চূড়ান্ত চুক্তির আগে পরমাণু কর্মসূচিতে কোনো বদল নয়: অনড় অবস্থান ইরানের

চূড়ান্ত চুক্তির আগে পরমাণু কর্মসূচিতে কোনো বদল নয়: অনড় অবস্থান ইরানের
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে অন্যতম প্রধান এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি ইস্যু হলো ইরানের পরমাণু কর্মসূচি। এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি সমগ্র পশ্চিমা বিশ্বে প্রতিনিয়ত নানা ধরণের কূটনৈতিক ও সামরিক মেরুকরণ ঘটে চলেছে। এরই ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে (আইএইএ) তেহরানের পক্ষ থেকে নতুন করে কোনো পরমাণু কেন্দ্র পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানানোর যে খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে চাউর হয়েছিল, তা সম্পূর্ণ ও জোরালোভাবে নাকচ করে দিয়েছে ইরান। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের নীতিনির্ধারক মহলের পক্ষ থেকে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো পরিদর্শনের যে তথ্য প্রচার করছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তেহরান কোনো ধরণের বাহ্যিক চাপ বা মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের কাছে নতি স্বীকার করে নিজেদের পরমাণু নীতির কোনো পরিবর্তন করবে না।

আজ ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আয়োজিত এক বিশেষ সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে দেশটির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এই বিষয়ে তেহরানের চূড়ান্ত ও আনুষ্ঠানিক অবস্থান বিশ্ববাসীর সামনে স্পষ্ট করেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত পূর্ববর্তী দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক (MoU) অনুযায়ী, যতক্ষণ না পর্যন্ত একটি স্থায়ী, আইনি এবং চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ইরান তাঁর বর্তমান পরমাণু কর্মসূচির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ‘স্থিতাবস্থা’ (Status Quo) বজায় রাখবে। চূড়ান্ত কূটনৈতিক সমাধান ছাড়া পরমাণু সক্ষমতা হ্রাস বা নতুন কোনো ছাড় দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা তেহরানের নেই।

## পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের দাবি ও ইসমাইল বাঘাইয়ের কড়া জবাব

সম্প্রতি ইউরোপীয় ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি মূলধারার গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছিল যে, ইরান আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পাওয়ার উদ্দেশ্যে এবং পরমাণু চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করার স্বার্থে জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষণ সংস্থা তথা আইএইএ-র পরিদর্শকদের জন্য তাদের কিছু অত্যন্ত গোপন ও সংবেদনশীল পরমাণু স্থাপনার দ্বার উন্মুক্ত করতে চলেছে। পশ্চিমা কূটনীতিকদের বরাতে দাবি করা হচ্ছিল, তেহরান ইতিমধ্যেই আইএইএ প্রধানকে ইরান সফরের এবং নতুন কেন্দ্রগুলো পরিদর্শনের জন্য একটি আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র পাঠিয়েছে।

আরও পড়ুন: প্রতিমন্ত্রীর মানহানির মামলা: ‘অগ্রযাত্রা প্রতিদিন’ এর সম্পাদক মেহেদী হাসান গ্রেপ্তার

এই ধরণের প্রচারণাকে সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রোপাগান্ডা হিসেবে অভিহিত করে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে নতুন কোনো কেন্দ্র বা স্থাপনা পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানানোর খবরটি সম্পূর্ণ অসত্য। তিনি বলেন, পশ্চিমা বিশ্ব প্রায়শই আলোচনার টেবিলে ইরানের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতে এবং বিশ্ব জনমতকে বিভ্রান্ত করতে এই ধরণের কাল্পনিক সংবাদ বাজারে ছাড়ে। ইরান আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মকানুনের প্রতি সর্বদা শ্রদ্ধাশীল, তবে তার অর্থ এই নয় যে তেহরান নিজের জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থকে বিপন্ন করে হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। আলোচনা এবং পরিদর্শনের একটি সুনির্দিষ্ট আইনি ফ্রেমওয়ার্ক রয়েছে এবং ইরান সেই নিয়মের বাইরে এক চুলও নড়বে না।

## মার্কিন সমঝোতা স্মারক (MoU) এবং ‘স্থিতাবস্থা’র আসল সমীকরণ

ইরানের পরমাণু কূটনীতির বর্তমান গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশটির বর্তমান অবস্থান মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অতীতে হওয়া একটি বিশেষ সমঝোতা স্মারকের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। ওমান বা কাতারের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর মাধ্যমে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যে অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা বা আন্ডারস্ট্যান্ডিং তৈরি হয়েছিল, তার মূল শর্তই ছিল একটি চূড়ান্ত ও সর্বসম্মত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত উভয় পক্ষই সংযম প্রদর্শন করবে।

মুখপাত্র বাঘাই তাঁর বক্তব্যে সেই সমঝোতা স্মারকের (MoU) প্রসঙ্গটি টেনে এনে বলেন, ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত সেই প্রাথমিক চুক্তির প্রতিটি শর্ত অক্ষরে অক্ষরে পালন করছে। সেই শর্ত অনুযায়ী, ইরান তাঁর পরমাণু চুল্লিগুলোর বর্তমান উৎপাদন ক্ষমতা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের নির্দিষ্ট মাত্রা (Enrichment Levels) এবং সেন্ট্রিফিউজের সংখ্যা একটি নির্দিষ্ট স্থিতাবস্থায় ধরে রেখেছে। তেহরান এককভাবে এই স্থিতাবস্থা ভাঙবে না, তবে একই সাথে ওয়াশিংটন যদি তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ না করে এবং ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার না করে, তবে ইরানও তাঁর পরমাণু কর্মসূচির পরিধি কমাতে বা নতুন কোনো আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা মেনে নিতে বাধ্য নয়। অর্থাৎ, কোনো চূড়ান্ত এবং আইনিভাবে বাধ্যবাধকতামূলক চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার আগে পরমাণু কার্যক্রমে কোনো ধরণের পরিবর্তন বা পরিমার্জন আসার কোনো সুযোগ নেই।

## বর্তমান ও স্থগিত পরিদর্শন ব্যবস্থার চুলচেরা বিশ্লেষণ

ইরানের বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা পরমাণু কেন্দ্রগুলোর ওপর জাতিসংঘের নজরদারির বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। বর্তমানে ইরানের কোন কোন কেন্দ্রে আইএইএ-র প্রবেশাধিকার রয়েছে এবং কোনগুলোতে নেই, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা ধোঁয়াশা রয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে ইসমাইল বাঘাই এই বিষয়টি অত্যন্ত সুনিপুণভাবে পরিষ্কার করেন।

আরও পড়ুন: পরীমণির সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক: বাধ্যতামূলক অবসরে সাবেক ডিবি এডিসি সাকলায়েন

তিনি জানান, বুশেহর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের (Bushehr Nuclear Power Plant) মতো যেসব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সুপরিচিত বেসামরিক স্থাপনা রয়েছে, সেগুলোতে আইএইএ-র পরিদর্শকদের নিয়মিত ও রুটিনমাফিক পরিদর্শন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে। বিগত দিনগুলোতে যেভাবে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকরা সেখানে গিয়েছেন এবং মনিটরিং করেছেন, তা আগামী দিনগুলোতেও আগের নিয়মেই অব্যাহত থাকবে। বেসামরিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সাথে জড়িত এই কেন্দ্রগুলোর পরিদর্শনে ইরান কখনো কোনো বাধা সৃষ্টি করেনি।

তবে এর বাইরে একটি বড় ধরণের আইনি ও নিরাপত্তা জটিলতা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধাবস্থা, আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং ইরানের অভ্যন্তরে বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নাশকতামূলক তৎপরতার আশঙ্কার কারণে বেশ কয়েকটি স্পর্শকাতর পরমাণু কেন্দ্রে আইএইএ-র প্রবেশাধিকার সাময়িকভাবে স্থগিত বা সীমিত করা হয়েছিল। এই স্থগিত হয়ে যাওয়া কেন্দ্রগুলোর ভবিষ্যৎ পরিদর্শন প্রক্রিয়ার বিষয়ে বাঘাই অত্যন্ত কঠোর বার্তা দিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, এই বিশেষ এবং কৌশলগত কেন্দ্রগুলোতে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের পুনরায় প্রবেশাধিকার দেওয়া হবে কি না, তা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে বর্তমানে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তিগুলোর চূড়ান্ত সদিচ্ছার ওপর। যদি আলোচনা সফল হয় এবং একটি লাভজনক চূড়ান্ত চুক্তি অর্জিত হয়, কেবল তখনই এই কেন্দ্রগুলোর পরিদর্শনের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে, এর আগে নয়।

## ইরানের পরমাণু স্থাপনা ও আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের বর্তমান রূপরেখা

পাঠকদের সুবিধার্থে এবং ইরানের বর্তমান পরমাণু নীতি ও পরিদর্শনের ধরণ সহজে বোঝার জন্য নিচে একটি বিশেষ তথ্য সারণী উপস্থাপন করা হলো:

পরমাণু কেন্দ্রের ধরণ ও নামবর্তমান পরিদর্শনের অবস্থা (Status)পরিদর্শনের ভবিষ্যৎ শর্ত ও তেহরানের নীতি
বুশেহর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রনিয়মিত ও রুটিনমাফিক পরিদর্শন চলমান।আগের নিয়মেই আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের জন্য এটি উন্মুক্ত থাকবে।
আঞ্চলিক যুদ্ধের কারণে স্থগিত কেন্দ্রসমূহসাময়িকভাবে প্রবেশাধিকার ও ক্যামেরা নজরদারি স্থগিত।চলমান আলোচনা ও চূড়ান্ত চুক্তির সফল ফলাফলের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল।
নতুন বা অঘোষিত স্থাপনা সমূহকোনো ধরণের পরিদর্শনের সুযোগ নেই।পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের নতুন পরিদর্শনের দাবি সম্পূর্ণ বানোয়াট ও নাকচ।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র (যেমন: নাতানজ)সমঝোতা স্মারক (MoU) অনুযায়ী সীমিত মনিটরিং।চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান ‘স্থিতাবস্থা’ বজায় রাখা হবে।

## বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতায় এর প্রভাব

ইরানের এই অনড় কূটনৈতিক অবস্থান কেবল তেহরান বা ওয়াশিংটনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর একটি সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর। ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরমাণু চুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অচলাবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে খনিজ তেলের (Crude Oil) দাম প্রতিনিয়ত ওঠানামা করছে। ইরান যদি তাঁর পরমাণু কর্মসূচির স্থিতাবস্থা বজায় রাখে এবং পশ্চিমা বিশ্ব নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখে, তবে বিশ্ব বাজারে ইরানি তেলের অবাধ প্রবেশ বাধাগ্রস্তই থাকবে, যা পরোক্ষভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের পারদ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে ইরানের এই সিদ্ধান্ত প্রতিবেশী দেশগুলো, বিশেষ করে ইসরায়েল এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা কৌশলকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। ওয়াশিংটনের থিংক-ট্যাংকগুলোর মতে, ইরান আসলে আলোচনার টেবিলে নিজেদের দরকষাকষির ক্ষমতা (Bargaining Power) বাড়াতে এই কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চায় যাতে তারা ইরানের ওপর থেকে সর্বোচ্চ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে।

পরিশেষে বলা যায়, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইয়ের এই সময়োপযোগী ও জোরালো বক্তব্য এটিই প্রমাণ করে যে, তেহরান আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কোনো ধরণের ফাঁকা বুলি বা একতরফা শর্ত মেনে নিতে রাজি নয়। তারা যেমন মার্কিন সমঝোতা স্মারক মেনে ‘স্থিতাবস্থা’ ধরে রাখতে প্রস্তুত, ঠিক তেমনি নিজেদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কঠোর সিদ্ধান্ত নিতেও পিছপা হবে না। ‘দিগন্ত বাংলা নিউজ’ পোর্টালের পক্ষ থেকে আমরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনের এমন প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক মোড় এবং পরমাণু কূটনীতির প্রতি মুহূর্তের বিশ্বস্ত ও বস্তুনিষ্ঠ আপডেট প্রফেশনাল উপায়ে আপনাদের সামনে তুলে ধরতে সর্বদা অঙ্গীকারাবদ্ধ।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন