অপরাধ ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বরগুনা প্রতিনিধি: উপকূলীয় জেলা বরগুনার তালতলীতে প্রাকৃতির ঢাল হিসেবে পরিচিত সংরক্ষিত বনভূমি দখল, মূল্যবান গাছ নিধন এবং অবৈধভাবে পাকা স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় এক ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্যসহ পাঁচজনকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। দেশের পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকার বনজ সম্পদ ধ্বংসের এই ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের পর বিজ্ঞ আদালত এই সিদ্ধান্ত দিলেন।
আজ রবিবার (৫ জুলাই) দুপুরে বরগুনা জেলার আমতলী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিজ্ঞ বিচারক মো. ইফতি হাসান ইমরান আসামিদের স্থায়ী জামিন আবেদন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা শেষে তা নামঞ্জুর করেন এবং অনতিবিলম্বে তাদের জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ প্রদান করেন।
আরও পড়ুন: উত্তর কোরিয়ার নতুন ৫ হাজার টনি যুদ্ধজাহাজ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা: কিম জং উনের হুঁশিয়ারি
পরিবেশ ও বনভূমি ধ্বংসের মতো গুরুতর অপরাধে জনপ্রতিনিধির জড়িত থাকার এই ঘটনাটি জেলাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
কারাগারে পাঠানো আসামিদের পরিচয়
বন বিভাগের দায়ের করা ফৌজদারি মামলায় বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশে আইনি প্রক্রিয়া শেষে সরাসরি কারাগারে পাঠানো পাঁচজন অভিযুক্ত ব্যক্তি হলেন:
সোনাকাটা ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান ইউপি সদস্য শহীদ আকন (৩৫)।
মাসুদ খা (৫০)।
সবুজ ফকির (৩০)।
কুডি মোল্লা (৫০)।
নেকিয়ার (৩৪)।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, আসামিরা দীর্ঘদিন ধরে জামিন বা আইনি সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করলেও অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় বিজ্ঞ বিচারক তাদের আবেদন নাকচ করে দেন।
ঘটনার সূত্রপাত ও বনের ভেতর অপরাধযজ্ঞ
মামলার আনুষ্ঠানিক এজাহার এবং স্থানীয় বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ঘটনাটির সূত্রপাত হয়েছিল গত ২৬ এপ্রিল। ওই দিন বিকেল আনুমানিক তিনটার দিকে বরগুনা জেলার তালতলী উপজেলার সোনাকাটা ইউনিয়নের নিদ্রারচর এলাকার একটি গভীর ও সংরক্ষিত বনভূমিতে নিয়মিত টহল দিচ্ছিলেন বনকর্মীরা। টহল দেওয়ার একপর্যায়ে তারা বনের ভেতরের একটি অংশে অস্বাভাবিক শব্দ শুনতে পান এবং কিছু মানুষের উপস্থিতি টের পান।
বনকর্মীরা ঘটনাস্থলের কাছাকাছি গিয়ে দেখতে পান যে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা সরকারি আইন অমান্য করে বনের অত্যন্ত মূল্যবান এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষাকারী কেওড়া গাছ কাটছেন। শুধু গাছ কাটার মধ্যেই তাদের এই বেআইনি কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ ছিল না; তারা বনের ভেতরের প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা মাটি খনন বা কেটে অবৈধভাবে রাস্তা তৈরির কাজ করছিলেন। একই সাথে ওই সংরক্ষিত বনের জমি স্থায়ীভাবে দখল করার কুমানসে ইট, বালু, সিমেন্ট এবং রড ব্যবহার করে বসার জন্য পাকা বেঞ্চ ও স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
বনকর্মীদের আকস্মিক উপস্থিতি টের পেয়ে অপরাধীরা অত্যন্ত চতুরতার সাথে ‘ফরেস্টার আসছে, পালাও’ বলে চিৎকার করে ওঠেন এবং গভীর বনের মধ্য দিয়ে পার্শ্ববর্তী গ্রামীণ লোকালয়ে পালিয়ে যান। যার ফলে সে সময় তাদের হাতেনাতে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।
ঘটনাস্থল থেকে আলামত ও নির্মাণসামগ্রী জব্দ
অভিযুক্তরা পালিয়ে যাওয়ার পর সাকিনা বন বিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও বনকর্মীরা পুরো ঘটনাস্থল তল্লাশি করেন। এ সময় তারা বনের ভেতরে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের প্রমাণ পান। তারা সেখান থেকে উপড়ে ফেলা ও কেটে ফেলা একটি বিশালাকার কেওড়া গাছের গোড়া, ১০ দশমিক ৬৮ ঘনফুট পরিমাণ কেওড়া গোলকাঠ, কাঠ কাটার জন্য ব্যবহৃত ধারালো করাত এবং মাটি কাটার কোদাল উদ্ধার করেন।
এর পাশাপাশি বনের জমি দখল করে পাকা বেঞ্চ তৈরির জন্য স্তূপ করে রাখা বিপুল পরিমাণ নির্মাণসামগ্রী (ইট, বালু, রড ও সিমেন্ট) জব্দ করা হয়। পরবর্তীতে এই সমস্ত আলামত ও জব্দকৃত মালামাল আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সরকারি হেফাজতে নিয়ে আসা হয়।
বন আইনের কঠোর ধারায় মামলা দায়ের
সংরক্ষিত বনভূমির এই নজিরবিহীন ক্ষতিসাধন এবং সরকারি সম্পত্তি জবরদখলের এই ধৃষ্টতাপূর্ণ ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে বন বিভাগ। তালতলী উপজেলার সাকিনা বন বিট কর্মকর্তা রাহিমুল ইসলাম জুমেল বাদী হয়ে আমতলী থানায় সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী একটি মামলা দায়ের করেন।
আরও পড়ুন: গৌরনদীতে স্থানীয় নির্বাচনের হাওয়া: মাঠে বিএনপি-জামায়াত, আড়ালে নিষিদ্ধ আ.লীগের নীরব কৌশল
এই বিষয়ে সাকিনা বিট কর্মকর্তা রাহিমুল ইসলাম জুমেল সংবাদমাধ্যমকে বলেন:
"নিদ্রারচরের ওই সংরক্ষিত বনভূমিটি মূলত আমাদের উপকূলের জন্য একটি প্রাকৃতিক দেওয়াল। আসামিরা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক স্বার্থে বনের জমি দখল করার উদ্দেশ্যে সেখানকার মূল্যবান কেওড়া গাছ কেটে ফেলছিল। একই সঙ্গে তারা সেখানে পাকা স্থাপনা তৈরি করে স্থায়ী বসতি বা ব্যবসার ক্ষেত্র বানানোর পরিকল্পনা করছিল। সরকারি বন রক্ষার্থে আমরা কোনো আপস করিনি। আমরা আসামিদের বিরুদ্ধে The Forest Act, 1927 (যা ২০০০ সালে সংশোধিত হয়েছে)-এর ২৬(১)(খ), ২৬(১)(ঘ) এবং ২৬(১এ)(ঙ) ধারার সুনির্দিষ্ট বিধান অনুযায়ী মামলা দায়ের করেছি। বিজ্ঞ আদালত আজ মামলাটি আমলে নিয়ে আসামিদের কারাগারে পাঠানোর যে আদেশ দিয়েছেন, তা পরিবেশ রক্ষায় একটি বড় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।"
আদালতের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া
আইনি শুনানির বিষয়ে আমতলী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের পেশকার মোঃ আবু বকর সংবাদমাধ্যমের কাছে আদালতের আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বন বিভাগের দায়ের করা এই গুরুত্বপূর্ণ মামলায় আসামিরা আদালতে উপস্থিত হয়ে জামিনের স্বপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে রাষ্ট্রপক্ষ বনের পরিবেশ ধ্বংস ও গাছ কাটার সুনির্দিষ্ট আলামত ও ভিডিও বা নথিপত্র উপস্থাপন করলে বিজ্ঞ বিচারক আসামিদের স্থায়ী জামিন আবেদন সম্পূর্ণরূপে নাকচ করে দেন এবং তাদের জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ সম্বলিত ওয়ারেন্ট ইস্যু করেন। আদালতের আদেশ পাওয়ার পরপরই কঠোর পুলিশি পাহারায় ৫ জন আসামিকে বরগুনা জেলা কারাগারে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।
উপকূলীয় বনভূমি রক্ষায় সচেতন মহলের দাবি
বরগুনার তালতলী ও সোনাকাটা অঞ্চলের এই ম্যানগ্রোভ বা কেওড়া বনগুলো ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় পুরো জেলাকে রক্ষা করে। স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর মতে, স্থানীয় প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধি এবং ভূমিদস্যুদের নজর এখন এই সব বনের সরকারি জমির ওপর। তারা রাতের আঁধারে বা নির্জনতার সুযোগ নিয়ে বনের গাছ কেটে ফেলে পরবর্তীতে সেগুলোকে পতিত জমি দেখিয়ে লিজ নেওয়া বা পাকা ঘর তোলার চেষ্টা করে। ইউপি সদস্যের মতো একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির এই ধরণের অপরাধে জড়িয়ে পড়া অত্যন্ত লজ্জাজনক। সচেতন মহল আশা প্রকাশ করেছেন যে, এই মামলার সুষ্ঠু এবং দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক দীর্ঘমেয়াদী শাস্তি দেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ সুন্দরবন বা উপকূলীয় সংরক্ষিত বনের একটি পাতাও ছেঁড়ার সাহস না পায়।
সংক্ষিপ্ত সংবাদ সূত্র: আমতলী জুডিশিয়াল আদালত ও সাকিনা বন বিট অফিস।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।