অভূতপূর্ব উচ্চতায় মস্কো-বেইজিং অক্ষ: চীন সফরের আগে পুতিনের ঐতিহাসিক বার্তা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির গতিপ্রকৃতি যখন এক বহুমুখী মেরুকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। চীনের শক্তিশালী প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বিশেষ আমন্ত্রণে বেইজিংয়ে রাষ্ট্রীয় সফরে যাওয়ার প্রাক্কালে এক বিশেষ ভিডিও বার্তায় পুতিন দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে 'অভূতপূর্ব উচ্চতা' হিসেবে অভিহিত করেছেন। মস্কো এবং বেইজিংয়ের এই ঘনিষ্ঠতা কেবল দুই দেশের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করছে না, বরং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে পশ্চিমা শক্তির একাধিপত্যের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী ভারসাম্য তৈরি করছে। পুতিনের এই সফর ও তার বার্তা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
কারও বিরুদ্ধে নয়, পারস্পরিক বিশ্বাসের অংশীদারিত্ব
ভিডিও বার্তায় প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন অত্যন্ত জোরালোভাবে উল্লেখ করেছেন যে, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে গড়ে ওঠা এই গভীর ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব কোনো তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে বা কাউকে লক্ষ্য করে গঠিত হয়নি। তিনি স্পষ্ট করেন, এই সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক গভীর বোঝাপড়া, আস্থা এবং একে অপরের মূল জাতীয় স্বার্থের প্রতি অবিচল শ্রদ্ধা। বিশেষ করে দুই দেশের সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা রক্ষার ক্ষেত্রে মস্কো ও বেইজিং যেভাবে একে অপরকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সমর্থন দিয়ে আসছে, তা সমসাময়িক কূটনীতিতে এক বিরল দৃষ্টান্ত।
পশ্চিমা বিশ্ব যখন প্রায়শই রাশিয়া ও চীনের এই জোটকে একটি 'হুমকি' হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করে, তখন পুতিনের এই বক্তব্য সেই ধারণাকে সরাসরি খণ্ডন করে। পুতিন মূলত বোঝাতে চেয়েছেন যে, এই সম্পর্ক কোনো সামরিক আগ্রাসন বা আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার নয়, বরং এটি বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা ও একটি বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থা (Multipolar World Order) গড়ে তোলার প্রয়াস।
আরও পড়ুন: ডোনাল্ড ট্রাম্প কি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ‘ভিয়েতনাম ট্র্যাপে’ পড়তে যাচ্ছেন?
২৫ বছরের চুক্তি এবং দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত বন্ধন
রাশিয়া ও চীনের এই বর্তমান সুদৃঢ় সম্পর্কের ভিত্তি কিন্তু রাতারাতি গড়ে ওঠেনি। পুতিন তাঁর ভাষণে ২৫ বছর আগে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ‘সুসহ প্রতিবেশীতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা চুক্তি’র (Treaty of Good-Neighborliness and Friendly Cooperation) কথা স্মরণ করেন। এই চুক্তিটিই মূলত গত আড়াই দশক ধরে দুই পরাশক্তির মধ্যে একটি ‘কৌশলগত ও বিস্তৃত অংশীদারিত্ব’ (Strategic and Comprehensive Partnership) গড়ে তুলতে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
এই দীর্ঘ সময়ে দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব একের পর এক সংকটে একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছে। পুতিন জানান, এই দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো 'উইন-উইন' (Win-Win) সহযোগিতা। অর্থাৎ, যেখানে কোনো পক্ষই এককভাবে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করে না, বরং দুই দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ সমানভাবে সংরক্ষিত হয়। পারস্পরিক সম্মান এবং নিয়মতান্ত্রিক সংলাপের মাধ্যমেই আজ দুই দেশ এই অবস্থানে এসে পৌঁছেছে।
বাণিজ্যে ডলার বর্জন: রুবল ও ইউয়ানের নতুন সাম্রাজ্য
পুতিনের এই ভিডিও বার্তার সবচেয়ে বাস্তবমুখী এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অগ্রগতির খতিয়ান। পুতিন অত্যন্ত গর্বের সাথে ঘোষণা করেন যে, রাশিয়া ও চীনের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ইতিমধ্যেই ২০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করেছে, যা দুই দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেকর্ড।
তবে এর চেয়েও বড় চমকপ্রদ তথ্য হলো, এই বিশাল পরিমাণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় সম্পূর্ণ লেনদেনই সম্পন্ন হচ্ছে দুই দেশের নিজস্ব মুদ্রা—রাশিয়ার 'রুবল' এবং চীনের 'ইউয়ান'-এর মাধ্যমে। বিশ্ব বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের যে একক আধিপত্য বা 'ডলার ডমিনেন্স' রয়েছে, তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রাশিয়া ও চীন নিজেদের মুদ্রায় এই লেনদেন সফলভাবে পরিচালনা করছে। পশ্চিমা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং ব্যাংকিং সুইফট (SWIFT) সিস্টেম থেকে রাশিয়াকে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টার জবাবে এই পদক্ষেপটি বেইজিং ও মস্কোর জন্য এক বিরাট কৌশলগত বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে ডি-ডলারাইজেশন (Dedollarization) বা ডলার বর্জনের প্রক্রিয়া আরও গতি পাবে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বহুমুখী সহযোগিতা: প্রতিরক্ষা থেকে মানবিক খাত
প্রেসিডেন্ট পুতিন তাঁর বার্তায় স্পষ্ট করেছেন যে, কেবল ব্যবসা-বাণিজ্য বা জ্বালানি খাতেই নয়, রাশিয়া ও চীন রাজনৈতিক, সামরিক, প্রতিরক্ষা এবং মানবিক—সব ক্ষেত্রেই তাদের সহযোগিতার পরিধি আরও বাড়াতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং মধ্য এশিয়ায় দুই দেশের যৌথ সামরিক মহড়া বিশ্ব শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে।
সামরিক সহযোগিতার পাশাপাশি দুই দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির ওপরও বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। পুতিন জানান, দুই দেশের মধ্যে নতুন করে ভিসামুক্ত যাতায়াত ব্যবস্থা চালু হওয়ার কারণে পর্যটন শিল্প, যৌথ ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শিক্ষা-সংস্কৃতির আদান-প্রদান বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। পুতিন উল্লেখ করেন যে, রাশিয়া চীনের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও প্রাচীন সংস্কৃতিকে অত্যন্ত গভীরতার সাথে মূল্যায়ন করে এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যকার এই মানবিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে আরও টেকসই করতে মস্কো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বৈশ্বিক প্রভাব
পুতিনের এই চীন সফর এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন ইউক্রেন পরিস্থিতি নিয়ে রাশিয়ার সাথে পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্ক ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে এবং অন্যদিকে তাইওয়ান ও বাণিজ্য শুল্ক ইস্যুতে আমেরিকার সাথে চীনের উত্তেজনা তুঙ্গে। এই উত্তপ্ত বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে পুতিন ও শি জিনপিংয়ের এই বৈঠক ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলসের নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বড় বার্তা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুতিনের এই সফরের মাধ্যমে চীন ও রাশিয়া বিশ্বকে দেখাতে চায় যে, পশ্চিমাদের চাপ ও নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তারা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মোটেও একাকী নয়। বরং বেইজিং ও মস্কোর এই অক্ষ আগামী দিনে গ্লোবাল সাউথ (Global South) বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছে। ব্রিকস (BRICS) এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (SCO) মতো জোটগুলোকে আরও শক্তিশালী করার পেছনেও এই দুই দেশের অভিন্ন লক্ষ্য কাজ করছে।
উপসংহার
ভ্লাদিমির পুতিনের বেইজিং সফরের আগের এই ভিডিও বার্তাটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ বিশ্ব রাজনীতির একটি রূপরেখা। ডলার বর্জন করে নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে গভীর সমন্বয় এবং পারস্পরিক অখণ্ডতার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন প্রমাণ করে যে, রাশিয়া ও চীনের এই অক্ষ আগামী দিনে বিশ্ব মঞ্চে এক নতুন শক্তির অক্ষ হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও পাকাপোক্ত করতে চলেছে। পুতিন ও শি জিনপিংয়ের আসন্ন বৈঠক থেকে কী ধরনের নতুন চুক্তি বা ঘোষণা আসে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে গোটা বিশ্ব।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।