আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দাফন হয়ে গেছে, আর ফেরার সুযোগ নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দাফন হয়ে গেছে, আর ফেরার সুযোগ নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন
ছবি: সংগৃহীত

রাজনীতি ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

ঢাকা: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। এই গণ-আন্দোলনের পর দেশের শাসনব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক মেরুকরণে যে আমূল পরিবর্তন এসেছে, তার ধারাবাহিকতায় এবার এক চূড়ান্ত ও কঠোর বার্তা দিলেন বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও দৃঢ় ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, দেশের মাটিতে ফ্যাসিবাদের পৃষ্ঠপোষক এবং গণহত্যাকারী দল হিসেবে বর্তমান কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার সমস্ত অধিকার চিরতরে হারিয়ে গেছে। রাজনৈতিকভাবে দলটির চূড়ান্ত পতন ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে উল্লেখ করে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে তারা আর কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। শনিবার (৪ জুলাই) দুপুরে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র আগারগাঁওয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত চলমান 'জুলাই জাতীয় সম্মেলন'-এ প্রধান অতিথির বক্তব্য প্রদানকালে তিনি এই বিস্ফোরক ও তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন।

আরও পড়ুন: সব জেলাকে রেল নেটওয়ার্কে যুক্ত করার মহাপরিকল্পনা: নেত্রকোনায় রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিব

ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লবের পর্দার অন্তরালের অজানা অধ্যায়

সম্মেলনে উপস্থিত নেতাকর্মী এবং জুলাই আন্দোলনের বীর শহীদদের স্মরণ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ চব্বিশের সেই রক্তঝরা দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেন। বক্তব্য প্রদানকালে তিনি আন্দোলনের এক অজানা ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক অধ্যায় জনগণের সামনে উন্মোচন করেন, যা এর আগে কখনো প্রকাশ্যে আসেনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “জুলাই আন্দোলনের সেই কঠিন ও অগ্নিগর্ভ সময়ে, যখন চারদিকে স্বৈরাচারের বুলেট আর সাধারণ মানুষের হাহাকার ছিল, তখন পর্দার আড়ালে এক বিশাল কৌশলগত যুদ্ধ পরিচালনা করতে হয়েছে। সেই দিনগুলোতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে আমার প্রতিনিয়ত গভীর আলাপ-আলোচনা চলত। স্বৈরাচারী সরকারের পতন নিশ্চিত করতে আমরা একের পর এক নির্ঘুম রাত কাটিয়েছি।”

তিনি আরও প্রকাশ করেন যে, আন্দোলনকে একটি সফল ও যৌক্তিক পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য অত্যন্ত সুনিপুণ পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ছাত্র-জনতার এই স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ব্যানারে না এনে, সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ও নাগরিক আন্দোলনের পরিচয়ে শেষ পর্যন্ত বজায় রাখা হয়েছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, এটিই ছিল স্বৈরাচারী শক্তির পতন ঘটানোর মূল চাবিকাঠি, কারণ আন্দোলনকে রাজনৈতিক রঙ দেওয়া হলে তৎকালীন ফ্যাসিবাদী শাসকগোষ্ঠী এটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার সুযোগ পেত। এই কৌশলগত সিদ্ধান্তের কারণেই অরাজনৈতিক পরিচয়ে জুলাই আন্দোলনের এক ঐতিহাসিক ও গৌরবময় পরিসমাপ্তি ঘটানো সম্ভব হয়েছিল, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য নজির।

জাতীয় ঐক্য এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের আহ্বান

দেশের বর্তমান নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং রাষ্ট্র সংস্কারের প্রক্রিয়া সম্পর্কে আলোকপাত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের সব স্তরের নাগরিক ও রাজনৈতিক শক্তিকে ইস্পাতকঠিন ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “ফ্যাসিবাদী শাসনের কবল থেকে মুক্ত হওয়া আগামীর নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, বিগত দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনে দেশের প্রতিটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং অর্থনৈতিক কাঠামোকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক খাত থেকে শুরু করে দেশের রিজার্ভ—সবকিছু লুটে নেওয়া হয়েছে।”

এই ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে আবার নতুন করে টেনে তুলতে এবং একটি স্বাবলম্বী অর্থনীতি গড়ে তুলতে দেশবাসীকে ধৈর্য ধারণ করার অনুরোধ জানান তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশ্বস্ত করে বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সুনির্দিষ্ট ও দূরদর্শী পরিকল্পনা অনুযায়ী ধাপে ধাপে কাজ করে যাচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা রাতারাতি সম্ভব নয়। তাই কোনো ধরনের উসকানি বা আবেগের বশবর্তী না হয়ে সবাইকে সরকারের সংস্কার পরিকল্পনার ওপর আস্থা রাখতে হবে এবং ধৈর্য ধরে সহযোগিতা করতে হবে।

বিদেশে বসে ষড়যন্ত্র ও সন্ত্রাসী দল হিসেবে বিচারের প্রস্তুতি

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ তার বক্তব্যে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাকর্মীদের বর্তমান কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, “যারা দেশের মাটিতে গণহত্যা চালিয়ে, হাজারো মায়ের বুক খালি করে কাপুরুষের মতো বিদেশে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে, তারা এখনো শান্ত হয়নি। বিদেশে বসে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ খাটিয়ে তারা দেশের ভেতরের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও বর্তমান জনবান্ধব সরকারের বিরুদ্ধে নানামুখী অপপ্রচার ও গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। তবে বিদেশের মাটিতে বসে ষড়যন্ত্র করে বাংলাদেশের এই দ্বিতীয় স্বাধীনতাকে নস্যাৎ করা যাবে না।”

আরও পড়ুন: গৃহিণী থেকে সাফল্যের চূড়ায় রায়পুরের রোকসানা: গ্রামীণ নারী জাগরণে এক অনন্য দৃষ্টান্ত

তিনি দেশের জনগণকে আশ্বস্ত করে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিগত সরকারের আমলে সংঘটিত নজিরবিহীন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, সাধারণ ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি বর্ষণ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য আওয়ামী লীগকে খুব শীঘ্রই আইনের আওতায় আনা হবে। একটি সন্ত্রাসী ও ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদেরকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্য সরকার সমস্ত তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করছে। অতি দ্রুতই স্বাধীন ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এই বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং দল হিসেবে তাদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।

'চেতনা ব্যবসা' ও আদর্শিক বিচ্যুতির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি

বক্তব্যের শেষ অংশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জুলাই বিপ্লবের মূল চেতনাকে ধরে রাখার ওপর বিশেষ জোর দেন এবং এই চেতনাকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরণের স্বার্থান্বেষী মহলের তৎপরতার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে বলেন, “আমরা জুলাই আন্দোলনের এই পবিত্র চেতনা নিয়ে কাউকে কোনো ধরনের ব্যবসা করতে দেব না। শহীদদের রক্ত এবং পঙ্গুত্ববরণকারী ভাইদের ত্যাগ কোনো রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত ফায়দা হাসিলের হাতিয়ার হতে পারে না। ইতিহাস সাক্ষী, চেতনা বিক্রি করে বা চেতনার ব্যবসা করে কোনো শাসক বা গোষ্ঠী টিকতে পারেনি।”

তিনি অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, যারা জুলাই আন্দোলনের মহান ত্যাগকে নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থে বা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার চেষ্টা করবে, দেশের সচেতন মানুষ তাদের কখনোই ক্ষমা করবে না। চব্বিশের এই চেতনাকে যারা নিজেদের পকেট ভারী করার মাধ্যম বানাবে, তাদের পরিণতিও অত্যন্ত ভয়াবহ হবে এবং বাংলার মানুষ তাদের উপযুক্ত জবাব দেবে। সরকার এই পবিত্র চেতনাকে ধরে রেখে একটি বৈষম্যহীন ও স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশ গঠনে বদ্ধপরিকর।

নিউজ সূত্র: জুলাই জাতীয় সম্মেলনের সরাসরি প্রেস বিজ্ঞপ্তি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন