আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী বিশ্বমঞ্চে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন
বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী এবং জটিল মানবতাবাদী সংকটগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো রোহিঙ্গা সমস্যা। ২০১৭ সালের পর থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বিপুল সংখ্যক বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর কারণে দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে এক ধরণের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এই সংকট নিরসনে বৈশ্বিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দু জাতিসংঘে বাংলাদেশের অবস্থান পুনরুল্লেখ করা হয়েছে। জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বিশ্বমঞ্চে স্পষ্ট করে বলেছেন যে, রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র এবং চূড়ান্ত টেকসই সমাধান হলো তাদের গৌরবময় ও নিরাপদ উপায়ে নিজ দেশ মিয়ানমারে দ্রুত প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা। অন্য কোনো অন্তর্বর্তীকালীন বা বিকল্প ব্যবস্থা এই সংকটের স্থায়ী সমাধান দিতে পারবে না।
নিউইয়র্কস্থ জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আয়োজিত জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূতের গুরুত্বপূর্ণ এক ব্রিফিং সেশনে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ এই কড়া এবং বাস্তবসম্মত বার্তাটি প্রদান করে। আজ শনিবার (২০ জুন ২০২৬) নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন থেকে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই কূটনৈতিক অবস্থানের কথা গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করা হয়েছে।
## প্রায় এক দশক ধরে ১২ লাখের বেশি শরণার্থী আশ্রয়: দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়
জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের এই শুনানিতে বাংলাদেশ অত্যন্ত যৌক্তিক কিছু তথ্য-উপাত্ত বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে পেশ করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রায় এক দশক বা ১০ বছর ছুঁইছুঁই এই দীর্ঘ সময়ে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে মানবিক কারণে আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল এবং জনবহুল দেশের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদে কোনোভাবেই টেকসই নয়।
রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী তাঁর ভাষণে বলেন,
আরও পড়ুন: বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনা বিশ্বমঞ্চে ছড়াতে চায় আর্জেন্টিনা: রাষ্ট্রদূতের ঘোষণা
"রোহিঙ্গা সংকটের মূল উৎপত্তি কিন্তু বাংলাদেশে নয়, এর উৎপত্তি সম্পূর্ণভাবে মিয়ানমারে এবং এর আইনগত ও স্থায়ী সমাধানও মিয়ানমার রাষ্ট্রের ভেতরেই খুঁজে বের করতে হবে। বাংলাদেশ সম্পূর্ণ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই নিপীড়িত জনগোষ্ঠীকে সাময়িক আশ্রয় দিয়েছিল। কিন্তু আজ বাংলাদেশে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত প্রায় ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা দীর্ঘদিন যাবত অবস্থান করছেন। এর ফলে কক্সবাজার ও ভাসানচরসহ সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর ওপর মারাত্মক সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাজনিত তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় জনগণের জীবনযাত্রাও এর ফলে চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।"
রাষ্ট্রদূত আরও যোগ করেন যে, রোহিঙ্গারা নিজেরাও আর শরণার্থী শিবিরের গণ্ডিবদ্ধ জীবনে থাকতে চায় না। তাদের সাথে কথা বললে এটি স্পষ্ট যে, তারাও তাদের নাগরিক অধিকার ফিরে পেয়ে অত্যন্ত সসম্মানে নিজ ভূখণ্ডে ফিরে যেতে উন্মুখ হয়ে আছে। সুতরাং, তাদের এই ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের উচিত মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করা।
## রোহিঙ্গা সংকটের বহুমাত্রিক প্রভাব ও বর্তমান পরিস্থিতি সারণী
পাঠকদের সুবিধার্থে এবং বাংলাদেশের ওপর এই সংকটের বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব একনজরে স্পষ্ট করার জন্য নিচে একটি বিবরণী সারণী উপস্থাপন করা হলো:
| সংকটের বিভিন্ন দিক ও খাত | বাংলাদেশের ওপর সৃষ্ট নির্দিষ্ট প্রভাব ও বর্তমান চিত্র |
| আশ্রিত রোহিঙ্গার আনুমানিক সংখ্যা | ১২ লক্ষাধিক (বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম শরণার্থী শিবির)। |
| অর্থনৈতিক খাতের ওপর প্রভাব | রাষ্ট্রীয় বাজেটের ওপর বিপুল চাপ এবং আন্তর্জাতিক ত্রাণের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাওয়া। |
| পরিবেশগত ও ভৌগোলিক বিপর্যয় | কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের হাজার হাজার একর বনাঞ্চল ও জীববৈচিত্র্য সম্পূর্ণ ধ্বংস। |
| নিরাপত্তাজনিত চরম ঝুঁকি | ক্যাম্পগুলোর অভ্যন্তরে অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান, মানব পাচার এবং গ্যাং কালচারের বিস্তার। |
| একমাত্র চূড়ান্ত টেকসই সমাধান | আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যস্থতায় মিয়ানমারে নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন। |
## বৈশ্বিক অংশীদারদের প্রতি কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের জোরালো আহ্বান
সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ সবসময়ই দ্বিপাক্ষিক ও বহুমাত্রিক আলোচনার মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ ও কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে নিজেদের সুদৃঢ় অঙ্গীকার বজায় রেখেছে। তবে মিয়ানমার সরকারের সদিচ্ছার অভাব এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর চাপ প্রয়োগে ব্যর্থতার কারণে গত কয়েক বছরেও একজন রোহিঙ্গাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি।
আরও পড়ুন: রিসোর্টের ‘৫০১ নম্বর কক্ষ’ নিয়ে দীর্ঘ নীরবতা ভাঙলেন মাওলানা মামুনুল হক
বিশ্বমঞ্চের এই অচলাবস্থা ভাঙতে রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রসমূহ এবং শক্তিশালী আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি তাদের কূটনৈতিক উদ্যোগ ও দ্বিপাক্ষিক সম্পৃক্ততা আরও বহুগুণ জোরদার করার জোরালো আহ্বান জানান। তিনি বলেন, কেবল মৌখিক নিন্দা বা মানবিক সহায়তা প্রদানই এই সংকটের সমাধান নয়। মিয়ানমারের বর্তমান জান্তা ও সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের ওপর এমন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে তারা রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের দ্রুত এবং নিরাপদ নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সম্পূর্ণ অনুকূল, বৈষম্যহীন ও নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করতে বাধ্য হয়।
ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারমুক্ত নতুন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতিতে রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে যে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, জাতিসংঘের এই কঠোর ও স্পষ্ট বক্তব্য তারই প্রমাণ বহন করে। ‘দিগন্ত বাংলা নিউজ’ পোর্টালের পক্ষ থেকে আমরা মনে করি, বিশ্বনেতারা যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেন, তবে এই সংকট আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য আরও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং রোহিঙ্গা সংকটের প্রতি মুহূর্তের নির্ভরযোগ্য খাবারখবর প্রফেশনাল ও বস্তুনিষ্ঠ উপায়ে আপনাদের সামনে নিয়মিত তুলে ধরতে আমরা সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।