কুষ্টিয়ায় তরুণ ফুটবল সমর্থকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার: এলাকায় শোকের ছায়া

কুষ্টিয়ায় তরুণ ফুটবল সমর্থকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার: এলাকায় শোকের ছায়া
ছবি: সংগৃহীত

সারাদেশ ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি: কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলায় এক আবেগপ্রবণ তরুণের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। উপজেলার কয়া ইউনিয়নে নিজ শয়নকক্ষ থেকে ওই তরুণের মরদেহ উদ্ধার করেন তাঁর পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দারা। নিহত তরুণ আন্তর্জাতিক ফুটবলে ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিলের একজন অন্ধ ও একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

পারিবারিক বা মানসিক কোনো ক্ষোভের কারণে তিনি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। মাত্র ১৯ বছর বয়সী এই তরুণের এমন অকাল ও আকস্মিক মৃত্যুতে তাঁর পরিবারটি সম্পূর্ণ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে তাঁর কোলে থাকা মাত্র দুই মাস বয়সী এক অবুঝ কন্যাসন্তান ও তাঁর স্ত্রীর আহাজারিতে পুরো ঘোড়াইঘাট এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে।

নিঝুম ঘরে ঝুলন্ত লাশ ও স্বজনদের উদ্ধার তৎপরতা

স্থানীয় বাসিন্দা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার সূত্রে জানা যায়, অত্যন্ত বেদনাদায়ক এই ঘটনাটি ঘটেছে কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার অন্তর্গত কয়া ইউনিয়নের ঘোড়াইঘাট নামক প্রত্যন্ত এলাকায়। ওই গ্রামের বাসিন্দা হোসেন মিস্ত্রীর সেজো ছেলে রতন (১৯) প্রতিদিনের মতোই নিজের কাজকর্ম শেষে বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। তবে ঘটনার সময় তিনি সবার অলক্ষ্যে নিজের শয়নকক্ষে প্রবেশ করে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেন এবং ঘরের আড়ার সাথে ওড়না বা রশি পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান।

বেশ কিছু সময় পার হয়ে গেলেও রতনের কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে পরিবারের সদস্যদের মনে গভীর সন্দেহের দানা বাঁধে। তারা রতনের ঘরের দরজার সামনে গিয়ে বারবার ডাকাডাকি করলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া মিলছিল না। একপর্যায়ে ব্যাকুল হয়ে বাড়ির লোকজন ঘরের জানালার কাছে যান এবং জানালার ফাঁক দিয়ে উঁকি দেন। এ সময় ঘরের ভেতরের দৃশ্য দেখে তারা স্তব্ধ হয়ে যান; তারা রতনকে ঘরের সিলিং বা আড়ার সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান।

আরও পড়ুন: জামালপুরে গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মামলা: ৭ আসামির মৃত্যুদণ্ডের ঐতিহাসিক রায়

তাদের চিৎকার ও কান্নাকাটিতে আশেপাশের প্রতিবেশীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। স্থানীয় বাসিন্দারা তাৎক্ষণিকভাবে ঘরের কাঠের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং ঝুলন্ত অবস্থা থেকে রতনকে নিচে নামিয়ে আনেন। সে সময় তাঁর শরীরে সামান্য প্রাণস্পন্দন রয়েছে এমন আশ্বাসে তাকে উদ্ধার করে দ্রুত স্থানীয় এক গ্রামীণ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে সেখানে রতনকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে কর্তব্যরত চিকিৎসক অত্যন্ত দুঃখের সাথে তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।

পুলিশের সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফনের অনুমতি

তরুণের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মাধ্যমে বিষয়টি কুমারখালী থানা পুলিশকে অবহিত করা হয়। সংবাদ পাওয়ার পরপরই কুমারখালী থানার তদন্ত কর্মকর্তা আমিরুল ইসলাম একদল ফোর্সসহ ঘটনাস্থল এবং চিকিৎসকের চেম্বারে ছুটে যান। পুলিশ কর্মকর্তা আমিরুল ইসলাম নিহতের মরদেহের প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদন (Inquest Report) তৈরি করেন এবং মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীদের সাথে বিস্তারিত কথা বলেন।

সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির সময় নিহতের পরিবার এবং কয়া ইউনিয়নের স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ পুলিশের কাছে একটি বিশেষ আবেদন বা প্রস্তাব পেশ করেন। তারা জানান যে, রতনের মৃত্যুর পেছনে অন্য কারো কোনো হাত বা ষড়যন্ত্র নেই। এটি একটি সম্পূর্ণ আবেগতাড়িত বা মানসিক অবসাদজনিত আত্মহননের ঘটনা। তাই তারা রতনের মরদেহ নিয়ে আর কোনো আইনি জটিলতা বা ময়নাতদন্ত (Autopsy) করাতে চান না।

পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিতভাবে জানানো হয় যে, রতনের এই রহস্যজনক বা আকস্মিক মৃত্যু নিয়ে তাদের কোনো প্রকার আপত্তি, সন্দেহ কিংবা কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। কোনো পক্ষ থেকে কোনো আইনি জটিলতা বা অভিযোগ উত্থাপিত না হওয়ায় এবং মানবিক দিক বিবেচনা করে কুমারখালী থানা পুলিশ ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে এবং ধর্মীয় নিয়ম মেনে দাফন করার আনুষ্ঠানিক অনুমতি প্রদান করে।

দুই মাসের কন্যাসন্তান ও পরিবারে চরম বিপর্যয়

নিহত রতন পেশাগত বা ব্যক্তিগত জীবনে বেশ সজ্জন স্বভাবের ছিলেন এবং ফুটবল খেলা নিয়ে তাঁর বন্ধুদের মাঝে ব্যাপক উন্মাদনা ছিল। তিনি ব্রাজিলের দলটিকে মনেপ্রাণে ভালোবাসতেন। তবে ফুটবলের আসর বা অন্য কোনো ব্যক্তিগত হতাশা তাঁর এই চরম সিদ্ধান্তের পেছনে কাজ করেছে কিনা, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

আরও পড়ুন: প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের পারমাণবিক সাবমেরিন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা: কোণঠাসা পশ্চিমা বিশ্ব

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, রতন মাত্র কিছুদিন আগে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন এবং তাঁর সংসারে মাত্র দুই মাস বয়সী একটি ফুটফুটে কন্যাসন্তান রয়েছে। যে বয়সে বাবার আদর পাওয়ার কথা, সেই অবুঝ বয়সেই পিতৃহারা হলো এই শিশুটি। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পুলিশি অনুমতি মেলা শেষে আত্মীয়-স্বজনরা রতনের মরদেহ নিজ বাড়িতে নিয়ে যান এবং স্থানীয় কবরস্থানে তাঁর দাফন ও জানাজার চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করছিলেন।

তরুণ সমাজের মানসিক স্বাস্থ্য ও সচেতনতার তাগিদ

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর এই ঘটনাটি দেশের তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য এবং খেলার প্রতি অতি-উন্মাদনার ক্ষতিকর দিকটিকে আবারও সামনে এনেছে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ফুটবল বা অন্য কোনো খেলাকে কেন্দ্র করে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা কিংবা সামান্য পারিবারিক কলহে আত্মহত্যার মতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। এই ধরণের ঘটনা রোধে পরিবার ও সমাজে তরুণদের কাউন্সেলিং করা এবং যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তাদের পাশে থাকা অত্যন্ত জরুরি। কুমারখালী থানা পুলিশ স্থানীয় যুবসমাজকে যেকোনো ধরণের অসামাজিক বা আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

সংক্ষিপ্ত সংবাদ সূত্র: কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানা পুলিশ ও কয়া ইউনিয়ন পরিষদ।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন