ব্রেকিং নিউজ

গৌরনদীতে স্থানীয় নির্বাচনের হাওয়া: মাঠে বিএনপি-জামায়াত, আড়ালে নিষিদ্ধ আ.লীগের নীরব কৌশল

গৌরনদীতে স্থানীয় নির্বাচনের হাওয়া: মাঠে বিএনপি-জামায়াত, আড়ালে নিষিদ্ধ আ.লীগের নীরব কৌশল
ছবি: সংগৃহীত

সারাদেশ ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

বরিশাল: জাতীয় রাজনীতির পটপরিবর্তন ও মাসকয়েক আগে সমাপ্ত হওয়া সাধারণ নির্বাচনের রেশ এখনো কাটেনি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে। সেই নির্বাচনী আমেজের মধ্যেই সারা দেশের ন্যায় দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পকেট হিসেবে পরিচিত বরিশাল জেলার গৌরনদী উপজেলা ও পৌরসভায় বইতে শুরু করেছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জোর হাওয়া। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল—সবখানেই এখন আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এক নতুন সমীকরণ ও মেরুকরণ দানা বাঁধতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীরা যে যার মতো করে নির্বাচনী মাঠে নেমে পড়েছেন এবং ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণের নানামুখী চেষ্টা চালাচ্ছেন।

আরও পড়ুন: আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দাফন হয়ে গেছে, আর ফেরার সুযোগ নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন

তবে এবারের গৌরনদীর নির্বাচনী প্রেক্ষাপট অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। পুরো জনপদ এখন উৎসবের আমেজে ভাসলেও পর্দার আড়ালে বইছে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলী রাজনৈতিক হাওয়া। চায়ের দোকান, হাট-বাজার থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম—সবখানেই এখন একটাই প্রধান আলোচনা, বিগত তিন দশকের চেনা ছকে এবার আর ভোট হচ্ছে না গৌরনদীতে। ২০২৬ সালের এই স্থানীয় সরকার নির্বাচন হতে যাচ্ছে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী ও ঐতিহাসিক। আর এই নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক হাওয়ায় ভোটারদের নিজেদের পক্ষে টানতে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন বিরোধী ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। অন্যদিকে, একবারে ভিন্ন এক কৌশলে, সম্পূর্ণ নীরবে ভোটের মাঠে নিজেদের অস্তিত্ব ধরে রাখতে ও চমক দেখাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের স্থানীয় তৃণমূল নেতাকর্মীরা।

পোস্টার-ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে জনপদ: বিএনপির অভ্যন্তরীণ সুস্থ প্রতিযোগিতা

আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই পোস্টার, রঙিন ব্যানার ও ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে পুরো গৌরনদী উপজেলা এবং পৌর এলাকা। বিএনপির স্থানীয় রাজনীতির অন্দরে এখন এক উৎসবমুখর কিন্তু তীব্র প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দলের অসংখ্য নেতাকর্মী জনপ্রতিনিধি হয়ে জনগণের সেবক হওয়ার ইচ্ছা থেকে উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র, ভাইস চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর এবং মেম্বার পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে উন্মুখ হয়ে আছেন। গৌরনদী পৌর এলাকার ৯টি গুরুত্বপূর্ণ ওয়ার্ড এবং উপজেলার ৭টি প্রত্যন্ত ইউনিয়নের মোট ৬৩টি ওয়ার্ডের সর্বত্রই এখন সম্ভাব্য প্রার্থীদের পোস্টার, ফেস্টুন আর বিশালাকার বিলবোর্ডের ছড়াছড়ি দেখা যাচ্ছে। ডিজিটাল প্রিন্টিংয়ের ছোঁয়ায় ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে প্রার্থীরা নানা রঙের ব্যানার টাঙিয়ে দোয়া, আস্থার প্রতীক ও সমর্থন কামনা করছেন।

সবচেয়ে বেশি তৎপরতা এবং নির্বাচনী উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতাদের মধ্যে। দলটির হাইকমান্ড থেকে এখনো পর্যন্ত স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচনে কাউকে একক বা চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে সবুজ সংকেত বা প্রতীক প্রদান না করায়, প্রতিটি স্তরেই বিএনপির একাধিক হেভিওয়েট ও সম্ভাব্য প্রার্থী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। দলীয় সমর্থন বা প্রতীক পাওয়ার আশায় নেতাদের মধ্যে চলছে এক তীব্র অথচ অত্যন্ত সুস্থ নীরব প্রতিযোগিতা। তারা প্রত্যেকেই বিগত করোনাকালীন দুর্যোগের সময়ে এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সংকটকালে সাধারণ মানুষের পাশে থাকার নিজেদের ব্যক্তিগত খতিয়ান ও ত্যাগের কথা ভোটারদের সামনে তুলে ধরছেন। ভোটারদের মন জয় করতে তারা দিন-রাত এক করে উঠান বৈঠক, জনসংযোগ এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন।

সুসংগঠিত ও আগাম প্রস্তুতিতে এগিয়ে জামায়াতে ইসলামী

বিএনপির এই উন্মুক্ত ও বহুমুখী প্রতিযোগিতার বিপরীতে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং সুসংগঠিত কৌশলে নির্বাচনী রোডম্যাপ সাজিয়ে এগোচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির স্থানীয় ও বিশ্বস্ত সূত্র থেকে জানা গেছে, জামায়াত কোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা একাধিক প্রার্থীর জটলা এড়াতে বেশ আগেভাগেই মাঠপর্যায়ের জরিপ সম্পন্ন করেছে। উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন ও এমনকি ওয়ার্ড পর্যায়েও ইতোমধ্যে তারা একক প্রার্থী চূড়ান্ত করে ফেলেছে। দলের এই আগাম এবং অত্যন্ত সুসংগঠিত প্রস্তুতি স্থানীয় নির্বাচনী সমীকরণে সম্পূর্ণ নতুন এক মাত্রা যোগ করেছে। জামায়াতের প্রার্থীরা দলীয় সুশৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে থেকে নীরবে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের সাথে সংযোগ স্থাপন করছেন এবং ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধকে সামনে রেখে ভোট প্রার্থনা করছেন, যা নির্বাচনী মাঠে তাদের শক্ত অবস্থানের জানান দিচ্ছে।

নীরবে হাল ছাড়েনি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ: পর্দার আড়ালে নতুন সমীকরণ

গৌরনদীর নির্বাচনী রাজনীতির সবচেয়ে কৌতূহল উদ্দীপক এবং রহস্যময় অধ্যায়টি রচিত হচ্ছে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করে। ৫ই আগস্টের মহাবিপ্লব ও ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর বর্তমানে আইনিভাবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় ও প্রথম সারির কোনো নেতা প্রকাশ্যে আসতে পারছেন না। দলটির অধিকাংশ প্রভাবশালী নেতাকর্মীই রাজনৈতিক মামলার কারণে হয় এলাকাছাড়া, না হয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কঠোর নজরদারিতে রয়েছেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ নেতারা প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পারলেও তারা ‘নির্বাচনী মাঠের হাল একেবারেই ছেড়ে দেননি’।

আরও পড়ুন: সব জেলাকে রেল নেটওয়ার্কে যুক্ত করার মহাপরিকল্পনা: নেত্রকোনায় রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিব

দলটির স্থানীয় মেম্বার ও কাউন্সিলর পদপ্রার্থীসহ অনেক প্রভাবশালী মধ্যম সারির নেতাই ভেতরে-ভেতরে সাধারণ ভোটারদের সাথে নিবিড় ও ব্যক্তিগত যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন। প্রকাশ্যে দলীয় ব্যানার বা স্লোগান ব্যবহার না করে, সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র বা অরাজনৈতিক মোড়কে তারা নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের সচল রাখছেন। নীরবে, অত্যন্ত কৌশলী উপায়ে সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্কের সূত্র ধরে তারা ভোটের মাঠে নিজেদের ভোটব্যাংক ধরে রাখার চেষ্টা করছেন এবং ভোটের দিন ব্যালট বক্সে এক বড় ধরণের নীরব চমক দেখানোর গোপন প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের এই আন্ডারগ্রাউন্ড বা ছায়া রাজনীতি অন্য দলগুলোর জন্য এক বড় ধরণের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিন দশকের একমুখী বলয় ভাঙার প্রত্যয় ও তরুণ ভোটারদের সচেতনতা

গৌরনদীর মাঠপর্যায়ের সাধারণ ভোটার, প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং প্রথমবারের মতো ভোট দিতে যাওয়া তরুণদের সাথে দীর্ঘ আলাপচারিতায় জানা গেছে, গত ৩০ বছরে গৌরনদীর স্থানীয় নির্বাচন মূলত একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয় এবং পেশিশক্তির আধিপত্যে বন্দি ছিল। সাধারণ মানুষ অনেক সময়ই তাদের স্বাধীন ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। কিন্তু ২০২৬ সালের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও পরিবেশ সম্পূর্ণ আলাদা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা জানান, বিগত তিন দশকে যে ধরনের একমুখী, প্রভাবাধীন বা একতরফা নির্বাচন দেখেছে গৌরনদীবাসী, এবার পরিস্থিতি তার সম্পূর্ণ বিপরীত। ভোটারদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা এখন তুঙ্গে। কোনো ধরণের দলীয় নেতিবাচক প্রভাব, আর্থিক প্রলোভন বা পেশিশক্তির কাছে মাথা নত না করে প্রার্থীরা যেভাবে সাধারণ ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে হাত জোড় করে ভোট চাচ্ছেন, তা গত ৩০ বছরে গৌরনদীর মাটিতে দেখা যায়নি। এই গণতান্ত্রিক পরিবেশ সাধারণ ভোটারদের মাঝে এক বিশাল স্বস্তি এনে দিয়েছে।

পর্দার আড়ালের বড় ফ্যাক্টর: প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের ডিজিটাল ভোটব্যাংক

এবারের গৌরনদী উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচনের আরেকটি সবচেয়ে বড় ও আধুনিক ফ্যাক্টর বা নিয়ন্ত্রক শক্তি হয়ে উঠেছেন প্রবাসী ভোটাররা। গৌরনদী অঞ্চলের একটি বিশাল জনসংখ্যা বর্তমানে প্রবাসী, যারা মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, মালয়েশিয়া এবং আমেরিকায় কর্মরত রয়েছেন। এই প্রবাসীরা সশরীরে দেশের মাটিতে এসে ভোট দিতে না পারলেও, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে তারা ২৪ ঘণ্টা সার্বক্ষণিক নজর রাখছেন নিজেদের নিজ নিজ এলাকার নির্বাচনী খবরাখবরের ওপর।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুক, ইমো এবং হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে এই রেমিট্যান্স যোদ্ধারা সরাসরি দেশের মাটিতে থাকা তাদের নিজেদের পরিবারের বিশাল ভোটব্যাংক ও আত্মীয়-স্বজনদের সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করছেন। কোন প্রার্থীর অতীত রেকর্ড ভালো, কে এলাকার উন্নয়নে সত্যিকারের ভূমিকা রাখতে পারবে এবং কার বাক্সে ভোট পড়বে—তা নির্ধারণে পর্দার আড়াল থেকে এক বিশাল ও অলিখিত ভূমিকা রাখছেন এই প্রবাসীরা। সম্ভাব্য প্রার্থীরাও তাই স্থানীয় ভোটারদের পাশাপাশি প্রবাসীদের মন জয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করছেন।

উপসংহার

সব মিলিয়ে, দীর্ঘ তিন যুগের চেনা ছক ও আধিপত্যবাদের বৃত্ত ভেঙে গৌরনদী উপজেলা ও পৌরসভায় এবার এক ঐতিহাসিক, উৎসবমুখর এবং অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের অপেক্ষা করছেন সাধারণ ভোটাররা। ব্যালট বাক্সে শেষ পর্যন্ত কার জয় হবে, তা সময়ই বলে দেবে; তবে গৌরনদীর মানুষ যে দীর্ঘ দিন পর একটি সুস্থ নির্বাচনী পরিবেশ ফিরে পেয়েছেন, এটাই এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় সত্য।

নিউজ সূত্র: বরিশাল জেলা ও গৌরনদী স্থানীয় মাঠপর্যায়ের বিশেষ প্রতিবেদন।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন