আল-আকসার প্রবেশদ্বারে ইসরাইলের আগ্রাসন: ফিলিস্তিনিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ ও জেরুজালেমের পরিচয় বদলের সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র
আন্তর্জাতিক ডেস্ক (দিগন্ত বাংলা নিউজ):
পবিত্র জেরুজালেম শহরের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্বকে কেন্দ্র করে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সংঘাত এবার এক নতুন এবং বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। মুসলমানদের প্রথম কিবলা ও তৃতীয় পবিত্রতম স্থান আল-আকসা মসজিদের একেবারে নিকটবর্তী এলাকায় অবস্থিত ফিলিস্তিনি মালিকানাধীন প্রাচীন এবং মূল্যবান সম্পত্তিগুলো সম্পূর্ণভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রক্রিয়া নজিরবিহীনভাবে জোরদার করেছে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। ফিলিস্তিনি জনগণ, ধর্মীয় নেতা এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা ইসরাইলের এই আগ্রাসী পদক্ষেপকে পবিত্র শহর জেরুজালেমকে সম্পূর্ণভাবে ‘ইহুদিকরণ’ (Judaization) করার একটি সুদূরপ্রসারী ও সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন।
আমাদের বিশেষ নিউজ পোর্টাল 'দিগন্ত বাংলা নিউজ'-এর আন্তর্জাতিক ডেস্কে আসা তথ্য অনুযায়ী, চলমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং গাজা ও আঞ্চলিক সংকটের সুযোগ নিয়ে ইসরাইল এই বিতর্কিত প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দ্রুততার সাথে বাস্তবায়ন করতে চাইছে। বিশ্ববাসীর নজর যখন অন্য বড় বড় সংকটের দিকে, ঠিক তখনই পর্দার আড়ালে জেরুজালেমের ওল্ড সিটি বা পুরনো শহরের ভৌগোলিক ও জনসংখ্যাতাত্ত্বিক চরিত্র বদলে ফেলার এই চূড়ান্ত ছক সাজানো হয়েছে।
ইসরাইলি মন্ত্রিসভার নতুন সিদ্ধান্ত ও বিশেষ কমিটি গঠন
জেরুজালেমের ওল্ড সিটির ভেতরে ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘদিনের বসতি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্ছেদ করতে ইসরাইল সরকার এখন সম্পূর্ণ আইনি ও প্রশাসনিক শক্তি প্রয়োগ করছে। সম্প্রতি ইসরাইলি মন্ত্রিসভা একটি উচ্চপর্যায়ের 'আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি' গঠনের অনুমোদন দিয়েছে। এই বিশেষ কমিটির মূল এবং একমাত্র দায়িত্ব হলো আল-আকসা মসজিদে প্রবেশের অন্যতম প্রধান এবং ঐতিহাসিক পথ ‘বাব আল-সিলসিলা’ (যা বিশ্বজুড়ে চেইন গেট নামে পরিচিত) এলাকার পুরনো এবং প্রাচীন সম্পত্তিগুলো বাজেয়াপ্ত করার আগের আদেশগুলো চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়ন করা।
হিব্রু সংবাদমাধ্যম এবং ইসরাইলি সরকারি সূত্রগুলো এই পদক্ষেপকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের দাবি, ওল্ড সিটিতে ইসরাইলের সার্বিক সার্বভৌমত্ব সুসংহত করার জন্য এটি অত্যন্ত জরুরি। একই সাথে জাফা গেট, ইহুদি কোয়ার্টার এবং ওয়েস্টার্ন ওয়ালের (পশ্চিম দেয়াল) মধ্যবর্তী সংযোগ পথকে সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং ইসরাইলি নাগরিকদের জন্য নির্বিঘ্ন করতেই এই বিশেষ কমিটি কাজ করছে। তবে ফিলিস্তিনিদের দাবি, এটি আসলে ঐতিহাসিক মুসলিম স্থাপত্য ও এলাকাগুলোকে গ্রাস করার একটি অজুহাত মাত্র।
১৯৬৭ সালের বিতর্কিত আইনের পুনর্ব্যবহার
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইল এখানে কোনো নতুন আইন তৈরি করেনি, বরং তারা কয়েক দশক পুরনো একটি কালো আইনকে পুনরায় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধের পর ইসরাইল যখন আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে পূর্ব জেরুজালেম দখল করেছিল, তখন ফিলিস্তিনিদের বহু সম্পত্তি একতরফাভাবে বাজেয়াপ্ত করা হয়। কিন্তু বিগত কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন আইনি জটিলতা, ফিলিস্তিনিদের তীব্র প্রতিরোধ এবং আন্তর্জাতিক চাপের কারণে রাষ্ট্র এই সম্পত্তিগুলোর ওপর পূর্ণ মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
আইনি ও কৌশলগত কারণে এতোদিন যে ফাইলগুলো ঝুলে ছিল, নবগঠিত বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সেগুলোর ওপর রাষ্ট্রের শতভাগ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাই বর্তমান কট্টরপন্থী ইসরাইলি সরকারের মূল লক্ষ্য। দিগন্ত বাংলা নিউজ জানতে পেরেছে যে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এই বিশেষ কমিটি সম্পত্তি চূড়ান্তভাবে বাজেয়াপ্ত করার চূড়ান্ত সুপারিশ বা রূপরেখা সরকারের কাছে জমা দেবে, যার পর উচ্ছেদ প্রক্রিয়া পুরোদমে শুরু হবে।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের নতুন শর্ত: মধ্যপ্রাচ্যে বড় পরিবর্তনের আভাস
হুমকির মুখে বাব আল-সিলসিলার প্রাচীন ঐতিহ্য
জেরুজালেম পৌরসভা সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এই নতুন সরকারি আদেশের ফলে বাব আল-সিলসিলা এলাকার প্রায় ১৫ থেকে ২০টি ফিলিস্তিনি আবাসিক বাড়ি, প্রাচীন ভবন এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সরাসরি উচ্ছেদ ও ধ্বংসের মুখে পড়েছে। ভৌগোলিক ও ধর্মীয় দিক থেকে এই অঞ্চলটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। অত্যন্ত জনাকীর্ণ ও সরু পাথুরে সড়কটি ওল্ড সিটির ভেতর দিয়ে সরাসরি আল-আকসা মসজিদের পশ্চিম তোরণে গিয়ে মিশেছে। ফলে এই পথের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অর্থ হলো আল-আকসা মসজিদের প্রবেশপথের ওপর পূর্ণ আধিপত্য বিস্তার করা।
আল-আকসা মসজিদের ইমামের হুঁশিয়ারি
আল-আকসা মসজিদের বিশিষ্ট খতিব ও ইমাম শেখ একরিমা সাবরি এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, বাব আল-সিলসিলা সড়কের দুই পাশে মামলুক ও অটোমান (উসমানীয়) আমলের বহু প্রাচীন ইসলামিক স্থাপত্য, ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ও ঐতিহ্যবাহী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলোর বেশিরভাগই পবিত্র ইসলামিক ওয়াকফ (Waqf) সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, দখলদার ইসরাইলি administrations-এর প্রতিটি পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো জেরুজালেমের ইসলামিক ও খ্রিস্টীয় ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং জনসংখ্যাতাত্ত্বিক পরিচয় সম্পূর্ণ বদলে দিয়ে সেখানে জোরপূর্বক ইহুদি আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা।
‘জনস্বার্থ’-এর আড়ালে বৈষম্যমূলক নীতি
জেরুজালেম বিষয়ক প্রখ্যাত ফিলিস্তিনি বিশেষজ্ঞ ও গবেষক খলিল তাওফিকজি এই বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি দিক উন্মোচন করেছেন। তিনি জানান, ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পরপরই ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ ফিলিস্তিনিদের এই মূল্যবান সম্পত্তিগুলো প্রথম যখন দখল করেছিল, তখন তারা 'জনস্বার্থ' বা 'পাবলিক ডোমেইন'-এর দোহাই দিয়েছিল। সাধারণত আধুনিক রাষ্ট্রে স্কুল, হাসপাতাল বা রাস্তাঘাট নির্মাণের মতো জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য জমি অধিগ্রহণের আইন থাকে। ইসরাইল সেই আইনটিকেই ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে।
খলিল তাওফিকজি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "এখানে 'জনস্বার্থ' বলতে কেবল এবং কেবলমাত্র ইসরাইলি ইহুদি জনগণের স্বার্থকে বোঝানো হয়েছে। এর সাথে স্থানীয় ফিলিস্তিনি, মুসলিম বা খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের কল্যাণের দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই।" তিনি আরও জানান, গত কয়েক দশকে ধাপে ধাপে বহু ফিলিস্তিনি পরিবারকে এই এলাকা থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, কিছু ঐতিহাসিক ভবনের ওপরের تলায় ইসরাইলি অবৈধ বসতিস্থাপনকারীরা (Settlers) এসে বসবাস শুরু করেছে, আর নিচের তলায় ফিলিস্তিনিরা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এখনো ছোটখাটো ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এখন ইসরাইল এই দ্বৈত শাসনের অবসান ঘটিয়ে পুরো অঞ্চলের একক নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়।
বৈশ্বিক ধর্মের মিলনস্থলে ভূ-রাজনৈতিক চাল
বাব আল-সিলসিলা অঞ্চলটি কেবল মুসলমানদের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটি খ্রিস্টানদের পবিত্র তীর্থযাত্রার পথ ‘ভায়া ডলোরোসা’ (দার্থ আল-আলাম) এবং ইহুদি ও মুসলিমদের পবিত্র স্থানগুলোর একদম মিলনস্থলে অবস্থিত। ফলে এই কৌশলগত অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মানে হলো পুরো জেরুজালেম শহরের বৈশ্বিক ও বহুমাত্রিক পরিচিতিকে একক কোনো গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা।
বর্তমানে বিশ্ববাসীর নজর মূলত গাজা উপত্যকার যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক regional উত্তেজনার দিকে নিবদ্ধ রয়েছে। ফিলিস্তিনিদের আশঙ্কা, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও পরাশক্তিগুলোর এই অন্যমনস্কতার পূর্ণ সুযোগ নিচ্ছে ইসরাইল। তারা বিশ্ববাসীর আড়ালে জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের হাজার বছরের প্রাচীন অস্তিত্বের শেষ চিহ্নটুকু মুছে ফেলার এই প্রক্রিয়াকে আরও বেগবান করছে।
আন্তর্জাতিক মহলে আইনি লড়াই ও ভবিষ্যৎ প্রতিরোধ
ইসরাইলের এই একতরফা এবং আন্তর্জাতিক আইন পরিপন্থী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি জাতীয় প্রতিষ্ঠান এবং ইসলামিক ওয়াকফ কর্মকর্তারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা ইতিমধ্যে জেরুজালেমের পবিত্র স্থানগুলোর ঐতিহাসিক অভিভাবক জর্ডান প্রশাসনসহ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে আইনি ও রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছেন। জাতিসংঘের ইউনেস্কো (UNESCO)-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাকে ওল্ড সিটির প্রাচীন হেরিটেজ সাইটগুলো রক্ষা করার জন্য আবেদন জানানো হয়েছে।
তবে ফিলিস্তিনিদের দাবি, কেবল কাগুজে আইনি লড়াই দিয়ে ইসরাইলের এই আগ্রাসন থামানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন মুসলিম বিশ্বের ঐক্যবদ্ধ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ। যদি বিশ্ব সম্প্রদায় এখনই এই বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ না নেয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে আল-আকসা মসজিদের চারপাশের পুরো এলাকাটি ফিলিস্তিনি শূন্য হয়ে পড়বে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির পথকে চিরতরে বন্ধ করে দিতে পারে। এই সংবেদনশীল ইস্যুর প্রতি মুহূর্তের খবরের জন্য চোখ রাখুন 'দিগন্ত বাংলা নিউজ'-এর পাতায়।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।