যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের নতুন শর্ত: মধ্যপ্রাচ্যে বড় পরিবর্তনের আভাস

যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের নতুন শর্ত: মধ্যপ্রাচ্যে বড় পরিবর্তনের আভাস

যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের নতুন প্রস্তাব: মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে কোন দিকে মোড় নিচ্ছে জলঘোলা পরিস্থিতি?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক / দিগন্ত বাংলা নিউজ

​আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে বিশ্বরাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের স্নায়ুযুদ্ধ ও সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা এবার টেবিল টক বা কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে রূপ নিতে যাচ্ছে। তবে এই আলোচনার আবহ তৈরি হওয়ার পেছনে রয়েছে ইরানের দেওয়া একগুচ্ছ কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদী শর্ত। সম্প্রতি ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি নতুন প্রস্তাব পাঠিয়েছে, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে চরম হুঁশিয়ারি ও শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে।

​মঙ্গলবার (১৯ মে) ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি তেহরানের এই নতুন প্রস্তাব ও শর্তাবলীর কথা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছেন। ইরানের এই পদক্ষেপের পর আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য আরব দেশগুলোর মধ্যস্থতার চেষ্টা এই সংকটকে এক ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গেছে।

​ইরানের নতুন প্রস্তাবের প্রধান শর্তসমূহ

​ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি জানিয়েছেন, তেহরান স্পষ্ট ভাষায় তাদের অবস্থান ওয়াশিংটনকে জানিয়ে দিয়েছে। এবারের প্রস্তাবে ইরান মূলত মার্কিন সামরিক আধিপত্য এবং অর্থনৈতিক অবরোধকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। ইরানের দেওয়া মূল শর্তগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

  1. ​১. সব ফ্রন্টে একযোগে যুদ্ধবিরতি: ইরানের প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের যেসব অঞ্চলে বর্তমানে সংঘাত চলছে, সেই সমস্ত ফ্রন্টে একসঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। ইসরায়েল ও তার মিত্রদের একক কোনো ফ্রন্টে যুদ্ধ থামিয়ে অন্য ফ্রন্টে হামলা সচল রাখার নীতি ইরান আর বরদাশত করবে না।
  2. ​২. মার্কিন সেনা প্রত্যাহার: ইরানের ভৌগোলিক সীমানা এবং তার কাছাকাছি অঞ্চলে অবস্থানরত সমস্ত মার্কিন সেনাকে অনতিবিলম্বে প্রত্যাহার করে নিতে হবে। ইরান মনে করে, এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতিই মূল অশান্তির কারণ।
  3. ​৩. যুদ্ধজনিত ক্ষতিপূরণ প্রদান: চলমান সংঘাত ও যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যৌথভাবে বা এককভাবে যে সমস্ত ক্ষয়ক্ষতি করেছে, তার সম্পূর্ণ সংস্কার ও ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
  4. ​৪. অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: ইরানের ওপর দীর্ঘ সময় ধরে চাপিয়ে দেওয়া সমস্ত মার্কিন ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণভাবে তুলে নিতে হবে।
  5. ​৫. জব্দকৃত বৈদেশিক মুদ্রা ফেরত: বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংকে ইরানের জব্দ বা ফ্রিজ করে রাখা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা কোনো শর্ত ছাড়াই অবমুক্ত করতে হবে।
  6. ​৬. মার্কিন নৌ-অবরোধের অবসান: পারস্য উপসাগরসহ আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে যে নৌ-অবরোধ এবং কড়া নজরদারি জারি রেখেছে, তা পুরোপুরি প্রত্যাহার করতে হবে।

​ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়া ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান

​ইরানের এই নতুন প্রস্তাবের পর মার্কিন রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এর আগে ইরানের দেওয়া অনুরূপ একটি প্রস্তাবকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি ‘আবর্জনা’ (Trash) হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান তাদের আগের অবস্থান থেকে খুব একটা সরেনি। নতুন প্রস্তাবে শব্দচয়ন বা উপস্থাপনায় কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও ভেতরের মূল দাবিগুলো প্রায় অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে।

​তবে ট্রাম্পের মেজাজে এবার কিছুটা ভিন্ন সুরও লক্ষ্য করা গেছে। একদিকে তিনি ইরানের প্রস্তাবকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করছেন, অন্যদিকে কূটনীতির পথও খোলা রাখছেন বলে ইঙ্গিত মিলেছে।

আরও পড়ুন: ট্রাম্পের ইরান হামলার পরিকল্পনা স্থগিত: পর্দার আড়ালে উপসাগরীয় কূটনীতি

ট্রাম্পের ইরান হামলার পরিকল্পনা স্থগিত: পর্দার আড়ালে উপসাগরীয় কূটনীতি

​ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্পের বিস্ফোরক বার্তা

​মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল' (Truth Social)-এ একটি পোস্টে দাবি করেছেন, মঙ্গলবার ইরানের ওপর পুনরায় বড় ধরনের সামরিক হামলা চালানোর সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু শেষ মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী তিন দেশ— সৌদি আরব, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের (UAE) শীর্ষ নেতাদের বিশেষ অনুরোধে তিনি এই হামলা পরিকল্পনা স্থগিত করেন। তবে ট্রাম্প একই সাথে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, সবকিছুর পরও ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।

​আরব দেশগুলোর মধ্যস্থতা এবং কূটনৈতিক তৎপরতা

​বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরব, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই তিন পরাশক্তি কোনোভাবেই নিজেদের দোরগোড়ায় আর একটি বিধ্বংসী যুদ্ধ দেখতে চায় না। ইরানের ওপর মার্কিন হামলা হলে তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের ওপর পড়বে।

​বিশেষ করে কাতার দীর্ঘ সময় ধরে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে একটি অনানুষ্ঠানিক সেতু হিসেবে কাজ করে আসছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আরব নেতাদের এই দূরদর্শী হস্তক্ষেপের কারণেই হয়তো মঙ্গলবারের সম্ভাব্য একটি বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেয়েছে মধ্যপ্রাচ্য।

​বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব

​ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই টানাপোড়েনের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেলের বাজারে। পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের সিংহভাগ জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়। এই অঞ্চলে সামান্য উত্তেজনা তৈরি হলেই তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ইরানের শর্তে যদি ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত কান না দেয় এবং পুনরায় কোনো সামরিক সংঘাতের সৃষ্টি হয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি মুদ্রাস্ফীতির মুখে পড়তে পারে। গুগল ও অন্যান্য সার্চ ইঞ্জিনেও এখন এই বিষয়টি ট্রেন্ডিংয়ে রয়েছে।

​ভবিষ্যৎ কোন দিকে? চুক্তি নাকি নতুন সংঘাত?

​বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই প্রস্তাব মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির কৌশল। ইরান ভালো করেই জানে যে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের সমস্ত সেনা রাতারাতি প্রত্যাহার করবে না কিংবা ইসরায়েলের হয়ে ক্ষতিপূরণ দেবে না। তবে এই সর্বোচ্চ দাবিগুলো সামনে রেখে ইরান আসলে আলোচনার টেবিলে নিজের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে।

​অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের "চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা আছে" এমন উক্তি নির্দেশ করে যে, পর্দার আড়ালে হয়তো কোনো গোপন কূটনীতি বা 'ব্যাক-চ্যানেল ডিপ্লোম্যাসি' সচল রয়েছে। যুদ্ধ এড়াতে এবং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি বজায় রাখতে শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষই কিছুটা নমনীয় হয়ে কোনো মধ্যপন্থা বা সমঝোতায় আসে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

​পরিশেষে বলা যায়, ওয়াশিংটন এবং তেহরানের এই দ্বিমুখী চালের ওপর নির্ভর করছে আগামী দিনের বিশ্বরাজনীতি। এই সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং জাতিসংঘকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন