ডোনাল্ড ট্রাম্প কি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ‘ভিয়েতনাম ট্র্যাপে’ পড়তে যাচ্ছেন?

ডোনাল্ড ট্রাম্প কি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ‘ভিয়েতনাম ট্র্যাপে’ পড়তে যাচ্ছেন?

ট্রাম্পের ইরান নীতি এবং ‘ভিয়েতনাম ট্র্যাপ’: মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন কৌশলের চরম ব্যর্থতা?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক / দিগন্ত বাংলা নিউজ

​বিশ্ব রাজনীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরন সবসময়ই অনিশ্চয়তায় ঘেরা। কখনো তিনি চিরশত্রু দেশের বিরুদ্ধে চরম সামরিক হামলার হুমকি দেন, আবার কয়েকদিনের ব্যবধানে নিজেই সেই পরিকল্পনা বাতিল করে আলোচনার টেবিলে বসার আহ্বান জানান। ইরান ইস্যুতেও মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই আপাতবিরোধী আচরণ বিশ্বজুড়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ট্রাম্প এবং তাঁর প্রশাসন প্রায়শই দাবি করে আসছেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান এই মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা জয়ী হচ্ছে। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব চিত্র এবং খোদ মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দফতর পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা।

​এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ইরানবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক বিশেষ দূত রব ম্যালি এক বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন। তিনি ট্রাম্প প্রশাসনকে সতর্ক করে বলেছেন, ওয়াশিংটন যদি বর্তমান রণকৌশল পরিবর্তন না করে, তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প খুব শীঘ্রই মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন ‘ভিয়েতনাম ফাঁদে’ (Vietnam Trap) পড়তে যাচ্ছেন।

​ভিয়েতনাম ট্র্যাপ কী এবং ইরানের সাথে এর মিল কোথায়?

​ইতিহাসের পাতায় ‘ভিয়েতনাম যুদ্ধ’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক চিরস্থায়ী কলঙ্ক এবং সামরিক ব্যর্থতার প্রতীক। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন ভেবেছিল, তাদের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, বিপুল অস্ত্রভাণ্ডার এবং আকাশপথের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে খুব সহজেই ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট গেরিলাদের পরাস্ত করা যাবে। দিনের পর দিন মার্কিন বাহিনী ভিয়েতনামে শত শত টন বোমা ফেলেছে, বিপুল সংখ্যক গেরিলাকে হত্যা করেছে এবং সামরিকভাবে 'সাফল্যের' খতিয়ান তুলে ধরেছে। কিন্তু বাস্তব ফল ছিল শূন্য। দীর্ঘস্থায়ী সেই যুদ্ধ মার্কিন অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছিল এবং হাজার হাজার মার্কিন সেনার লাশ দেশে ফিরেছিল। শেষ পর্যন্ত একপ্রকার অপমানজনকভাবে ভিয়েতনাম ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল পরাশক্তি আমেরিকা।

​সাবেক মার্কিন দূত রব ম্যালির মতে, ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসন ঠিক একই ধরনের ভুলের পুনরাবৃত্তি করছে। আল জাজিরাকে দেওয়া একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে ম্যালি উল্লেখ করেন, হোয়াইট হাউস বর্তমানে যুদ্ধের সাফল্য যেভাবে মূল্যায়ন করছে, তা সম্পূর্ণ ভুল ও বিভ্রান্তিকর। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কতজন ইরানি শীর্ষ সামরিক নেতাকে হত্যা করতে পারল, কিংবা ইরানের কতটি নৌযান, রাডার ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ধ্বংস করা হলো—সেসব পরিসংখ্যান দিয়ে এই যুদ্ধের মূল ফলাফল নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এগুলোকে তিনি ‘ভুল সূচক’ (Wrong Indicators) হিসেবে অভিহিত করেছেন। কারণ, সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করলেও ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রভাবকে মার্কিন প্রশাসন বিন্দুমাত্র দমাতে পারেনি।

আরও পড়ুন: ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তির সুবর্ণ সুযোগ দেখছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প

ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তির সুবর্ণ সুযোগ দেখছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প

​পেন্টাগনের চাঞ্চল্যকর দাবি: আরও শক্তিশালী হয়েছে ইরান

​রব ম্যালির এই বক্তব্যের পেছনে শক্তিশালী প্রমাণ মিলছে খোদ মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগনের গোপন নথিতে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান বাহিনী গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানের বিভিন্ন কৌশলগত অবস্থানে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করেছে। ওয়াশিংটনের ধারণা ছিল, এই টানা বিমান হামলার পর তেহরান অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে ভেঙে পড়বে এবং মার্কিন শর্ত মেনে চুক্তিতে বাধ্য হবে।

​কিন্তু পেন্টাগনের সাম্প্রতিক গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছে, কয়েক সপ্তাহের তীব্র বোমাবর্ষণের পরও ইরান দুর্বল হওয়া তো দূরের কথা, কৌশলগতভাবে আরও বেশি শক্তিশালী ও সুসংগঠিত হয়েছে। ইরানের আন্ডারগ্রাউন্ড মিসাইল সিটি (ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি) এবং ড্রোন উৎপাদন কারখানাগুলো অক্ষত রয়েছে। উপরন্তু, এই হামলার ফলে ইরানের সাধারণ জনগণের মধ্যে সরকারবিরোধী মনোভাব দূর হয়ে তীব্র মার্কিন-বিরোধী জাতীয়তাবাদের উদয় হয়েছে, যা তেহরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীকে রাজনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী করেছে।

​ভুল পরিকল্পনা ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ছক

​রব ম্যালি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, এই সংঘাত যে একটি অন্তহীন দীর্ঘ যুদ্ধে (Long War) রূপ নিতে যাচ্ছে, তার পেছনে একমাত্র দায়ী হলো যুক্তরাষ্ট্রের দূরদর্শিতাহীন ও ভুল পরিকল্পনা। ওয়াশিংটন কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমেই মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে চায়, যা একটি অবাস্তব চিন্তাভাবনা।

​ইতিহাস সাক্ষী, মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে শুধু বোমাবর্ষণ করে সমাধান করা যায়নি। আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেও শেষ পর্যন্ত স্থায়ী শান্তি আনতে পারেনি। ইরানের ক্ষেত্রেও একই সামরিক মডেল ব্যবহার করা হচ্ছে, যার ফলে পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হচ্ছে এবং আমেরিকা নিজের অজান্তেই একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কাদার মধ্যে ডেবে যাচ্ছে, যা থেকে বের হওয়া তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে।

​সমাধানের পথ: ভূ-রাজনীতি বনাম মনোবিজ্ঞান

​রব ম্যালি মনে করেন, এই ভয়ঙ্কর সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ হলো একটি বাস্তবসম্মত ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সমঝোতা। তিনি বলেন, “যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার একমাত্র উপায় হলো এমন একটি শান্তি চুক্তি, যেখানে শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের একপেশে স্বার্থ নয়, বরং ইরানের মূল নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থকেও সমানভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।” ইরানকে সম্পূর্ণ কোণঠাসা করে বা তাদের অস্তিত্ব বিলীন করার হুমকি দিয়ে কখনো চুক্তি করানো সম্ভব নয়।

​সাক্ষাৎকারে ম্যালি একটি অত্যন্ত চমৎকার ও ব্যতিক্রমী মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে আদৌ কোনো চুক্তি হবে কি না, তা বিশ্লেষণ করার জন্য রাজনৈতিক বা সামরিক বিশেষজ্ঞদের চেয়ে বর্তমানে 'মনোবিজ্ঞানীরা' হয়তো বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, পুরো সংকটটি এখন আর কেবল প্রাতিষ্ঠানিক নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি অনেকাংশে নির্ভর করছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত মানসিকতা, অহংকার এবং অনাকাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের অভ্যাসের ওপর। ট্রাম্পের মানসিক অস্থিরতা এবং যেকোনো মুহূর্তে নীতি পরিবর্তনের প্রবণতাই এই শান্তি প্রক্রিয়াকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ফেলছে।

​যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক

​ইরানকে কেন্দ্র করে ট্রাম্প প্রশাসনের এই ধোঁয়াশাপূর্ণ কৌশল নিয়ে এখন খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই তীব্র রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিতর্ক শুরু হয়েছে। ডেমোক্র্যাট শিবিরের পাশাপাশি অনেক অভিজ্ঞ রিপাবলিকান নীতিনির্ধারকও মনে করছেন, ট্রাম্পের এই 'হুমকি ও সমঝোতার' দ্বিধাদ্বন্দ্ব নীতি মার্কিন কূটনীতির নির্ভরযোগ্যতাকে বিশ্বমঞ্চে ক্ষুণ্ন করছে। মিত্র দেশগুলোও ওয়াশিংটনের এই হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

​বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প যদি মার্কিন সামরিক খতিয়ানের মেকি সাফল্য দেখে আত্মতুষ্টিতে ভোগেন এবং ইরানের সাথে একটি সম্মানজনক চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হন, তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ মার্কিন ইতিহাসের আরেকটি 'কালো অধ্যায়' বা দ্বিতীয় ভিয়েতনাম হিসেবে চিহ্নিত হবে।

​উপসংহার

​ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে এখন দুটি পথ খোলা রয়েছে। প্রথমটি হলো সাবেক কূটনীতিবিদ রব ম্যালির সতর্কতা আমলে নিয়ে অহংকার পরিহার করা এবং ইরানের স্বার্থকে স্বীকৃতি দিয়ে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তি করা। আর দ্বিতীয়টি হলো, সামরিক শক্তির অহংকারে অন্ধ হয়ে ইরানকে ধ্বংস করার ফাঁকা বুলি আওড়ানো, যার চূড়ান্ত পরিণতি হবে আমেরিকার জন্য একটি আত্মঘাতী ‘ভিয়েতনাম ট্র্যাপ’। পেন্টাগনের সতর্কবার্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সময় ফুরিয়ে আসছে এবং ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে বিশ্ব এক ভয়াবহ যুদ্ধের দিকে যাবে নাকি শান্তির আলো দেখবে।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন