ব্রেকিং নিউজ

শাহজাদপুরে পরীক্ষা চলাকালে প্রধান শিক্ষকের নজিরবিহীন মাতলামি: সাংবাদিকদের বিকৃত প্রস্তাব, ফুঁসে উঠেছে এলাকাবাসী

শাহজাদপুরে পরীক্ষা চলাকালে প্রধান শিক্ষকের নজিরবিহীন মাতলামি: সাংবাদিকদের বিকৃত প্রস্তাব, ফুঁসে উঠেছে এলাকাবাসী
ছবি: সংগৃহীত
 সিরাজগঞ্জ ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো মানব গড়ার কারিগর তৈরীর পবিত্র স্থান। যেখানে অভিভাবকেরা তাদের সন্তানদের পাঠান সুশিক্ষা ও নৈতিকতা অর্জনের আশায়। কিন্তু সেই পবিত্র প্রাঙ্গণেই যদি প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ অভিভাবক তথা প্রধান শিক্ষক নিজেই নৈতিকতার চরম অবক্ষয় ঘটিয়ে বসেন, তবে তা সমাজকে স্তম্ভিত করে দেয়। ঠিক এমনই এক ন্যাক্কারজনক ও লজ্জাজনক ঘটনা ঘটেছে সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলায়। উপজেলার ঐতিহ্যবাহী নুকালি বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে স্বয়ং প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে মদ্যপান করে চরম মাতলামি ও তাণ্ডব চালানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

গত ২ জুলাই ২০২৬, বৃহস্পতিবার বিদ্যালয় চলাকালীন সময়ে এই ঘটনাটি ঘটে। অভিযুক্ত শিক্ষকের নাম রুহুল আমিন, যিনি দীর্ঘ দিন ধরে এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তার এই চরম অনৈতিক ও আপত্তিকর আচরণে কেবল বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাই নয়, বরং পুরো সিরাজগঞ্জ জেলা জুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শী এবং স্থানীয় সূত্রে এই ঘটনার যে বিবরণ পাওয়া গেছে, তা যেকোনো সচেতন নাগরিককে লজ্জিত করবে।

পরীক্ষার হলে আতঙ্ক: মদ্যপ প্রধান শিক্ষকের তাণ্ডব

ঘটনার দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার অন্যান্য দিনের মতোই বিদ্যালয়ে স্বাভাবিক পাঠদান ও পূর্বনির্ধারিত পরীক্ষা চলছিল। শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত মনোযোগের সাথে পরীক্ষার খাতায় লিখছিল। পুরো বিদ্যালয় জুড়ে যখন পিনপতন নীরবতা এবং গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশ, ঠিক তখনই এক অভাবনীয় ও ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রুহুল আমিন প্রচণ্ডভাবে মদ্যপান করে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে টলতে টলতে নিজের কার্যালয়ে প্রবেশ করেন।

আরও পড়ুন: খামেনির জানাজার ঐতিহাসিক আনুষ্ঠানিকতা শুরু: তেহরানে ২ কোটি মানুষের সমাগমের রেকর্ড সম্ভাবনা

অফিস কক্ষে ঢোকার পর থেকেই তার আচরণে চরম অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়। তিনি নিজের চেয়ারে বসে উচ্চস্বরে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করেন এবং অসংলগ্ন কথাবার্তা বলতে থাকেন। মদ্যপানের তীব্রতায় তিনি এতটাই বেসামাল ছিলেন যে, তার গলার আওয়াজ পুরো বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে পড়ে। পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে প্রধান শিক্ষকের এমন উগ্র ও বিকৃত আচরণে পরীক্ষার হলে থাকা কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই ভয়ে পরীক্ষা দেওয়া বন্ধ করে দেয় এবং পুরো বিদ্যালয়ে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অন্য শিক্ষকেরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলেও প্রধান শিক্ষকের রুদ্রমূর্তি ও উগ্রতার সামনে তারা অসহায় হয়ে পড়েন।

সাংবাদিকদের ভিডিও ধারণ ও দেড় লাখ টাকার বিকৃত প্রস্তাব

প্রধান শিক্ষকের এমন অস্বাভাবিক ও লজ্জাজনক কাণ্ড দেখে বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা স্থানীয় লোকজন ও অভিভাবকেরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মাধ্যমে খবর পেয়ে দ্রুত একদল গণমাধ্যমকর্মী ও সাংবাদিক ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। পেশাগত দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে সাংবাদিকরা প্রধান শিক্ষকের এই মদ্যপ অবস্থার ও মাতলামির দৃশ্য নিজেদের ক্যামেরায় ধারণ করতে শুরু করেন।

ভিডিও ধারণ করতে দেখেই প্রধান শিক্ষক রুহুল আমিন আরও বেশি ক্ষিপ্ত ও বেসামাল হয়ে ওঠেন। তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনেই নিজেকে অত্যন্ত কুৎসিত ও অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন। শুধু তাই নয়, ক্যামেরা ও উপস্থিত সবার সামনে দম্ভোক্তি প্রকাশ করে তিনি বলেন, তিনি আজীবন মদ্যপান করবেন এবং তাকে কেউ থামাতে পারবে না।

এর চেয়েও বড় লজ্জার বিষয় ঘটে এর ঠিক পরপরই। সাংবাদিকদের ভিডিও বন্ধ করার জন্য এবং বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি এক বিকৃত ও অনৈতিক প্রস্তাব ছুঁড়ে দেন। তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে বলেন, তিনি নগদ ১ লক্ষ ৫০ হাজার (দেড় লাখ) টাকা খরচ করতে রাজি আছেন, যদি সাংবাদিকরা তার সাথে সেই মুহূর্তে দেশের অন্যতম বৃহৎ নিষিদ্ধ পল্লী রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া পতিতালয়ে যেতে রাজি হন। একটি মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের মুখ থেকে প্রকাশ্য দিবালোকে এমন বিকৃত, কুরুচিপূর্ণ এবং অনৈতিক প্রস্তাব শুনে উপস্থিত সংবাদকর্মী এবং স্থানীয় সাধারণ মানুষ স্তম্ভিত হয়ে যান। তার এই বক্তব্য সামাজিক ও নৈতিক স্খলনের কোন পর্যায়ে পৌঁছালে সম্ভব, তা ভেবে অনেকেই শিউরে উঠছেন।

স্বজনদের হস্তক্ষেপে উদ্ধার এবং পলায়ন

বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে যখন এই চরম উত্তেজনা ও লজ্জাজনক নাটক চলছিল, তখন বিষয়টি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। প্রধান শিক্ষকের এই চরম মাতাল অবস্থার খবর কোনোভাবে তার বাড়িতে পৌঁছালে, তার পরিবারের সদস্যরা ও স্বজনেরা দ্রুত বিদ্যালয়ে ছুটে আসেন। তারা এসে প্রধান শিক্ষক রুহুল আমিনকে অত্যন্ত টালমাটাল ও অসংলগ্ন অবস্থায় উদ্ধার করেন। সাংবাদিকদের ক্যামেরা এবং স্থানীয়দের গণধোলাই থেকে বাঁচাতে স্বজনেরা তাকে ধরাধরি করে দ্রুত বিদ্যালয় থেকে বের করে নিয়ে যান এবং নিজেদের বাড়িতে নিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখেন। স্বজনেরা তাকে নিয়ে যাওয়ার সময়ও তিনি অনবরত প্রলাপ বকছিলেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন: পাবিপ্রবি শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার: ডিগ্রিবটলার মেসে শোকের ছায়া

প্রভাবের জোরে দীর্ঘদিনের স্বেচ্ছাচারিতা

অনুসন্ধানে জানা যায়, নুকালি বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রুহুল আমিনের বাড়ি বিদ্যালয়ের একদম কাছাকাছি এলাকায়। তাছাড়া এলাকায় তার পিতার দীর্ঘদিনের একটি সামাজিক সুনাম ও সুখ্যাতি রয়েছে। কিন্তু রুহুল আমিন তার পিতার সেই সুনামকে পুঁজি করে এবং নিজের স্থানীয় প্রভাব খাটানো শুরু করেন। দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকের পদে থাকার কারণে এবং স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় তিনি কাউকেই পরোয়া করতেন না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এই প্রধান শিক্ষক প্রায়শই বিদ্যালয়ে এসে নিজের অফিস কক্ষকে মদের আসরে পরিণত করতেন। তিনি প্রায়ই মদ্যপান করে বিদ্যালয়ে আসতেন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সাথে দুর্ব্যবহার করতেন। কিন্তু তার মারাত্মক প্রভাব এবং একরোখা স্বভাবের কারণে সাধারণ মানুষ কিংবা বিদ্যালয়ের অন্য কোনো শিক্ষক বা কর্মচারী মুখ খোলার সাহস পেতেন না। কেউ যদি প্রতিবাদ করার চেষ্টা করত, তবে তাকে নানাভাবে হয়রানি ও চাকরিচ্যুতির হুমকি দেওয়া হতো। ফলে এক প্রকার বাধ্য হয়েই এতদিন সবাই তার এই অত্যাচার ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড মুখ বুজে সহ্য করে আসছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবারের ঘটনাটি সমস্ত সীমার প্রাচীর ভেঙে ফেলেছে।

ফুঁসে উঠেছে এলাকাবাসী ও অভিভাবক মহল

পবিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বসে পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে প্রধান শিক্ষকের এমন ন্যক্কারজনক ও কলঙ্কজনক অধ্যায়ের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো শাহজাদপুর উপজেলা জুড়ে তীব্র নিন্দার ঝড় বইছে। ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী, অভিভাবক এবং সচেতন নাগরিক সমাজ এখন রাজপথে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

একজন অভিভাবক অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বলেন, “আমরা আমাদের সন্তানদের এই স্কুলে পাঠাই ভালো মানুষ হওয়ার জন্য। কিন্তু স্কুলের প্রধান শিক্ষকই যদি মদ্যপ, চরিত্রহীন এবং জুয়াড়ি প্রকৃতির হন, তবে আমাদের সন্তানেরা কী শিখবে? আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই এবং অনতিবিলম্বে এই লম্পট ও মদ্যপ শিক্ষকের অপসারণ দাবি করছি।”

বিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরাও এখন চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ট্রমার মধ্যে রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, প্রধান শিক্ষকের এই আচরণ তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেছে এবং তারা আর এই শিক্ষকের অধীনে ক্লাস বা পরীক্ষায় অংশ নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে না।

প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি

একটি স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য, সুনাম এবং শিক্ষার মান ধরে রাখতে অবিলম্বে এই অসুস্থ ও নৈতিকতাহীন প্রধান শিক্ষকের হাত থেকে মুক্তি চায় সর্বস্তরের জনগণ। সচেতন মহলের মতে, একজন শিক্ষকের এমন আচরণ পুরো শিক্ষক সমাজের মুখ চুনকালি মাখিয়ে দিয়েছে। এটি কেবল একটি সাধারণ অপরাধ নয়, এটি শিক্ষার মূলে কুঠারাঘাত।

এই বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী। তাদের দাবি, অতি দ্রুত একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে এই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় এবং আইনগত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো শিক্ষক শিক্ষাঙ্গনকে এভাবে কলুষিত করার সাহস না পায়।

সূত্র: স্থানীয় সাংবাদিক ও প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিবর্গ।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন