোষ্ঠী বর্তমানে দৃষ্টিহীনতা বা তীব্র দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন, তাদের সবার চোখের আলো ফিরিয়ে দিতে দেশব্যাপী সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এবং অত্যন্ত সুলভ মূল্যে আধুনিক ছানি অপারেশন বা সার্জারির এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আজ সোমবার (৬ জুলাই, ২০২৬) বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে অন্ধত্ব প্রতিরোধ ও চোখের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়োজিত বিশ্ববিখ্যাত আন্তর্জাতিক সংস্থা আইএপিবি (IAPB)-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পিটার হল্যান্ডের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে সরকারের এই অভূতপূর্ব চিকিৎসা মহাপরিকল্পনার কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নেতৃত্ব ও গলোবাল আই হেলথ সামিট
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত আজ এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের চিকিৎসাসেবা খাতের এক বিশাল আন্তর্জাতিক অর্জনের কথা ঘোষণা করেন। তিনি জানান, আগামী নভেম্বর মাসে ক্যারিবীয় অঞ্চলের দ্বীপ রাষ্ট্র অ্যান্টিগায় প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং প্রথম চিকিৎসা সম্মেলন ‘গ্লোবাল সামিট অন আই হেলথ’ (বৈশ্বিক চক্ষু স্বাস্থ্য সম্মেলন)। এই আন্তর্জাতিক ও মর্যাদাপূর্ণ সম্মেলনে মূল আয়োজক দেশ অ্যান্টিগার পাশাপাশি বাংলাদেশ অত্যন্ত গর্বের সাথে যৌথভাবে ‘কো-হোস্ট’ বা সহ-আয়োজক দেশ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব দেবে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সম্মেলনে কো-হোস্ট হিসেবে বাংলাদেশের জোরালো ভূমিকা পালনের বিষয়ে তাঁর চূড়ান্ত প্রশাসনিক অনুমোদন ও সম্মতি প্রদান করেছেন।
আরও পড়ুন: কুষ্টিয়ায় তরুণ ফুটবল সমর্থকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার: এলাকায় শোকের ছায়া
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী দেশের বর্তমান চক্ষু চিকিৎসার করুণ চিত্র ও সরকারের লক্ষ্য তুলে ধরে বলেন, "বাংলাদেশে এই মুহূর্তে সঠিক সময়ে চিকিৎসার অভাবে এবং চোখের ছানি অপারেশনের ব্যয়ভার বহন করতে না পেরে প্রায় ১০ লাখ সাধারণ ও দরিদ্র মানুষ সম্পূর্ণরূপে অন্ধ কিংবা তীব্র দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হয়ে দিন কাটাচ্ছেন। এই বিশাল ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর চোখের আলো ফিরিয়ে এনে তাদের স্বাভাবিক জীবনে পুনর্বাসন করা বর্তমান সরকারের প্রধান ও অন্যতম অঙ্গীকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে এই জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের ওপর গভীর নজর রাখছেন এবং তাঁর সরাসরি নির্দেশনায় আমরা এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছি।"
ছানি লেন্সের ট্যাক্স হ্রাস ও গ্রামীণ শিশুদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ
দরিদ্র ও সাধারণ মানুষের চোখের চিকিৎসার খরচ এক ধাক্কায় সাধারণের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসতে বর্তমান সরকার বেশ কিছু আইনি ও অর্থনৈতিক সংস্কার সাধন করেছে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি উপশম এবং অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয় কমাতে সরকারের বর্তমান বাজেটেই একটি বিশেষ ঘোষণা কার্যকর করা হয়েছে। চোখের ছানি অপারেশনের পর চোখের ভেতরে যে কৃত্রিম লেন্সটি (Intraocular Lens) স্থাপন করতে হয়, তার ওপর আমদানিকৃত সমস্ত অতিরিক্ত কর বা ট্যাক্স সম্পূর্ণ হ্রাস করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই দূরদর্শী সিদ্ধান্তের ফলে দেশের বেসরকারি ও দাতব্য চিকিৎসালয়গুলোতেও চোখের ছানি অপারেশনের খরচ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে, যা দেশের দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য একটি পরম স্বস্তির খবর।
এর পাশাপাশি, দেশের গ্রামীণ জনপদের স্কুলপড়ুয়া শিশুদের চোখের সুরক্ষায় এক নতুন ও যুগোপযোগী কর্মসূচির কথা ঘোষণা করেছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। তিনি বলেন:
"গ্রাম-গঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেক সুবিধাবঞ্চিত শিশু রয়েছে, যারা চোখের বিভিন্ন সমস্যা বা ত্রুটির কারণে সঠিকভাবে দেখতে পায় না। কেবল একটি সাধারণ চশমা কিংবা প্রাথমিক চোখ পরীক্ষার অভাবে এই শিশুদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং তাদের স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ থমকে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী এই কোমলমতি শিশুদের চক্ষু স্বাস্থ্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি আন্তর্জাতিক সংস্থা আইএপিবি-কে দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের শিশুদের বিনামূল্যে চোখ পরীক্ষা ও চশমা বিতরণের জন্য একটি সমন্বিত কর্মসূচি হাতে নেওয়ার বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক এই নামী সংস্থাটিও আমাদের এই জনকল্যাণমূলক প্রস্তাবে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক ও প্রযুক্তিগত আশ্বাস প্রদান করেছে।"
আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা
সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে আন্তর্জাতিক চক্ষু সংস্থাগুলোর বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম আইএপিবি’র (International Agency for the Prevention of Blindness) প্রধান নির্বাহী পিটার হল্যান্ড বাংলাদেশের এই মহতি উদ্যোগ এবং দীর্ঘদিনের বৈশ্বিক নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, আগামী ২ নভেম্বর অ্যান্টিগার মাটিতে অনুষ্ঠিতব্য এই ‘গ্লোবাল সামিট’ বিশ্বনেতাদের জন্য এক অনন্য ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি করবে, যেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীগণ একত্রিত হয়ে নিজ নিজ দেশের চক্ষু স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার ও নতুন পরিকল্পনা নিয়ে হাজির হবেন।
আরও পড়ুন: জাতীয় জাদুঘরে লিওনেল মেসির স্বাক্ষরিত জার্সি: ফুটবলপ্রেমীদের উপচে পড়া ভিড়
বাংলাদেশকে বৈশ্বিক চক্ষু চিকিৎসা খাতের অন্যতম পথিকৃৎ ও পথপ্রদর্শক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে পিটার হল্যান্ড তাঁর বিবৃতিতে উল্লেখ করেন:
বিশ্বজুড়ে মানুষের চোখের দৃষ্টি সুরক্ষায় এবং অন্ধত্ব নিবারণে বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দৃষ্টিশক্তি ও চক্ষু স্বাস্থ্য বিষয়ক ইতিহাসের সর্বপ্রথম এবং ঐতিহাসিক প্রস্তাবটি বিশ্বমঞ্চে উত্থাপন বা স্পন্সর করেছিল বাংলাদেশ।
কয়েক দশক ধরে তৃণমূল পর্যায়ে চক্ষু চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি রোল মডেল।
আইএপিবি’র প্রধান নির্বাহী আরও জানান যে, বাংলাদেশে বর্তমান চক্ষু চিকিৎসাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এবং আধুনিকায়নে সরকারের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (NGO) কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামীণ পর্যায়ে ছানি অপারেশনের গুণগত মান নিশ্চিত করা, আধুনিক সার্জারি ক্যাম্প পরিচালনা এবং সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় মানসম্মত চশমা পৌঁছে দেওয়ার মতো দীর্ঘমেয়াদী প্রোগ্রামগুলোতে আন্তর্জাতিক তহবিল থেকে বড় ধরনের বিনিয়োগ ও কারিগরি সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।
আগামী নভেম্বরের গ্লোবাল সামিটে বাংলাদেশের এই জোরালো ও সক্রিয় অংশীদারিত্ব এবং সহ-আয়োজকের ঐতিহাসিক ভূমিকা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও চিকিৎসা খাতের ভাবমূর্তিকে আরও অনেক বেশি উজ্জ্বল ও সমুন্নত করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন পিটার হল্যান্ড। সরকারের এই মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বিশেষায়িত চক্ষু ইনস্টিটিউটগুলোকে একযোগে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সংক্ষিপ্ত সংবাদ সূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।