ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দল থেকে বাদ পড়লেন যেসব তারকা ফুটবলার

ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দল থেকে বাদ পড়লেন যেসব তারকা ফুটবলার

খেলাধুলা ডেস্ক, দিগন্ত বাংলা নিউজ: 

বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর 'ফিফা বিশ্বকাপ'-এর চূড়ান্ত স্কোয়াড বা দল ঘোষণা মানেই একদিকে যেমন তরুণ ও প্রতিভাবান ফুটবলারদের আজন্ম লালিত স্বপ্নপূরণের আনন্দ, ঠিক তেমনি অন্যদিকে অনেক প্রতিষ্ঠিত তারকার জন্য এক বুক হতাশা আর বেদনার গল্প। লাতিন আমেরিকার পরাশক্তি এবং পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের ক্ষেত্রেও এবার এর কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। ট্রফি পুনরুদ্ধারের মিশনে নামার আগে ইনজুরির বা চোটের করাল গ্রাসে পড়ে আগেই বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গিয়েছিলেন রিয়াল মাদ্রিদের দুই তারকা রদ্রিগো গোয়েস, এডার মিলিতাও এবং দেশের অন্যতম তরুণ বিস্ময় প্রতিভা এস্তেভাও উইলিয়ান। তবে কেবল শারীরিক চোটই নয়, পারফরম্যান্স এবং কোচের বিশেষ রণকৌশলের গ্যাঁড়াকলে পড়ে বেশ কয়েকজন বিশ্বখ্যাত ও চেনা তারকা ফুটবলারও জায়গা পাননি সেলেসাওদের চূড়ান্ত বিশ্বকাপ স্কোয়াডে।

​গত সোমবার (১৮ মে) দিবাগত রাতে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর বিখ্যাত ‘মিউজিয়াম অব টুমরো’ (Museum of Tomorrow)-তে আয়োজিত এক জাঁকজমকপূর্ণ ও জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে ব্রাজিলের নবনিযুক্ত ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তি বহুল প্রতীক্ষিত ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত বিশ্বকাপ দল ঘোষণা করেন। আর এই তালিকায় ফুটবল পণ্ডিতদের সবচেয়ে বড় চমক ও ধাক্কা দিয়েছে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের জায়ান্ট ক্লাব চেলসির ফরোয়ার্ড জোয়াও পেদ্রোর বাদ পড়ার বিষয়টি। চলমান ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ফুটবল মরশুমে ক্লাবের হয়ে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা পেদ্রো একাই ১৫টি গোল এবং ৫টি অ্যাসিস্ট করে ব্লুজদের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসন দখল করে রেখেছিলেন। এত চমৎকার ফর্ম এবং ধারাবাহিকতা থাকা সত্ত্বেও ফুটবলের মহোৎসবে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সৌভাগ্য এবার হচ্ছে না এই চেলসি তারকার, যা ব্রাজিলের ফুটবল সমর্থকদের মধ্যে তীব্র জল্পনা ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

​মার্চের ফিফা উইন্ডোর পর ব্যাপক রদবদল এবং অভিজ্ঞদের ট্র্যাজেডি

​ফুটবল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোচ কার্লো আনচেলত্তি ব্রাজিলের ডাগআউটে বসার পর থেকেই দলে আমূল পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছেন এবং কেবলমাত্র নাম দেখে নয়, বরং নিজের ফর্মেশনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে খেলোয়াড় নির্বাচন করছেন। যার ফলে গত মার্চ মাসের আন্তর্জাতিক ফিফা উইন্ডোতে যে সব ফুটবলার নিয়মিত স্কোয়াডে ছিলেন, তাদের একটি বড় অংশকে এবার বিশ্বকাপের চূড়ান্ত মঞ্চ থেকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে। বাদ পড়া এই ফুটবলারদের দীর্ঘ তালিকায় রয়েছেন করিন্থিয়ান্সের দুর্দান্ত গোলরক্ষক হুগো সুজা, সৌদি প্রো লিগের ক্লাব আল-নাসরে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সতীর্থ গোলরক্ষক বেন্তো ম্যাথিউস, ক্রুজেইরোর ফুলব্যাক কাইকি, চেলসির তরুণ ও প্রতিশ্রুতিশীল মিডফিল্ডার আন্দ্রে সান্তোস এবং তুর্কি ক্লাব গালাতাসারেইর হয়ে মাঠ কাঁপানো গ্যাব্রিয়েল সারা।

​মার্চের উইন্ডোতে অবশ্য নিয়মিত এবং বিশ্বস্ত গোলরক্ষক অ্যালিসন বেকার ও অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার অ্যালেক্স সান্দ্রো চোটের কারণে মাঠের বাইরে থাকায় ব্যাকআপ হিসেবে হুগো সুজা এবং কাইকিকে জাতীয় দলে জরুরি ডাক দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা সুস্থ হয়ে দলে ফেরায় এই দুই ঘরোয়া লিগের তারকাকে জায়গা ছেড়ে দিতে হয়েছে। এর পাশাপাশি ব্রাজিলের আক্রমণভাগের অন্যতম পরিচিত মুখ এবং গত কাতার বিশ্বকাপে দলের মূল স্ট্রাইকার হিসেবে খেলা টটেনহ্যামের রিচার্লিসন এবং ফুলহ্যামের অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার আন্দ্রে পেরেইরারও জায়গা মেলেনি আনচেলত্তির চূড়ান্ত পরিকল্পনায়। প্রিমিয়ার লিগে ধারাবাহিকতার অভাব এবং আনচেলত্তির হাই-প্রেসিং ফুটবল দর্শনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় এই দুই বড় তারকাকে বিশ্বকাপের দর্শক হয়েই থাকতে হচ্ছে।

আরও পড়ুন:ডোনাল্ড ট্রাম্প কি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ‘ভিয়েতনাম ট্র্যাপে’ পড়তে যাচ্ছেন?

ডোনাল্ড ট্রাম্প কি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ‘ভিয়েতনাম ট্র্যাপে’ পড়তে যাচ্ছেন?

​নেইমারের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন ও আনচেলত্তির নতুন বাজি

​একঝাঁক তারকার বাদ পড়ার হতাশার মাঝেই ব্রাজিলের ফুটবল ভক্তদের জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর নিয়ে এসেছে দলের প্রাণভোমরা এবং পোস্টার বয় নেইমার জুনিয়রের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন। দীর্ঘদিনের চোট কাটিয়ে মাঠে ফেরা এই অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ডকে ঘিরেই হেক্সা (ষষ্ঠ শিরোপার) মিশন সাজাচ্ছেন ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ড আনচেলত্তি। আক্রমণভাগে নেইমারের সাথে জুটি বাঁধবেন রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ইউরোপ কাঁপানো ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, আর্সেনালের গতিময় ফরোয়ার্ড গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লি এবং বার্সেলোনার অন্যতম সেরা উইঙ্গার রাফিনিয়া। তবে এবারের স্কোয়াডের সবচেয়ে বড় চমক হলো ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ছোট দল বোর্নমাউথের হয়ে নজর কাড়া স্ট্রাইকার রায়ান এবং ব্রেন্টফোর্ডের শক্তিশালী ইগর থিয়াগোর দলে ডাক পাওয়া। আনচেলত্তি ইউরোপীয় ঘরানার ফিজিক্যাল ফুটবলের কথা মাথায় রেখেই এই দুই দীর্ঘদেহী ও পাওয়ারফুল ফরোয়ার্ডকে দলে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এছাড়া আগের ম্যাচগুলোতে নিজেদের প্রমাণ করা বোটাফোগোর তারকা লুইজ হেনরিক এবং আতলেতিকো মাদ্রিদের সাবেক ফরোয়ার্ড ম্যাথিউস কুনহাও দলে নিজেদের অবস্থান সফলভাবে ধরে রেখেছেন।

​চূড়ান্ত দল ঘোষণা শেষে সংবাদ সম্মেলনে বাদ পড়া খেলোয়াড়দের নিয়ে গভীর দুঃখ ও সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন কোচ কার্লো আনচেলত্তি। তিনি বলেন, 'ব্রাজিলের মতো একটি ফুটবল পাগল দেশের জন্য চূড়ান্ত ২৬ জনকে বেছে নেওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। কারণ এই দেশের প্রতিটি পজিশনে প্রতিভার কোনো অভাব নেই এবং সুস্থ প্রতিযোগিতা অনেক বেশি। আমাদের সাথে গত এক বছর ধরে কঠোর পরিশ্রম করা কিছু ফুটবলার আজ চূড়ান্ত তালিকায় নাম না দেখে চরম হতাশ ও ব্যথিত, সেটা আমি একজন সাবেক খেলোয়াড় এবং কোচ হিসেবে খুব ভালো করেই বুঝি। তাদের এই দুঃখের জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখপ্রকাশ করছি। তবে তাদের অবদানকে আমি খাটো করে দেখছি না এবং দলের পক্ষ থেকে সবাইকে ধন্যবাদ জানাই।'

​ফিফার বিশেষ নিয়ম এবং বিশ্বকাপের চূড়ান্ত প্রস্তুতি রোডম্যাপ

​বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্তা সংস্থা 'ফিফা' (FIFA)-র বিশেষ আইন ও নীতিমালা অনুযায়ী, বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলগুলো তাদের প্রথম উদ্বোধনী ম্যাচের আগের দিন পর্যন্ত গুরুতর ইনজুরির কারণে স্কোয়াডে যেকোনো ধরণের জরুরি পরিবর্তন আনার আইনি সুযোগ পাবে। তবে শর্ত থাকে যে, নতুন অন্তর্ভুক্ত হতে যাওয়া বদলি খেলোয়াড়টিকে অবশ্যই টুর্নামেন্টের শুরুতে জমা দেওয়া প্রাথমিক ৫৫ সদস্যের 'প্রোভিশনাল বা লং লিস্টে' থাকতে হবে। এই নিয়মটি ব্রাজিলের জন্য কিছুটা আশার আলো, কারণ প্রস্তুতি ক্যাম্প চলাকালীন যদি কেউ নতুন করে চোটে পড়েন, তবে জোয়াও পেদ্রো বা রিচার্লিসনের মতো তারকারা পুনরায় মূল দলে ফেরার সুযোগ পেতে পারেন।

​বিশ্বকাপের চূড়ান্ত মিশনকে সামনে রেখে ব্রাজিলের ফুটবল ফেডারেশন (CBF) ইতিমধ্যেই এক নিবিড় ও আঁটসাঁট প্রস্তুতিমূলক রোডম্যাপ চূড়ান্ত করেছে। আগামী ২৭ মে থেকে ব্রাজিলের তেরেসোপোলিসের গ্রাঞ্জা কমোরি কমপ্লেক্সে দলের অফিশিয়াল বিশ্বকাপ প্রস্তুতি ক্যাম্প শুরু হবে। এরপর আগামী ৩১ মে ঐতিহাসিক মারাকানা স্টেডিয়ামে হাজারো হোম ক্রাউডের সামনে পানামার বিপক্ষে ঘরের মাঠে নিজেদের বিদায়ী প্রীতি ম্যাচ বা ওয়ার্ম-আপ ম্যাচ খেলবে সেলেসাওরা। এই ম্যাচ শেষেই তারা উড়াল দেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে। সেখানে গিয়ে আগামী ৬ জুন মিশরের বিপক্ষে আরও একটি হাই-ভোল্টেজ প্রস্তুতি ম্যাচ খেলে নিজেদের রণকৌশল ঝালিয়ে নেবেন ভিনিসিয়ুস-নেইমাররা। আগামী ১১ জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া বিশ্ব আসরে গ্রুপ-ই তে থাকা ব্রাজিল তাদের মূল অভিযান শুরু করবে ১৩ জুন, যেখানে তাদের প্রথম ম্যাচের কঠিন প্রতিপক্ষ আফ্রিকান জায়ান্ট মরক্কো। এই একই গ্রুপে ব্রাজিলের সাথে লড়াই করার জন্য অপেক্ষা করছে হাইতি এবং স্কটল্যান্ড।

​সূত্র: আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংবাদ ও সিবিএফ অফিশিয়াল

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন