ব্রেকিং নিউজ

ট্রাম্পের ইরান হামলার পরিকল্পনা স্থগিত: পর্দার আড়ালে উপসাগরীয় কূটনীতি

ট্রাম্পের ইরান হামলার পরিকল্পনা স্থগিত: পর্দার আড়ালে উপসাগরীয় কূটনীতি

চুক্তির টেবিলে ট্রাম্প: ইরানে বড় হামলার পরিকল্পনা স্থগিতের নেপথ্যে কী?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক / দিগন্ত বাংলা নিউজ

​বিশ্ব রাজনীতিতে আবারও নাটকীয় মোড়। মধ্যপ্রাচ্যের চরম উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর একটি বড় ধরনের সামরিক হামলার পরিকল্পনা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছেন। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তেহরানের সাথে একটি টেকসই শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হওয়া এবং উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর তীব্র অনুরোধের কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ওয়াশিংটন সাফ জানিয়ে দিয়েছে, আলোচনা ব্যর্থ হলে যেকোনো মুহূর্তে ইরানকে চরম মূল্য চোকাতে হবে।

​এই সিদ্ধান্তের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সাময়িকভাবে যুদ্ধের মেঘ কেটে গেলেও দীর্ঘমেয়াদী শান্তি নিয়ে এখনো বড় ধরনের সংশয় রয়েছে। ওয়াশিংটন, তেহরান এবং তেল আবিবের মধ্যকার এই জটিল সমীকরণে এখন মূল ভূমিকা পালন করছে উপসাগরীয় অঞ্চলের মুসলিম দেশগুলো এবং এশিয়ার পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র পাকিস্তান।

​হামলা স্থগিতের মূল কারণ: মিত্রদের চাপ ও পাল্টা হুমকির শঙ্কা

​প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ দেওয়া এক বিবৃতিতে জানান, গত মঙ্গলবার (১৬ মে) ইরানের ওপর একটি বড় ধরনের সামরিক হামলার চূড়ান্ত প্রস্তুতি ছিল মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান মিত্র কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) শীর্ষ নেতৃত্ব ট্রাম্প প্রশাসনকে এই মুহূর্তে হামলা না চালানোর জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানায়।

​উপসাগরীয় দেশগুলোর এই অনুরোধের পেছনে ছিল একটি বড় কৌশলগত ভয়। ইরান স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছিল যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল যদি চলমান ছয় সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে তেহরানে কোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসন চালায়, তবে তার পাল্টা জবাব দেওয়া হবে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে। কারণ, এই দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এবং এগুলো মার্কিন ও ইসরায়েলি স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার এই সম্ভাব্য যুদ্ধ শুরু হলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে এক মহাসংকটে ফেলবে। এই বিপর্যয় এড়াতেই মূলত উপসাগরীয় মিত্ররা ট্রাম্পকে সামরিক পথ পরিহার করে কূটনীতির টেবিলে ফেরার অনুরোধ জানায়।

আরও পড়ুন: ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দল থেকে বাদ পড়লেন যেসব তারকা ফুটবলার

ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দল থেকে বাদ পড়লেন যেসব তারকা ফুটবলার

​ছয় সপ্তাহের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ও ট্রাম্পের চুক্তির রূপরেখা

​বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে একটি ছয় সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতি চলছে। এই যুদ্ধবিরতির মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানো। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুরু থেকেই দাবি করে আসছেন, তিনি মধ্যপ্রাচ্যের অন্তহীন যুদ্ধ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে আনতে চান। তবে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ইরানকে যে শর্ত বা চুক্তির রূপরেখা দেওয়া হয়েছিল, তা তেহরান এক বাক্যে প্রত্যাখ্যান করে।

​ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের প্রস্তাবিত চুক্তিটি একপেশে এবং এতে ইরানের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে চরমভাবে ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। তেহরানের এই প্রত্যাখ্যানে ক্ষুব্ধ হয়েই গত মঙ্গলবার মার্কিন সামরিক বাহিনীকে হামলার সবুজ সংকেত দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ট্রাম্প। তবে শেষ মুহূর্তে আরব মিত্রদের মধ্যস্থতা এবং নতুন করে আলোচনার পরিবেশ তৈরি হওয়ায় তিনি এই সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসেন।

​পর্দার আড়ালে পাকিস্তান: প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা

​আমেরিকা ও ইরানের এই স্নায়ুযুদ্ধের মাঝে সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে পাকিস্তান। তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যকার সরাসরি সংলাপ বন্ধ থাকায়, এই দুই চিরশত্রু দেশের মধ্যে প্রধান মধ্যস্থতাকারী (Mediator) হিসেবে কাজ করছে ইসলামাবাদ।

​সম্প্রতি কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি ইরান সফর করেছেন। সেখানে তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, পাকিস্তান মূলত যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা ইরানের কাছে এবং ইরানের শর্তগুলো ওয়াশিংটনের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সেতু হিসেবে কাজ করছে। পাকিস্তানের এই মধ্যস্থতা যদি সফল হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে একটি ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি সম্ভব হতে পারে। তবে ইরান এখনো এমন কোনো স্পষ্ট সংকেত দেয়নি যে তারা মার্কিন চাপের মুখে নিজেদের মূল নীতি থেকে পিছু হটবে।

​হোয়াইট হাউসে জরুরি বৈঠক ও ট্রাম্পের চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি

​হামলা স্থগিত করলেও ওয়াশিংটনের সুর কিন্তু নরম হয়নি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন (CNN)-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শনিবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা দলের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন। এই বৈঠকে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব, সিআইএ প্রধান এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা উপস্থিত ছিলেন।

​বৈঠকের পরদিনই ট্রাম্প ইরানের উদ্দেশ্যে তীব্র হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, "তেহরানকে খুব দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, নইলে তাদের কোনো কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।" ট্রাম্পের এই বক্তব্য স্পষ্ট করে দেয় যে, আলটিমেটামের সময়সীমা দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীকে ইতিমধ্যেই সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় (High Alert) রাখা হয়েছে। যদি চলতি কূটনৈতিক আলোচনা কোনো ইতিবাচক ফলাফলে না পৌঁছায়, তবে এক মুহূর্তের নির্দেশে ইরানের সামরিক ও পরমাণু স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানতে প্রস্তুত মার্কিন সেনারা।

​বিশ্ব অর্থনীতি ও তেলের বাজারে এর প্রভাব

​আমেরিকা ও ইরানের এই চলমান উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলছে। মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালী হলো বিশ্ব খনিজ তেলের অন্যতম প্রধান রুট। এই অঞ্চলে যুদ্ধের সামান্যতম আভাস পেলেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) দাম হু হু করে বাড়তে শুরু করে।

​অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের হামলা স্থগিতের সিদ্ধান্তের পর তেলের বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও, মার্কিন হুঁশিয়ারির কারণে বিনিয়োগকারীরা এখনো শঙ্কিত। যদি কোনো কারণে এই যুদ্ধবিরতি ভেঙে যায় এবং ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল অক্ষ সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তবে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক মন্দা নতুন মাত্রা রূপ নিতে পারে।

​উপসংহার: যুদ্ধ নাকি সমঝোতা?

​মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ এখন সুতোয় ঝুলছে। একদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের 'ডিল মেকিং' বা চুক্তি করার চাপ, অন্যদিকে ইরানের জাতীয় মর্যাদা ও প্রতিরোধের নীতি। এর মাঝে কাতার, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর শান্তি প্রচেষ্টা কতটুকু সফল হবে, তা আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। তবে এ কথা নিশ্চিত যে, এবারের সংকট শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর ফলাফল নির্ধারণ করবে আগামী দিনে বিশ্ব রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন