ময়মনসিংহে চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড: মাকে ধর্ষণের অভিযোগে যুবককে জবাই, ৪ ভাই আটক

ময়মনসিংহে চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড: মাকে ধর্ষণের অভিযোগে যুবককে জবাই, ৪ ভাই আটক
ছবি: সংগৃহীত

অপরাধ ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি: বিভাগীয় শহর ময়মনসিংহে এক চরম উত্তেজনাপূর্ণ ও রোমাঞ্চকর ক্লু-লেস হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এক মধ্যবয়সী নারীকে পাশবিক নির্যাতনের বা ধর্ষণের প্রতিশোধ নিতে তাঁর চার ছেলে মিলে এক যুবককে ঘরের ভেতর অবরুদ্ধ করে অত্যন্ত নৃশংসভাবে জবাই করে হত্যা করেছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ভরদুপুরে বা প্রকাশ্য সকালের এই রক্তক্ষয়ী আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনায় পুরো কলোনি এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

ঘটনাটি জানার পরপরই ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দ্রুত পদক্ষেপ নেন। তারা হত্যাকাণ্ডের সাথে সরাসরি জড়িত থাকার সন্দেহে ওই নারীর চার সন্তানকে তাৎক্ষণিকভাবে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছেন।

আরও পড়ুন: বরগুনায় সংরক্ষিত বন দখল ও গাছ কাটার মামলা: ইউপি সদস্যসহ ৫ জন কারাগারে

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতে, অপরাধের ধরনটি অত্যন্ত ভয়াবহ এবং এর পেছনে পারিবারিক সম্মানহানির মতো স্পর্শকাতর মনস্তাত্ত্বিক কারণ জড়িয়ে রয়েছে।

কলোনির ঘরে ঢুকে নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা

স্থানীয় বাসিন্দাদের বিবরণ এবং থানা পুলিশের প্রাথমিক তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটেছে ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশন এলাকার অন্তর্গত রামকৃষ্ণ মিশন রোড সংলগ্ন অত্যন্ত জনাকীর্ণ '৩৬ বাড়ি কলোনি' এলাকায়। গত রবিবার (৫ জুলাই) সকালবেলা যখন কলোনির মানুষজন দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত হচ্ছিলেন, ঠিক তখন এই রক্তক্ষয়ী ঘটনাটি ঘটে।

হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া ওই যুবকের নাম কাইল্লা রুবেল (৩৫)। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ওই ৩৬ বাড়ি কলোনি এলাকার একটি বাসা ভাড়া নিয়ে একাকী বা অস্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছিলেন। স্থানীয়ভাবে তাঁর বিরুদ্ধে নানা ধরণের অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ছিল বলে জানা গেছে।

রবিবার সকালে চারজন যুবক আকস্মিকভাবে রুবেলের ভাড়া বাসায় জোরপূর্বক প্রবেশ করে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা ধারালো দেশীয় অস্ত্র দিয়ে রুবেলের ওপর চড়াও হয় এবং তাকে বিছানায় চেপে ধরে সরাসরি গলায় পোঁচ দিয়ে জবাই করে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে কোনো প্রকার চিকিৎসার সুযোগ পাওয়ার আগেই ঘটনাস্থলেই রুবেলের মৃত্যু নিশ্চিত হয়। কাজ শেষ করে খুনিরা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও স্থানীয়দের তৎপরতায় তা ভেস্তে যায়।

হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ‘মায়ের ওপর পাশবিক নির্যাতন’

পুলিশ ও স্থানীয় বিভিন্ন গোপন সূত্র থেকে জানা গেছে, এই নৃশংস খুনের ঘটনার পেছনে একটি গভীর ও সংবেদনশীল ক্ষোভের ইতিহাস রয়েছে। নিহত কাইল্লা রুবেলের বিরুদ্ধে কিছুদিন আগে স্থানীয় এক অসহায় নারীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ বা গুরুতর যৌন হেনস্থা করার একটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছিল। এই ঘটনাটি ওই নারীর পরিবার ও সন্তানদের মধ্যে তীব্র মানসিক আঘাত এবং ক্ষোভের জন্ম দেয়।

লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা এই অপমানের প্রতিশোধ নিতেই মূলত ওই নির্যাতিতা নারীর চার সন্তান একযোগে একটি গোপন পরিকল্পনা তৈরি করে। তারা আইন ও আদালতের তোয়াক্কা না করে নিজেরাই সেই অন্যায়ের চূড়ান্ত শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই পূর্বপরিকল্পনার অংশ হিসেবেই রবিবার সকালে তারা চার ভাই মিলে সরাসরি রুবেলের ঘরে হানা দেয় এবং ধারালো চাপাতি বা ছুরি দিয়ে রুবেলের শ্বাসনালী কেটে তার প্রাণ কেড়ে নেয়। ঘটনার পর কলোনির বাসিন্দারা ঘরের ভেতর রক্তাক্ত লাশ পড়ে থাকতে দেখে কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশকে অবহিত করেন।

ঘটনাস্থলে পুলিশ ও সিআইডির ক্রাইম সিন টিম

খবর পাওয়ার সাথে সাথেই ময়মনসিংহের কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ এবং জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) একাধিক দল ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির জন্য পুলিশ পুরো এলাকাটি কর্ডন বা অবরুদ্ধ করে ফেলে। পরবর্তীতে ঘটনার গভীরতা ও আইনি আলামত নিখুঁতভাবে সংগ্রহের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) একটি বিশেষ 'ক্রাইম সিন' টিমকে খবর দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন: সরকারি ব্যানার ও বিলবোর্ডে প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহার নিষিদ্ধ: পরিপত্র জারি

সিআইডির দল ঘটনাস্থল থেকে রক্তমাখা আলামত, আঙুলের ছাপ এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বস্তু ব্যাগেজ করে ল্যাবে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে। পুলিশ নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে ময়না-তদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করেছে।

৪ ভাইকে আটক ও জেলা পুলিশ সুপারের বক্তব্য

এই প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে কলোনি ও এর আশেপাশের এলাকায় চিরুনি অভিযান চালায়। ঘটনার সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে নির্যাতিতা ওই নারীর চার ছেলেকে আটক করতে সক্ষম হয় পুলিশ। বর্তমানে তাদের একটি গোপন ও নিরাপদ স্থানে রেখে ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে, যাতে এই ঘটনার পেছনে অন্য কোনো মদদদাতা বা মোটিভ রয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়।

এই বিষয়ে ময়মনসিংহের বিজ্ঞ পুলিশ সুপার (এসপি) গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করে জানান:

"হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়া মাত্রই আমাদের ফোর্স ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করেছে এবং মূল চারজন সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে। নিহতের বিরুদ্ধে যে মায়ের ওপর পাশবিক নির্যাতনের বা ধর্ষণের অভিযোগটি আনা হচ্ছে, সেটি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছি। ওই নারী আগে কোনো আইনি কমপ্লেইন করেছিলেন কিনা বা স্থানীয়ভাবে কোনো সালিশ হয়েছিল কিনা তাও যাচাই করা হচ্ছে। তবে অভিযোগ যাই থাকুক না কেন, আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে এভাবে জবাই করার অধিকার কারও নেই। তদন্তের যাবতীয় প্রক্রিয়া ও ময়না-তদন্তের রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর আমরা সুনির্দিষ্ট ধারায় মামলা দায়ের করে আটককৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।"

সামাজিক অবক্ষয় ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা

ময়মনসিংহের এই ঘটনাটি দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থার পাশাপাশি সামাজিক নৈতিকতার একটি বড় ক্ষতকে সামনে এনেছে। স্থানীয় সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে যদি দ্রুত এবং দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত না হয়, তবে মানুষের মধ্যে প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার প্রতি এক ধরণের অনীহা তৈরি হয়। আর তার ফলেই এই ধরণের 'অনার কিলিং' বা প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ডের জন্ম নেয়, যেখানে যুবকেরা নিজেরা জল্লাদের ভূমিকা অবতীর্ণ হয়। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী স্পষ্ট জানিয়েছে, সমাজে শান্তি বজায় রাখতে যেকোনো মূল্যে এই ধরণের বেআইনি প্রতিশোধ নেওয়ার প্রবণতাকে কঠোর হস্তে দমন করা হবে। ৩৬ বাড়ি কলোনিতে যেকোনো ধরণের বিশৃঙ্খলা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে।

সংক্ষিপ্ত সংবাদ সূত্র: ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ ও কোতোয়ালি থানা সূত্র।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন