পরমাণু চুক্তির টেবিলে ট্রাম্প: মধ্যপ্রাচ্যে কি তবে যুদ্ধের মেঘ কাটছে?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বিশ্ব রাজনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে আবারও এক নাটকীয় ও ইতিবাচক মোড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের তীব্র সামরিক উত্তেজনা এবং রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর অবশেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুর কিছুটা নরম হতে শুরু করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে একটি নতুন পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছানোর ‘খুব ভালো সম্ভাবনা’ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, তেহরানকে নতুন করে আলোচনার সুযোগ দিতেই ওয়াশিংটন তাদের পূর্বনির্ধারিত সামরিক হামলা আপাতত স্থগিত রেখেছে। তবে এই নরম সুরের আড়ালেও ট্রাম্পের প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি কিন্তু থেমে নেই।
হোয়াইট হাউসের এই নতুন অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সাময়িক স্বস্তি এনে দিলেও, দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ফিরবে কি না তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক কৌতুহল সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে যুদ্ধের বিভীষিকা, অন্যদিকে কূটনীতির টেবিল—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে এখন নতুন সমীকরণ খুঁজছে বিশ্ব।
আরব মিত্রদের অনুরোধ এবং ট্রাম্পের যুদ্ধ স্থগিতের নেপথ্য কারণ
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের (Reuters) একটি বিশেষ প্রতিবেদনে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার (১৯ মে) ইরানের ওপর একটি বড় ধরনের মার্কিন সামরিক হামলা চালানোর কথা ছিল। এই হামলার জন্য মার্কিন বিমান বাহিনী এবং নৌবাহিনী তাদের চূড়ান্ত প্রস্তুতিও সম্পন্ন করেছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত মিত্র দেশগুলোর নেতারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে এই সামরিক অভিযান পিছিয়ে দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানান।
উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর প্রধানদের যুক্তি ছিল, এই মুহূর্তে আরেকটি বড় আকারের সামরিক হামলা চালানো হলে তা চলমান শান্তি আলোচনাকে চিরতরে ধূলিসাৎ করে দেবে। তারা ট্রাম্পকে অনুরোধ করেন, তেহরানকে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ ও নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য আরও কিছুটা সময় দেওয়া হোক। মিত্রদের এই জোরালো অনুরোধ এবং কূটনৈতিক চাপের কারণেই ট্রাম্প প্রশাসন মঙ্গলবারের নির্ধারিত হামলা স্থগিত করতে বাধ্য হয়। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প নিজের সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেন, "যদি কোনো ধরনের বোমা হামলা বা রক্তপাত ছাড়াই বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধান করা যায়, তাহলে আমি ব্যক্তিগতভাবে খুবই খুশি হব।"
আরও পড়ুন: চুক্তি না হলে ইরানের কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না: হুশিয়ারি ট্রাম্পের
২৮ ফেব্রুয়ারির সংঘাত এবং এপ্রিলের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি
বর্তমান এই সংকটের শিকড় মূলত লুকিয়ে রয়েছে চলতি বছরের শুরুর দিকের ঘটনাপ্রবাহে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় আকস্মিক বড় ধরনের বিমান হামলা শুরু করে। এই হামলার তীব্রতা এত বেশি ছিল যে, তেহরানও এর পাল্টা জবাব দিতে দেরি করেনি। আত্মরক্ষার অধিকার খাটিয়ে ইরান পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক লক্ষ্যবস্তু, যুদ্ধজাহাজ এবং ড্রোন ঘাঁটিতে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ও আত্মঘাতী ড্রোন হামলা চালায়।
এই পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে এক ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরুর উপক্রম হয়েছিল। এমন এক সংকটময় পরিস্থিতিতে দক্ষিণ এশিয়ার পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র পাকিস্তান ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়। পাকিস্তানের জোরালো কূটনৈতিক মধ্যস্থতায় গত এপ্রিল মাসে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। যদিও এই যুদ্ধবিরতির মাঝেই দুই পক্ষের মধ্যে মাঝেমধ্যে বিচ্ছিন্ন হামলার ঘটনা ঘটেছে, তাসত্ত্বেও বড় ধরনের কোনো যুদ্ধ এখন পর্যন্ত এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর গভীর উদ্বেগ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি
আমেরিকা ও ইরানের এই দ্বন্দ্বে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলো, বিশেষ করে সৌদি আরব, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত। যদিও এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি এখন পর্যন্ত কোনোমতে বহাল রয়েছে, কিন্তু হোয়াইট হাউস ও তেহরানের মধ্যকার আলোচনা বারবার অচলাবস্থায় পড়ার কারণে ট্রাম্প প্রায়শই নতুন হামলার হুমকি দিয়ে আসছিলেন।
আরব দেশগুলোর প্রধান আশঙ্কা হলো, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ওপর নতুন কোনো সামরিক আগ্রাসন চালায়, তবে ইরান তার প্রতিশোধ নিতে মার্কিন ঘাঁটির পাশাপাশি প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর ওপরও পাল্টা আঘাত হানবে। তেহরান ইতিমধ্যেই হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, যুদ্ধ শুরু হলে তারা প্রতিবেশী দেশগুলোর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, প্রধান জ্বালানি বা তেল স্থাপনা এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোতে (Desalination Plants) হামলা চালাবে। উল্লেখ্য, উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো তাদের দৈনন্দিন পানির চাহিদার সিংহভাগই এই পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভর করে পূরণ করে। ফলে সেখানে একটি আঘাত পুরো অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে এক চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেবে। এই অর্থনৈতিক ও মানবিক বিপর্যয়ের ভয়েই মূলত আরব মিত্ররা ট্রাম্পকে যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিচ্ছে।
চুক্তি না হলে ‘প্ল্যান-বি’: ট্রাম্পের চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি
ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার কথা বললেও তাঁর স্বভাবসুলভ 'অগ্নি ও ক্রোধ' (Fire and Fury) নীতি থেকে সম্পূর্ণ সরে আসেননি। তিনি সাংবাদিকদের স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছেন যে, আলোচনার এই সুযোগ চিরকাল থাকবে না। যদি কোনো কারণে তেহরান মার্কিন শর্তাবলী মেনে একটি টেকসই পরমাণু সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে অত্যন্ত বড় ধরনের এবং ধ্বংসাত্মক সামরিক অভিযান চালাতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই কৌশলের নাম হলো 'সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি' (Maximum Pressure Policy)। তিনি একদিকে চুক্তির মুলা ঝুলিয়ে রাখছেন, অন্যদিকে সামরিক ধ্বংসযজ্ঞের ভয় দেখিয়ে ইরানকে আলোচনার টেবিলে নতি স্বীকার করতে বাধ্য করার চেষ্টা করছেন।
উপসংহার: বিশ্ব রাজনীতির ভবিষ্যৎ কোন দিকে?
ইরানের সঙ্গে একটি নতুন পারমাণবিক চুক্তির সম্ভাবনা এখন যতটা উজ্জ্বল, ঠিক ততটাই ভঙ্গুর। বিশ্ব রাজনীতি এখন একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। যদি ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী সত্যিই একটি ফলপ্রসূ সমাধান আসে, তবে তা হবে বর্তমান দশকের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম স্থিতিশীল হবে এবং বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা থেকে রক্ষা পাবে। তবে তেহরান তাদের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিয়ে কোনো একপেশে চুক্তি মেনে নেবে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। আগামী কয়েক সপ্তাহ নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্য কি শান্তির আলো দেখবে, নাকি আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।