ব্রেকিং নিউজ

সব জেলাকে রেল নেটওয়ার্কে যুক্ত করার মহাপরিকল্পনা: নেত্রকোনায় রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিব

সব জেলাকে রেল নেটওয়ার্কে যুক্ত করার মহাপরিকল্পনা: নেত্রকোনায় রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিব
ছবি: সংগৃহীত

রাজনীতি ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

নেত্রকোনা: একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো তার উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। আর এই যোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্যে রেলপথকে বিবেচনা করা হয় সবচেয়ে সাশ্রয়ী, নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব মাধ্যম হিসেবে। বর্তমান সরকার বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তের সাধারণ মানুষের কাছে এই রেলসেবা পৌঁছে দিতে এক যুগান্তকারী মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সরকারের মূল লক্ষ্য হলো দেশের ৬৪টি জেলাকেই একটি সমন্বিত এবং আধুনিক রেলওয়ে নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসা। সম্প্রতি নেত্রকোনা জেলায় এক রাষ্ট্রীয় সফরকালে সরকারের এই দীর্ঘমেয়াদি দূরদর্শী পরিকল্পনার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব। তিনি জানান, দেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর যাতায়াত ব্যবস্থা সহজতর করতে সরকার পর্যায়ক্রমে সব জেলাতেই রেললাইন সম্প্রসারণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন: মানবিকতায় অনন্য রোনালদো: ভেনিজুয়েলায় পা হারানো শিশুর স্বপ্ন পূরণ করলেন সিআরসেভেন

নেত্রকোনা সফর ও বহুমাত্রিক উন্নয়ন কর্মসূচি

গত শুক্রবার (৩ জুলাই) রাতে নেত্রকোনা রেলওয়ে স্টেশন পরিদর্শনের সময় স্থানীয় সংবাদকর্মীদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব সরকারের এই উন্নয়ন রূপরেখা তুলে ধরেন। প্রতিমন্ত্রী তার দিনব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে নেত্রকোনার বিভিন্ন এলাকার রেল অবকাঠামো এবং স্থানীয় সরকারের নানা উন্নয়নমূলক কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। নেত্রকোনা স্টেশনে আসার আগে তিনি জেলার মোহনগঞ্জ ও বারহাট্টা রেলওয়ে স্টেশনও অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পরিদর্শন করেন এবং যাত্রীসেবার মান ও স্টেশনের সার্বিক ব্যবস্থাপনা খতিয়ে দেখেন।

কেবল রেল খাতের উন্নয়নই নয়, প্রতিমন্ত্রীর এই সফরটি ছিল বহুমাত্রিক। দিনব্যাপী নেত্রকোনা সফরের অংশ হিসেবে তিনি জেলার মদন উপজেলার ঐতিহ্যবাহী উচিতপুর ট্রলারঘাটে আয়োজিত এক বিশাল ও জনাকীর্ণ পথসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেন। গ্রামীণ অর্থনীতি ও মৎস্য সম্পদ রক্ষায় সরকারের সদিচ্ছার প্রতীক হিসেবে তিনি সেখানে স্থানীয় জলাশয়ে মাছের পোনা অবমুক্তকরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। এর পরপরই তিনি খালিয়াজুড়ি উপজেলার রোয়াইল-নাওটানা সংযোগস্থল এবং বাজোয়াইল কীর্তনখোলা ফিশারিতে যান। সফরের শেষভাগে তিনি মোহনগঞ্জ উপজেলার বরান্তর চিরাডুবি হাওরে গিয়েও বিশাল পরিসরে মাছের পোনা অবমুক্তকরণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন।

এই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরে প্রতিমন্ত্রীর সাথে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল উপস্থিত ছিল। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এবং সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও নেত্রকোনা-৪ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য লুৎফুজ্জামান বাবর। সরকারের একাধিক মন্ত্রণালয়ের এই যৌথ সফর প্রমাণ করে যে, বর্তমান প্রশাসন গ্রামীণ অবকাঠামো ও যোগাযোগের পাশাপাশি কৃষি এবং মৎস্য খাতের উন্নয়নে সুষম সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছে।

রেল খাতের আধুনিকায়ন ও চলমান বৈশ্বিক সমীকরণ

সংবাদকর্মীদের সাথে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সারা দেশে একটি আধুনিক, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে রেল খাতের আধুনিকায়নে নজিরবিহীন বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দেশের সড়ক ও মহাসড়কের ওপর থেকে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ কমাতে এবং রেলপথে যানজটমুক্ত যাতায়াত নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন কৌশলগত পয়েন্টে ওভারপাস এবং আন্ডারপাস নির্মাণ করা হচ্ছে। এর ফলে রেল ক্রসিংগুলোতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি যেমন কমছে, তেমনি ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়ও অনেকাংশে দূর করা সম্ভব হচ্ছে।

একই সাথে ডিজিটাল বাংলাদেশ ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের অংশ হিসেবে চলমান দূরপাল্লার ট্রেনগুলোতে উচ্চগতির ইন্টারনেট সুবিধা (Wi-Fi) সম্প্রসারণের কাজ শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে যাত্রীরা ভ্রমণের পাশাপাশি তাদের জরুরি দাপ্তরিক ও ব্যক্তিগত কাজ অনায়াসেই সম্পন্ন করতে পারছেন। এছাড়া দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের সাথে প্রশাসনিক রাজধানী ঢাকার যোগাযোগ আরও দ্রুতগতির করতে ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম কর্ড লাইন’ নির্মাণের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই কর্ড লাইনটি চালু হলে দুই মেগাসিটির মধ্যকার ভৌগোলিক দূরত্ব এবং ভ্রমণের সময় নাটকীয়ভাবে কমে আসবে, যা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে এক নতুন গতির সঞ্চার করবে।

লোকোমোটিভ সংকট ও আন্তর্জাতিক টেন্ডারের বাস্তবতা

যোগাযোগ ব্যবস্থার এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মাঝেও কিছু বাস্তবসম্মত চ্যালেঞ্জের কথা অকপটে স্বীকার করেছেন রেলপথ প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, বর্তমানে দেশের ৬৪টি প্রশাসনিক জেলার মধ্যে ৪৯টি জেলা ইতিমধ্যে রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত রয়েছে। বাকি ১৫টি জেলাকে এই নেটওয়ার্কে যুক্ত করার কাজ প্রক্রিয়াধীন। তবে অতীতের কিছু ভুল পরিকল্পনা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সব কাজ একসাথে দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।

প্রতিমন্ত্রী আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, অতীতে বিভিন্ন সময়ে নতুন নতুন রেললাইন নির্মাণ করা হলেও, সেই লাইনে ট্রেন চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) এবং যাত্রীবাহী কোচ (বগি) পর্যাপ্ত পরিমাণে সংগ্রহ করা হয়নি। ফলে বিশেষ করে দেশের মিটারগেজ রুটে বর্তমানে তীব্র ইঞ্জিন ও বগির সংকট তৈরি হয়েছে। এই সংকট রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়, কারণ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আধুনিক লোকোমোটিভ ও উন্নতমানের কোচ আমদানি করা একটি দীর্ঘমেয়াদি আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। আন্তর্জাতিক টেন্ডার বা দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে এই সমস্ত ভারী যন্ত্রপাতি অর্ডার দিয়ে দেশে এনে রেল ট্র্যাকে যুক্ত করতে সাধারণত দুই থেকে তিন বছর সময় লেগে যায়।

তবে সরকার এই অন্তর্বর্তীকালীন সংকট মোকাবিলায় হাত গুটিয়ে বসে নেই। প্রতিমন্ত্রী আশ্বাস দেন যে, নতুন লোকোমোটিভ আমদানির পাশাপাশি রেলওয়ের নিজস্ব ওয়ার্কশপগুলোতে অকেজো ও পুরাতন ইঞ্জিনগুলো দ্রুত মেরামত করে সচল করার জোর প্রচেষ্টা চলছে, যাতে যাত্রীদের ভোগান্তি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা যায়।

নেত্রকোনাবাসীর দাবি ও স্থানীয় রেলওয়ের উন্নয়ন

নেত্রকোনাকেন্দ্রিক বিভিন্ন আঞ্চলিক দাবির বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব অত্যন্ত ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন। তিনি জানান, স্থানীয় জনগণের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নেত্রকোনা রেলস্টেশনের ওয়েটিং রুম বা যাত্রীদের অপেক্ষাগারটিকে আধুনিক ও আরামদায়ক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্টেশনের স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে আধুনিক টয়লেট কমপ্লেক্স নির্মাণের টেন্ডার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং খুব দ্রুতই এর নির্মাণকাজ শুরু হবে। এছাড়া এই রুটে চলাচলকারী বিভিন্ন আন্তঃনগর ট্রেনে অতিরিক্ত কোচ বা বগি সংযোজন করার বিষয়টিও সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে, যাতে উৎসব বা ছুটির দিনগুলোতে অতিরিক্ত যাত্রীচাপ সামাল দেওয়া যায়।

আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে পরীক্ষা চলাকালে প্রধান শিক্ষকের নজিরবিহীন মাতলামি: সাংবাদিকদের বিকৃত প্রস্তাব, ফুঁসে উঠেছে এলাকাবাসী

নেত্রকোনার সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত নতুন রেললাইন স্থাপন প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও দায়িত্বশীল বক্তব্য দেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তবে স্থানীয় জনগণের দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে রেলওয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে তিনি নিজেই সরেজমিন এলাকাটি পরিদর্শন করেছেন। বর্তমানে এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই বা 'ফিজিবিলিটি স্টাডি' (Feasibility Study) চলছে। মাঠপর্যায়ের এই সমীক্ষা শেষে যদি প্রকল্পটি জনস্বার্থ, যাত্রীসেবা এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে কার্যকর ও লাভজনক প্রমাণিত হয়, তবে সরকার অবশ্যই এটি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

রাষ্ট্রীয় তহবিলের সুরক্ষা ও টেকসই উন্নয়ন নীতি

বক্তব্যের শেষাংশে প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব সরকারের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বিষয়টি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “বর্তমান সরকার জনগণের করের টাকার সর্বোচ্চ সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য এমন কোনো অলাভজনক বা অপরিকল্পিত প্রকল্প তাড়াহুড়ো করে হাতে নিতে চাই না, যা ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ঘটাবে। যেকোনো নতুন রেললাইন বা অবকাঠামো নির্মাণের আগে আমরা কঠোরভাবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষা যাচাই করব।”

সরকারের মূল লক্ষ্য কেবল রেললাইনের সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং সারা দেশে রেলসেবার গুণগত মানোন্নয়ন করা এবং সাধারণ মানুষের জন্য যাত্রীসেবাকে আরও সহজ, আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলা। সক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে সাথে দেশের প্রতিটি জেলার মানুষ এই উন্নত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারবেন বলে প্রতিমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

নিউজ সূত্র: নেত্রকোনা জেলা প্রতিনিধি ও মাঠ পর্যায়ের বিশেষ সংবাদ।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন