ট্রাম্পের মুখোমুখি নেতানিয়াহু: ওয়াশিংটন-তেল আবিব চরম সংঘাতের পথে

ট্রাম্পের মুখোমুখি নেতানিয়াহু: ওয়াশিংটন-তেল আবিব চরম সংঘাতের পথে
ছবি: সংগৃহীত

লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন বনাম ট্রাম্পের বৈশ্বিক শান্তি পরিকল্পনা: হোয়াইট হাউসের অবাধ্য হয়ে কতদূর যাবেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও কৌশলগত মিত্র ইসরায়েলের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কে এই মুহূর্তে এক নজিরবিহীন ফাটল এবং টানাপোড়েন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির দৃশ্যপটে বর্তমানে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কি শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সামলাতে পারবেন? লেবাননে চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এবং সামরিক আগ্রাসন বন্ধ করা নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে নতুন করে তীব্র মতবিরোধ ও প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তর থেকে যুদ্ধবিরতির জন্য বারবার চাপ দেওয়া হলেও, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই শান্তি পরিকল্পনাকে এক প্রকার বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছেমতো সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন নেতানিয়াহু। যার ফলে বিপাকে পড়েছে ট্রাম্পের বিশ্ব রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তারের নতুন রূপরেখা।

## ওয়াশিংটন-তেল আবিব চরম বিরোধের নেপথ্যে: ট্রাম্প-ইরান ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক

আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে গুঞ্জন চলছে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবার মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্যটি ঘরে তুলতে চান। এই লক্ষ্যেই অতি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অত্যন্ত গোপন ও ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তির অন্যতম মূল শর্ত ও ভিত্তি ছিল—লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের সমস্ত ফ্রন্টে সব ধরণের যুদ্ধ ও সামরিক আগ্রাসন চিরতরে বন্ধ করতে হবে।

আরও পড়ুন: শাহজাদপুরের প্রবীণ ইসলামী নেতা মাওলানা আবদুস ছবুরের ইন্তেকাল, জানাজায় এমপি রফিকুল ইসলাম খান

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, এই আন্তর্জাতিক চুক্তি ও বৈশ্বিক যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতির তোয়াক্কা না করে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF) লেবাননের ভূখণ্ডে অনবরত বিমান হামলা ও স্থল অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, লেবাননের যেসব কৌশলগত অঞ্চল ইসরায়েল ইতিমধ্যে অবৈধভাবে দখল করে নিয়েছে, আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও সেসব এলাকা থেকে নিজেদের সেনা প্রত্যাহার করতে বা দখল ছাড়তে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানিয়েছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইসরায়েলের এই বেপরোয়া ও একগুঁয়ে আচরণের কারণে ট্রাম্প প্রশাসন এখন প্রকাশ্যেই গভীর অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষায় হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো মূল্যে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ও স্থায়ী শান্তি চায়। তিনি আশা করেন যে—লেবানন, হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েলসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই এই বহুল প্রতীক্ষিত আন্তর্জাতিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি মেনে চলবে।

## হোয়াইট হাউসের প্রকাশ্য অসন্তোষ: ইসরায়েলকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের নজিরবিহীন তোপ

নেতানিয়াহু সরকারের এই আগ্রাসী নীতির কারণে এবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘরের ভেতর থেকেই তীব্র সমালোচনা ধেয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রভাবশালী ভাইরাস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স (JD Vance) এবার ইসরায়েলের সামরিক নীতির বিরুদ্ধে নজিরবিহীনভাবে কঠোর ও প্রকাশ্য সমালোচনা করেছেন। তিনি তেল আবিবের যুদ্ধংদেহী মনোভাবের তীব্র নিন্দা জানিয়ে এক বিবৃতিতে বলেন:

"এটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় যে, ওয়াশিংটন যখনই কোনো শান্তি আলোচনার একদম চূড়ান্ত কাছাকাছি পৌঁছায়, ঠিক তখনই লেবাননে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে নতুন করে বড় ধরণের সামরিক হামলা শুরু হয়। এর ফলে প্রতিবারই শত শত নিরীহ বেসামরিক মানুষ ও শিশুরা প্রাণ হারাচ্ছেন, যা অত্যন্ত নিন্দনীয়। ইসরায়েলকে মনে রাখতে হবে যে, তারা মাত্র ৯০ লাখ মানুষের একটি অত্যন্ত ছোট দেশ। শুধু সামরিক শক্তি এবং অনবরত যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে পৃথিবীর সব সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা কখনোই সম্ভব নয়। তাদেরকে কূটনীতির পথেই আসতে হবে।"

## মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূরাজনৈতিক সমীকরণ ও সংকটের মূল চিত্র

পাঠকদের সুবিধার্থে এবং ট্রাম্প-নেতানিয়াহু দ্বন্দ্বের এই আন্তর্জাতিক সংকটের বহুমাত্রিক দিকগুলো একনজরে সহজে অনুধাবন করার জন্য নিচে একটি বিশেষ তথ্য সারণী প্রদান করা হলো:

সংকটের মূল রাজনৈতিক খাতসমূহবর্তমান কূটনৈতিক পরিস্থিতি ও বিশ্বমঞ্চের প্রভাব
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রধান লক্ষ্যমার্কিন-ইরান চুক্তির সফল বাস্তবায়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অবস্থানলেবাননে হামলা অব্যাহত রাখা এবং অধিকৃত অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা।
ইরানের চূড়ান্ত আলটিমেটামলেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধ না হলে কোনো চূড়ান্ত শান্ত চুক্তিতে সই নয়।
কূটনৈতিক বড় ধাক্কাউদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত মার্কিন-ইরান উচ্চপর্যায়ের বৈঠক স্থগিত।
ইসরায়েলি লবিস্টদের তৎপরতাট্রাম্পের ইরান চুক্তির বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনে শক্তিশালী লবিস্টদের তীব্র বিরোধিতা।

## স্থগিত হলো মার্কিন-ইরান বৈঠক: শান্তি প্রক্রিয়া কি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে?

ইসরায়েলের এই একতরফা ও আগ্রাসী যুদ্ধনীতির কারণে ট্রাম্পের আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা এখন এক মস্ত বড় অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। ইরান শুরু থেকেই অত্যন্ত স্পষ্ট এবং দৃঢ় ভাষায় ওয়াশিংটনকে জানিয়ে আসছে যে, লেবাননের ওপর ইসরায়েলি বিমান হামলা এবং হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান সম্পূর্ণ বন্ধ না হলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো প্রকার চূড়ান্ত শান্তি চুক্তিতে সই করবে না। ইরানের এই অনমনীয় অবস্থানের কারণে এবং ইসরায়েলের অনবরত যুদ্ধংদেহী আচরণের জেরে ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পূর্বনির্ধারিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক বৈঠক স্থগিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লেবানন ইস্যুই এখন ট্রাম্প-ইরান ঐতিহাসিক চুক্তির সবচেয়ে বড় ও কঠিন পরীক্ষা। যদি লেবাননে অবিলম্বে যুদ্ধ থামানো না যায়, তবে ট্রাম্পের এই পুরো বিশ্ব শান্তি প্রক্রিয়াটি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে।

আরও পড়ুন: রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান নিরাপদ প্রত্যাবাসন: জাতিসংঘে বাংলাদেশ

কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ত্রিতা পার্সি এই বিষয়ে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ দাঁড় করিয়েছেন। তিনি বলেন, "মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবার ইসরায়েলের ওপর আগের যেকোনো সরকারের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর অবস্থানে আছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ইরান চুক্তিকে তাঁর জীবনের অন্যতম বড় বৈশ্বিক রাজনৈতিক সাফল্য ও নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন। তাই তিনি যেকোনো মূল্যে তাঁর এই চুক্তি রক্ষা করতে চান এবং নেতানিয়াহুর জন্য তিনি এটি হাতছাড়া করবেন না।"

অন্যদিকে, সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ম্যাথিউ ডাস অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "এটা বিশ্ববাসীর কাছে অনেক দিন ধরেই অত্যন্ত পরিষ্কার যে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুই এখন সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে অশান্তি, বিশৃঙ্খলা এবং রক্তপাতের সবচেয়ে বড় মূল কারণগুলোর একটি। গাজায় এতদিন ধরে যে যুদ্ধবিরতি অর্জিত হয়নি, তার জন্য এককভাবে তিনিই দায়ী। আর এখন ইরানের সঙ্গে আমেরিকার ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি বিলম্বিত হওয়ার পেছনেও তাঁর এই রাজনৈতিক জেদ ও ব্যক্তিগত স্বার্থই মূল ভূমিকা পালন করছে।"

## ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি লবির চাপ ও ট্রাম্পের অগ্নিপরীক্ষা

নেতানিয়াহু সরকার কেবল মাঠপর্যায়ে যুদ্ধ করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর তীব্র রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে। ওয়াশিংটনে সক্রিয় ইসরায়েলের অত্যন্ত প্রভাবশালী লবি সংগঠনসমূহ ইতিমধ্যেই ট্রাম্পের এই ইরান চুক্তির বিরুদ্ধে একজোট হয়ে তীব্র সমালোচনা ও লবিং শুরু করেছে। তাদের মূল দাবি হলো—আমেরিকার এই নতুন চুক্তি ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের একক সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার স্বাধীনতাকে মারাত্মকভাবে সীমিত ও খর্ব করবে।

এখন দেখার বিষয়, ডোনাল্ড ট্রাম্প এই শক্তিশালী ইসরায়েলি লবির চাপ উপেক্ষা করে এবং নেতানিয়াহুর অবাধ্যতাকে শক্ত হাতে দমন করে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে পারেন কি না। ‘দিগন্ত বাংলা নিউজ’ পোর্টালের পক্ষ থেকে আমরা মনে করি, আগামী কয়েক সপ্তাহ বৈশ্বিক রাজনীতির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও সংবেদনশীল। আন্তর্জাতিক রাজনীতি, ট্রাম্পের কূটনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রতি মুহূর্তের নির্ভরযোগ্য খবরাখবর সবার আগে প্রফেশনাল ও শতভাগ ইউনিক উপায়ে আপনাদের সামনে নিয়মিত তুলে ধরতে আমরা সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন