সিরাজগঞ্জ ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
শাহজাদপুর প্রতিনিধি: সিরাজগঞ্জ জেলার অন্যতম প্রধান কৃষিনির্ভর এলাকা শাহজাদপুর উপজেলায় এক বর্বরোচিত ও ন্যাক্কারজনক অপরাধের ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। উপজেলার এক প্রান্তিক ও অসহায় কৃষকের বছরব্যাপী গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে জমিয়ে রাখা বিশাল খড়ের গাদায় গভীর রাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই নাশকতামূলক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ওই কৃষকের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে এবং টাকার অঙ্কে প্রায় ১ লক্ষাধিক টাকার খড় সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
ঘটনাটি কেবল একটি অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, বরং গ্রামীণ জনপদে পূর্ব শত্রুতার জেরে কতটা হিংস্র আচরণ করা হতে পারে, এটি তার একটি বড় উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে। এই ন্যক্কারজনক ঘটনার পর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারটি চরম হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে এবং পুরো গ্রামজুড়ে এক ধরণের থমথমে পরিস্থিতি ও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
গভীর রাতের নাশকতার লোমহর্ষক বিবরণ
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী, ভুক্তভোগী পরিবার এবং গ্রামবাসী সূত্রে জানা গেছে, এই অনাকাঙ্ক্ষিত নাশকতার ঘটনাটি ঘটেছে শাহজাদপুর উপজেলার অন্তর্গত কৈজুরী ইউনিয়নের গোপীনাথপুর নতুনপাড়া গ্রামে। গত ২৮ জুন গভীর রাতে যখন পুরো গ্রামের মানুষ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন, ঠিক সেই নির্জন ও অন্ধকার সুযোগটি কাজে লাগায় অজ্ঞাতপরিচয় বা ওঁৎ পেতে থাকা দুর্বৃত্তরা।
আরও পড়ুন: ময়মনসিংহে চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড: মাকে ধর্ষণের অভিযোগে যুবককে জবাই, ৪ ভাই আটক
গোপীনাথপুর নতুনপাড়া গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা ও পেশায় কঠোর পরিশ্রমী কৃষক ওহাব মোল্লা তাঁর গৃহপালিত গবাদি পশুর সারা বছরের খাদ্যের সংস্থান হিসেবে বাড়ির পাশে একটি বিশাল খড়ের গাদা বা ‘পালং’ তৈরি করেছিলেন।
২৮ জুন রাতের কোনো এক শেষ প্রহরে অত্যন্ত চতুরতার সাথে ওই খড়ের গাদার নিচের অংশে দাহ্য পদার্থ বা দিয়াশলাইয়ের সাহায্যে আগুন ধরিয়ে দেয় নাশকতাহীনেরা। শুকনা খড় হওয়ায় আগুন লাগার সাথে সাথেই তা মুহূর্তের মধ্যে দাউ দাউ করে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের লেলিহান শিখা এতই তীব্র ছিল যে, পুরো খড়ের গাদাটি চোখের পলকেই আগুনের গোলকায় পরিণত হয়। মাঝরাতে আগুনের উত্তাপ এবং পোড়া গন্ধ পেয়ে ওহাব মোল্লার পরিবারের সদস্যরা জেগে ওঠেন এবং তাদের চিৎকার ও চিৎকারে প্রতিবেশীরাও ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তবে ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে, গ্রামবাসীরা চেষ্টা করেও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার আগেই ওহাব মোল্লার সারা বছরের কষ্টার্জিত পুরো খড়ের গাদাটি পুড়ে ছাই হয়ে মাটির সাথে মিশে যায়।
পূর্ব শত্রুতা ও প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ
এই ন্যক্কারজনক অগ্নিকাণ্ডের পেছনে কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত শত্রুতা কাজ করেছে বলে জোরালো দাবি করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ওহাব মোল্লা। তিনি গণমাধ্যমের সামনে অত্যন্ত আবেগঘন ও ক্ষোভমিশ্রিত কণ্ঠে অভিযোগ করেন যে, কে বা কারা এই কাপুরুষোচিত ঘটনাটি ঘটিয়েছে তা অন্ধকারের কারণে সুনির্দিষ্টভাবে হাতেনাতে ধরা না গেলেও, তাদের এক নিকট প্রতিবেশীর সাথে দীর্ঘদিনের পারিবারিক ও জমিজমা সংক্রান্ত পূর্ব শত্রুতা চলে আসছিল।
ওহাব মোল্লার সন্দেহ, ওই প্রতিবেশীই তাঁর চরম ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে এবং তাঁকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য এই অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়েছে। ওহাব মোল্লার পরিবারের সদস্যরা আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করে দাবি করেছেন যে:
খড়ের গাদায় আগুন দেওয়ার ঘটনার ঠিক দুই দিন আগেও ওই নির্দিষ্ট প্রতিবেশী ওহাব মোল্লার পরিবারের সাথে তুচ্ছ কারণে বিবাদে জড়ান।
সে সময় ওই প্রতিবেশী ওহাব মোল্লাকে দেখে নেওয়ার এবং তাঁর বড় ধরণের ক্ষতি করার সরাসরি হুমকি-ধমকি দিয়েছিলেন।
হুমকি দেওয়ার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মাথায় এমন ঘটনা ঘটায় স্থানীয়দের সন্দেহের তিরও এখন ওই প্রতিবেশীর দিকেই যাচ্ছে।
আইনের আশ্রয় ও ভুক্তভোগী কৃষকের আকুল আবেদন
নিজের শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ওহাব মোল্লা। বর্তমান বাজারে খড়ের যে চড়া দাম, তাতে নতুন করে গবাদি পশুর জন্য খাদ্য কেনা তাঁর মতো একজন সাধারণ কৃষকের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। কান্নাজড়িত কণ্ঠে ভুক্তভোগী ওহাব মোল্লা বলেন:
আরও পড়ুন: উত্তর কোরিয়ার নতুন ৫ হাজার টনি যুদ্ধজাহাজ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা: কিম জং উনের হুঁশিয়ারি
"আমি একজন সাধারণ কৃষক, মানুষের সাথে কোনো অন্যায়ে জড়াই না। যারা আমার সারা বছরের গবাদি পশুর মুখের গ্রাস এভাবে পুড়িয়ে দিল, আমি তাদের এই অমানবিক কর্মকাণ্ডের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত চাই। আমি প্রশাসনের কাছে আকুল আবেদন জানাচ্ছি, যেন প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হয় এবং তাদের দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়, যাতে ভবিষ্যতে গ্রামের কোনো গরিব কৃষকের পেটে কেউ লাথি মারার সাহস না পায়।"
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান ও স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া
শাহজাদপুরের গোপীনাথপুর নতুনপাড়া গ্রামে কৃষকের খড়ের গাদায় আগুন দেওয়ার এই ঘটনার পর এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট স্থানীয় থানা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো লিখিত বা মৌখিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় ইউপি সদস্য এবং গ্রামের মাতব্বররা বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।
এদিকে গ্রামের সাধারণ মানুষ ও যুবসমাজ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। স্থানীয় সচেতন বাসিন্দাদের মতে, গ্রামে কোনো শত্রুতা থাকলে তা আইন বা সালিশের মাধ্যমে সমাধান করা উচিত, কিন্তু এভাবে রাতের আঁধারে কারো সম্পদ পুড়িয়ে দেওয়া চরম কাপুরুষতা এবং ফৌজদারি অপরাধ। তারা অনতিবিলম্বে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত শুরু করার এবং গ্রামে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন। ওহাব মোল্লা এই বিষয়ে শাহজাদপুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে তাঁর পারিবারিক সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
সংক্ষিপ্ত সংবাদ সূত্র: শাহজাদপুর স্থানীয় ভুক্তভোগী পরিবার ও গ্রামবাসী।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।