আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
ঢাকা: বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু মধ্যপ্রাচ্য। আর এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বৈরিতা সর্বজনবিদিত। তবে সম্প্রতি ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মহাপ্রয়াণ এবং তার শেষকৃত্যানুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ এক নজিরবিহীন রূপ পরিগ্রহ করেছে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে—ইরানের প্রয়াত নেতার জানাজা ও দাফন প্রক্রিয়ায় বিশ্বের অন্যান্য স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ যাতে অংশ না নেয়, সেজন্য ওয়াশিংটন পর্দার আড়াল থেকে এক বিশাল ও সুসংগঠিত কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করেছে। এমনকি শেষকৃত্যে উপস্থিত হলে মার্কিন আর্থিক ও সামরিক সহায়তা চিরতরে বন্ধ করে দেওয়ার মতো কঠোর অবস্থান ও প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েছে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত ও প্রভাবশালী সংবাদ সংস্থা 'তাসনিম'-এর একটি বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই গোপন ও বিস্ফোরক তথ্যটি প্রকাশ্যে আনা হয়েছে। একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য এবং শীর্ষস্থানীয় কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি দাবি করেছে যে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর তেহরানের রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানকে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে বা অবরুদ্ধ করার জন্য ওয়াশিংটন তার সমস্ত কূটনৈতিক শক্তি নিয়োজিত করেছিল।
পাঁচ দিনের সুপরিকল্পিত মার্কিন কূটনৈতিক মিশন
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রয়াণের পর গত পাঁচ দিন ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এবং হোয়াইট হাউসের শীর্ষ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা একযোগে একটি বিশ্বব্যাপী সমন্বিত প্রচারণা (Coordinated Diplomatic Campaign) পরিচালনা করেন। এই বিশেষ মিশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল—ইউরোপ, আফ্রিকা, এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোকে কোনোভাবেই তেহরানের মাটিতে পা না রাখতে বাধ্য করা। ওয়াশিংটন মনে করেছে, খামেনির শেষ বিদায়ে বৈশ্বিক নেতাদের উপস্থিতি বিশ্বমঞ্চে ইরানের রাজনৈতিক বৈধতা ও তাদের মতাদর্শিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে, যা মার্কিন স্বার্থের পরিপন্থী।
এই কূটনৈতিক তৎপরতা কেবল মৌখিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। মার্কিন কর্মকর্তারা অত্যন্ত পদ্ধতিগত উপায়ে বিভিন্ন দেশের সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করেন এবং তাদের তেহরান সফর থেকে বিরত থাকার জন্য স্পষ্ট বার্তা প্রদান করেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর গোপন নির্দেশনা ফাঁস
তাসনিম নিউজের প্রতিবেদনে সবচেয়ে বড় যে তথ্যটি উঠে এসেছে, তা হলো মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর একটি গোপন সার্কুলার বা কূটনৈতিক নির্দেশনা। বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, গত ২৬ জুন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস, কনস্যুলেট এবং বিশেষ কূটনৈতিক মিশনগুলোতে একটি অতি গোপনীয় কৌশলগত নির্দেশনা পাঠান।
সেই পত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, ওয়াশিংটন এই মুহূর্তে ইরানের সাথে কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক সহমর্মিতাকে বরদাশত করবে না। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার কূটনীতিকদের নির্দেশ দেন যেন তারা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারকে পরিষ্কার ভাষায় বুঝিয়ে দেন—আয়াতুল্লাহ খামেনির শেষকৃত্যে যেকোনো স্তরের সরকারি প্রতিনিধিত্ব বা অংশগ্রহণকে যুক্তরাষ্ট্র একটি 'অবন্ধুসুলভ পদক্ষেপ' (Unfriendly Action) হিসেবে গণ্য করবে। একই সাথে এই নির্দেশনায় সতর্ক করা হয় যে, কোনো দেশ যদি এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তেহরানের সাথে সংহতি প্রকাশ করে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সেই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর দীর্ঘমেয়াদি ও অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
আফ্রিকা ও আরব বিশ্বের ওপর চরম অর্থনৈতিক চাপ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই ব্ল্যাকমেইল বা মনস্তাত্ত্বিক চাপের শিকার হয়েছে মূলত অর্থনৈতিকভাবে উন্নয়নশীল ও মার্কিন সহায়তার ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মধ্যপ্রাচ্যের দুজন জ্যেষ্ঠ আরব কূটনীতিক নিশ্চিত করেছেন যে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও নিজে অন্তত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ আরব দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে টেলিফোনে এবং বিশেষ দূত মারফত যোগাযোগ করেছেন। তিনি ওই অঞ্চলের জটিল নিরাপত্তা সমীকরণের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাদের তেহরানের অনুষ্ঠান বর্জন করার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, আফ্রিকার মহাদেশে মার্কিন চাপ ছিল আরও বেশি প্রত্যক্ষ ও আক্রমণাত্মক। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতরা সরাসরি সংশ্লিষ্ট দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সতর্কবার্তা পাঠিয়েছেন। সেই সতর্কবার্তায় বলা হয়, আফ্রিকার কোনো দেশ যদি খামেনির জানাজা বা দাফন অনুষ্ঠানে কোনো প্রতিনিধি দল পাঠায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র সেই দেশে চলমান সমস্ত উন্নয়নমূলক তহবিল, মানবিক সহায়তা এবং অর্থনৈতিক অনুদান একতরফাভাবে কমিয়ে দেবে বা সম্পূর্ণ স্থগিত করবে। উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর জন্য এই ধরনের হুমকি ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল, কারণ তাদের জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশ মার্কিন ও পশ্চিমা সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
আরও পড়ুন: পরীক্ষার হলের বাইরে পিতা-মাতার নীরব প্রার্থনা: সন্তানের স্বপ্ন পূরণে এক পরম আকুতি
চাপের মুখে নতিস্বীকার: প্রতিনিধি দল প্রত্যাহারের পরিসংখ্যান
যুক্তরাষ্ট্রের এই তীব্র ও ত্রিমুখী চাপের প্রভাব আন্তর্জাতিক মহলে পড়তে খুব বেশি সময় লাগেনি। ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিশোধের আশঙ্কায় উত্তর আফ্রিকার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক দেশ শেষ মুহূর্তে তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। প্রাথমিক পরিকল্পনায় দেশটিতে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠানোর কথা থাকলেও, মার্কিন হুমকির মুখে তারা তাদের প্রতিনিধিত্বের স্তর (Level of Representation) একদম সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনে, যাতে ওয়াশিংটনকে অসন্তুষ্ট হতে না হয়।
ইরানি সংবাদ সংস্থার ভূ-রাজনৈতিক মূল্যায়ন এবং সংগৃহীত উপাত্ত অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই নজিরবিহীন আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে শেষ মুহূর্তে অন্তত ১৩টি দেশ তাদের তেহরান সফরের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বাতিল বা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এই ১৩টি দেশের ভৌগোলিক বিন্যাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়:
পূর্ব ইউরোপ: ৩টি দেশ (যারা মূলত মার্কিন ও ন্যাটোর নিরাপত্তার ওপর নির্ভরশীল)।
আফ্রিকা মহাদেশ: ৫টি দেশ (যাদের অর্থনীতি মার্কিন উন্নয়ন সহায়তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে)।
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল: ২টি প্রতিবেশী দেশ (যাদের মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তা মার্কিন সামরিক কাঠামোর সাথে যুক্ত)।
পূর্ব এশিয়া: ২টি রাষ্ট্র (যাদের ওয়াশিংটনের সাথে বড় ধরনের বাণিজ্যিক চুক্তি রয়েছে)।
অন্তরালে দুঃখ প্রকাশ ও ইরানের কড়া অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে পড়ে যেসকল রাষ্ট্র তেহরানের রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে অংশ নিতে পারেনি, তাদের অনেকেই পর্দার আড়ালে বিকল্প উপায়ে ইরানের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। কূটনৈতিক সুত্রগুলো বলছে, অংশ নিতে ব্যর্থ হওয়া বেশ কয়েকটি দেশ আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর মাধ্যমে অথবা সুইজারল্যান্ডের জেনেভা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থিত তাদের নিজস্ব স্থায়ী কূটনৈতিক মিশনের মাধ্যমে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে। তারা ইরানকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণেই তারা চরম ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও এই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারছে না।
তবে ইরান এই পুরো বিষয়টিকে অত্যন্ত মর্যাদার সাথে এবং কঠোরভাবে মোকাবিলা করেছে। কিছু দেশ যখন পরিস্থিতি সামাল দিতে তেহরানে আগে থেকেই নিযুক্ত তাদের স্থানীয় দূতাবাস কর্মকর্তাদের (Diplomats) এই অনুষ্ঠানে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানোর প্রস্তাব দেয়, তখন ইরান সরকারের পক্ষ থেকে তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়। তেহরানের নীতিনির্ধারকরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, যারা মার্কিন চাপের কাছে নতিস্বীকার করে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়েছে, তাদের কাছ থেকে এমন প্রতীকী উপস্থিতি ইরান আশা করে না।
উপসংহার ও ভবিষ্যৎ ভূ-রাজনীতি
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ বিদায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই 'জানাজা কূটনীতি' বা 'Funeral Diplomacy' প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের লড়াই এখন আর কেবল যুদ্ধক্ষেত্র বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আধিপত্য বিস্তারের এই লড়াই এখন মৃত্যুর পরবর্তী রাষ্ট্রীয় আচার-অনুষ্ঠানের ওপরও ভর করেছে। ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপের ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে মেরুকরণ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তবে এই তীব্র বাধা সত্ত্বেও বিশ্বের বহু দেশের শীর্ষস্থানীয় নেতারা তেহরানে উপস্থিত হয়ে প্রয়াত নেতার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন, যা মার্কিন একমেরু নীতির বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদেরও প্রতীক। আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং ওয়াশিংটন-তেহরান সম্পর্ক কোন দিকে মোড় নেয়, তা এই ঘটনার পর আরও বেশি পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়াল।
নিউজ সূত্র: বৈশ্বিক বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।