আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বেইজিং, চীন: বিশ্বজুড়ে সামরিক ও কৌশলগত আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল এশিয়ার পরাশক্তি চীন। এবার তারা মার্কিন ও পশ্চিমা মিত্রদের সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে দূরবর্তী প্রশান্ত মহাসাগরে নিজেদের একটি অত্যাধুনিক পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন (Submarine) বা ডুবোজাহাজ থেকে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। বেইজিংয়ের এই আকস্মিক ও নজিরবিহীন শক্তি প্রদর্শনের পর সমগ্র এশিয়া-প্যাসিফিক বা এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তীব্র ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। চীনের এই ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতা ও আধিপত্য বিস্তারের জেরে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ওই অঞ্চলের তিন প্রধান পশ্চিমা মিত্র দেশ—জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড।
আরও পড়ুন: জুলাই বিপ্লবের স্মৃতিচারণ: বাঁচলে গাজী মরলে শহীদ ভেবেই গুলির সামনে দাঁড়িয়েছিলাম
আজ সোমবার (৬ জুলাই) বেইজিংয়ের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম ও বৈশ্বিক সামরিক বিশ্লেষকদের বরাতে এই চাঞ্চল্যকর ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
আন্তর্জাতিক জলসীমায় পরমাণু সাবমেরিন থেকে সফল উৎক্ষেপণ
চীনের সরকারি ও প্রধান বার্তা সংস্থা ‘সিনহুয়া’ (Xinhua) তাদের এক বিশেষ সামরিক বুলেটিনে জানিয়েছে, দেশটির নৌবাহিনীর প্রধান শাখা—পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভি (PLAN) এই বিশেষ অপারেশনটি পরিচালনা করেছে। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, সোমবার স্থানীয় সময় ঠিক দুপুর ১২টা ১ মিনিটে প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে অবস্থানরত একটি চিনের পারমাণবিক শক্তিচালিত অ্যাটাক সাবমেরিন থেকে এই ক্ষেপণাস্ত্রটি মহাকাশের উদ্দেশ্যে ছোঁড়া হয়।
সামরিক শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখার এই মহড়ায় ক্ষেপণাস্ত্রটিতে কোনো আসল পারমাণবিক বোমা বা যুদ্ধাস্ত্র যুক্ত ছিল না, বরং তার পরিবর্তে একটি কৃত্রিম বা ‘নকল ওয়ারহেড’ (Dummy Warhead) ব্যবহার করা হয়েছিল।
উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন এই ক্ষেপণাস্ত্রটি উৎক্ষেপণের পর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের একটি সুনির্দিষ্ট এবং আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত জলসীমায় অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আঘাত হানে। তবে এই ক্ষেপণাস্ত্রটি ঠিক কোন সাবমেরিন থেকে ছোঁড়া হয়েছে এবং প্রশান্ত মহাসাগরের কোন অক্ষাংশে গিয়ে এটি আছড়ে পড়েছে, তা সামরিক গোপনীয়তার স্বার্থে বেইজিং প্রকাশ করেনি। চীনের বার্তা সংস্থা সিনহুয়া এই সম্পূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকে একটি ‘নিয়মিত বার্ষিক সামরিক প্রশিক্ষণের অংশ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তারা দাবি করেছে যে, এই সামরিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ বৈশ্বিক আইন মেনে করা হয়েছে এবং এটি নির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্র বা বহিরাগত লক্ষ্যবস্তুকে উদ্দেশ্য করে চালানো হয়নি।
অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কড়া প্রতিক্রিয়া ও আঞ্চলিক উদ্বেগ
চীনের এই দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার পর সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে ওশেনিয়া অঞ্চলে। ক্যানবেরার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বেইজিং এই ক্ষেপণাস্ত্রটি উৎক্ষেপণের বেশ কিছুদিন আগেই আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়া সরকারকে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত বা নোটিশ প্রদান করেছিল। তবে আগাম তথ্য দিলেও এই ধরণের পদক্ষেপকে ওই অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় ধরণের ‘হুমকি’ ও ‘উসকানিমূলক’ বলে মনে করছে অস্ট্রেলিয়া।
বর্তমানে ওশেনিয়া অঞ্চলের দ্বীপ রাষ্ট্র ফিজির রাজধানী সুভায় এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সফরে অবস্থান করছেন অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওয়ং। সেখানে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি চীনের এই পারমাণবিক সাবমেরিনের মহড়া নিয়ে বেইজিংয়ের তীব্র সমালোচনা করেন।
পেনি ওয়ং সংবাদকর্মীদের সামনে তাঁর দেশের অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন:
"চীন এমন এক সময় ও প্রেক্ষাপটে এই ধরণের পরমাণু সাবমেরিন ও ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালাল, যখন দেশটি সমান্তরালভাবে এবং অত্যন্ত দ্রুত গতিতে তাদের সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়েই চলেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এই অঞ্চলের ছোট-বড় রাষ্ট্রগুলোর প্রত্যাশা অনুযায়ী চীনের এই ধরণের সামরিক মহড়ার মূল উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য ঠিক কী—সে বিষয়ে তাদের আন্তর্জাতিক স্বচ্ছতা ও আশ্বাসের চরম ঘাটতি রয়েছে। এই ধরণের আচরণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক বিশ্বাসকে ব্যাহত করে।"
ফিজি-অস্ট্রেলিয়া ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা চুক্তি ও বেইজিংয়ের চাল
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা চীনের এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সময় বা টাইমিংকে অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। এই পরীক্ষাটি এমন এক দিনে চালানো হলো, যার ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগেই প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম কৌশলগত দ্বীপ রাষ্ট্র ফিজির সাথে অস্ট্রেলিয়া সরকারের একটি ঐতিহাসিক ও বৃহত্তম ‘প্রতিরক্ষা চুক্তি’ বা সিকিউরিটি প্যাক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই বিশেষ চুক্তির মূল শর্ত হলো—যদি ভবিষ্যতে কোনো বহিরাগত শত্রু শক্তি দ্বারা অস্ট্রেলিয়া বা ফিজি আক্রান্ত হয়, তবে দুই দেশ যৌথভাবে একে অপরের সহায়তায় সামরিক বাহিনী নিয়ে এগিয়ে আসবে।
এই চুক্তির ফলে ওশেনিয়ার এই শান্তি অঞ্চলে মার্কিন-অস্ট্রেলিয়া জোটের সামরিক প্রভাব আরও মজবুত হলো। আর এই প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় চীনের পারমাণবিক সাবমেরিন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার ঘটনাটি কোনো কাকতালীয় বিষয় নয় বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। নিউজিল্যান্ড ভিত্তিক আন্তর্জাতিক জাহাজ ও সামরিক যান ট্র্যাকিং বিষয়ক বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ‘স্টারবোর্ড মেরিটাইম ইন্টেলিজেন্স’-এর প্রধান গবেষক ও বিশ্লেষক মার্ক ডগলাস এই বিষয়ে একটি চমৎকার পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। তিনি বলেন, "চীনের এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাটি প্রযুক্তিগতভাবে অনেক আগে থেকেই নকশা করা হয়েছিল, তা ঠিক। তবে অস্ট্রেলিয়া ও ফিজি যখন যৌথভাবে ওশেনিয়া অঞ্চলে এক ধরণের ‘ওশেন অব পিস অ্যালায়েন্স’ (Ocean of Peace Alliance) বা শান্তির মহাসাগরীয় জোট গঠন করল, ঠিক তার পরপরই চীনের এই ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া এবং প্রজ্ঞাপন প্রকাশের সময়টি যেকোনো ভূ-রাজনৈতিক বিবেচনায় বেশ কৌতূহল উদ্দীপক ও ইঙ্গিতপূর্ণ।" বেইজিং মূলত এর মাধ্যমে ওয়াশিংটন ও ক্যানবেরাকে বার্তা দিল যে, দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে তাদের উপস্থিতি কোনোভাবেই অগ্রাহ্য করা যাবে না।
দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর স্বায়ত্তশাসন ও চীনের কূটনৈতিক অবস্থান
ফিজি এবং তার আশেপাশের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোতে নিজেদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বিস্তার করার জন্য বেইজিং এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-অস্ট্রেলিয়ার নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা শক্তিগুলোর মধ্যে গত এক দশক ধরে এক অলিখিত ও তীব্র শীতল যুদ্ধ বা প্রতিযোগিতা চলে আসছে। চীন মূলত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) এবং বিভিন্ন আকর্ষণীয় ঋণ কর্মসূচির মাধ্যমে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে নিজেদের অর্থনৈতিক ও স্থায়ী নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে চাইছে, যা পশ্চিমাদের মাথাব্যথার মূল কারণ।
আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে পূর্ব শত্রুতার জেরে কৃষকের খড়ের গাদায় আগুন: লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি
অস্ট্রেলিয়া ও ফিজির মধ্যকার এই নতুন দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং চীনের সাবমেরিন মহড়ার পর বেইজিংয়ের পক্ষ থেকেও একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী মুখপাত্র মাও নিং-এর কাছে পশ্চিমা সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি অত্যন্ত চতুরতার সাথে চীনের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। মুখপাত্র মাও নিং বলেন:
চীন সবসময়ই বিশ্বশান্তি ও আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন মেনে সামরিক প্রশিক্ষণ পরিচালনা করে থাকে।
প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনকে বিশ্বের সকল বড় শক্তির সম্মান জানানো উচিত।
কোনো দেশেরই উচিত নয় এই সমস্ত অঞ্চলে এমন কোনো কৃত্রিম সামরিক বা প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করা, যা সরাসরি কোনো তৃতীয় পক্ষের (চীনের) জাতীয় নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু করে কিংবা ক্ষুণ্ন করে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, চীনের টাইপ-০৯৪ বা টাইপ-০৯৬ ক্লাসের কোনো সর্বাধুনিক পারমাণবিক সাবমেরিন থেকে এই ক্ষেপণাস্ত্রটি নিক্ষেপ করা হয়ে থাকতে পারে। সমুদ্রের তলদেশ থেকে পারমাণবিক মিসাইল ছোঁড়ার এই সক্ষমতা প্রমাণ করে যে, আমেরিকার মূল ভূখণ্ড এখন চীনের সেকেন্ড-স্ট্রাইক ক্যাপাবিলিটি বা পাল্টা আঘাত হানার সীমানার মধ্যে চলে এসেছে, যা আগামী দিনে এই অঞ্চলের ক্ষমতার সমীকরণকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে।
সংক্ষিপ্ত সংবাদ সূত্র: চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া ও আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।