ঢাকা: একটি সন্তানের জীবনের প্রতিটি বড় পরীক্ষা যেন শুধু তার একার পরীক্ষা নয়, বরং তা হয়ে ওঠে তার পুরো পরিবারের, বিশেষ করে জন্মদাত্রী মায়ের এক পরম অগ্নিপরীক্ষা। সন্তান যখন পরীক্ষার হলের ভেতরে টেবিল-চেয়ারে বসে খাতার পাতায় নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য কলম চালায়, ঠিক তখন হলের বাইরে উত্তপ্ত ফুটপাতে কিংবা রাস্তার ধুলোবালির মধ্যে বসে থাকা মায়ের ব্যাকুল মনটিও যেন সন্তানের সাথেই হলের ভেতরেই অবস্থান করে। নিজের সন্তান যেন পরীক্ষার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত নিখুঁত ও সুন্দরভাবে খাতায় লিখতে পারে, সে যেন পুরোটা সময় শারীরিকভাবে সুস্থ থাকে এবং কোনো প্রকার মানসিক চাপে না পড়ে, ঠিক সেই পরম আকুতি নিয়ে বাসা থেকে নিজের প্রিয় তসবিহটি সাথে করে নিয়ে এসে কেন্দ্রের বাইরে বসে অনবরত পবিত্র দোয়া-দুরুদ ও মোনাজাত পড়ছেন মায়েরা। নিজের মন কোনোভাবেই বাসায় শান্তিতে থাকতে চায় না, তাই তীব্র গরম আর শত কষ্ট উপেক্ষা করে পরীক্ষা কেন্দ্রের সামনে বসে পরম করুণাময় আল্লাহর দরবারে অবিরাম ফরিয়াদ জানানোই এই মায়েদের একমাত্র সান্ত্বনা। সন্তান একদিন অনেক বড় ও সৎ মানুষ হয়ে দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে, মূলত এই একটি মাত্র আশাতেই জীবনের সব কষ্ট হাসিমুখে বরণ করে নিচ্ছেন হাজারো মা, এর চেয়ে বড় পাওনা তাদের জীবনে আর কিছুই হতে পারে না। আজ এক বুক আশা এবং মুখে এক চিলতে পবিত্র মুচকি হাসি নিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে নিজের ভেতরের এমন আবেগঘন অনুভূতি এভাবেই ব্যক্ত করছিলেন লাভলি বেগম নামের এক স্নেহময়ী মা।
আরও পড়ুন: হজের প্রাক-নিবন্ধন শুরু: জেনে নিন কোন কোন তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক করল মন্ত্রণালয়
চলমান উচ্চ মাধ্যমিক বা এইচএসসি পরীক্ষার নির্ধারিত সময় শুরু হওয়ার বেশ অনেক পূর্বেই রাজধানী ঢাকা মহানগরের অন্যতম প্রধান ও সুপরিচিত পরীক্ষা কেন্দ্র সিদ্ধেশ্বরী কলেজের মূল ফটকের সামনে শত শত অভিভাবক ও মা-বাবার উপচে পড়া ভিড় জমতে দেখা যায়। সময় গড়ানোর সাথে সাথে পরীক্ষার্থীরা যখন একে একে হলের ভেতরে প্রবেশ করে নিজেদের আসনে বসে খাতার পাতায় প্রশ্নের উত্তর লিখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, ঠিক তখনই কলেজের বাইরে প্রখর রোদের মধ্যে অপেক্ষার প্রতিটি প্রহর অত্যন্ত উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সাথে গুনতে শুরু করেন বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মা-বাবারা। এই আবেগঘন ও হৃদয়স্পর্শী দৃশ্যটি শুধু রাজধানী ঢাকার এই একটি মাত্র কেন্দ্রে নয়, বরং দেশজুড়ে চলমান এইচএসসি পরীক্ষার প্রায় প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্রের সামনেই অত্যন্ত নিয়মিতভাবে প্রতিদিন ফুটে উঠছে। নিজের সন্তানের স্বপ্ন পূরণ করা এবং তাদের জীবনের সাফল্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মায়েদের এই নীরব ও দীর্ঘ প্রার্থনা কেন্দ্রের সামনে দিয়ে যাতায়াত করা প্রতিটি সাধারণ মানুষের হৃদয়কে এক পরম গভীরতায় ছুঁয়ে যায়।
আরও পড়ুন: দামেস্কে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি: ক্যাফেতে শক্তিশালী বিস্ফোরণে নিহত ৪, আহত ১০
সিদ্ধেশ্বরী কলেজ কেন্দ্রের সামনে উপস্থিত হওয়া অসংখ্য অভিভাবকদের ভিড়ের মধ্যেই এক কোণে অত্যন্ত শান্ত ও নিরিবিলি পরিবেশে বসে থাকতে দেখা যায় বেশ কয়েকজন সাধারণ মধ্যবিত্ত মাকে। তাদের কারোর হাতের আঙুলে পরম যত্নে ঘুরছিল তসবিহ, আবার কারোর ঠোঁটের কোণে অত্যন্ত মৃদু স্বরে উচ্চারিত হচ্ছিল পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন সূরা ও বিশেষ বিশেষ দোয়া। বাইরে বসা এই মায়েদের চোখেমুখে যেমন রয়েছে তীব্র উৎকণ্ঠার ছাপ, ঠিক তেমনই তাদের বুকভরা আশা ও গভীর বিশ্বাস রয়েছে যে— তাদের কলিজার টুকরো সন্তানটি যেন অত্যন্ত সফলভাবে পরীক্ষা শেষ করে, একটি সুন্দর ও গৌরবোজ্জ্বল ফলাফল নিয়ে দিনশেষে হাসিমুখে ঘরে ফিরে আসতে পারে।
ঠিক এই একই পরীক্ষা কেন্দ্রের মূল গেইটের ঠিক বিপরীতে, রাস্তার এক পাশে নোংরা ও ময়লাযুক্ত জায়গার ওপরেই নিজের আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে বসে থাকতে দেখা যায় রাজধানীর বাসাবো এলাকা থেকে আসা আরেকজন অত্যন্ত সাধারণ ও মধ্যবিত্ত বাবা মো. সাবুলকে। তিনি নিজের প্রতিদিনের অতি প্রয়োজনীয় ও উপার্জনের কাজ সাময়িকভাবে ফেলে রেখে শুধুমাত্র ছেলের মানসিক আত্মবিশ্বাস ও সুরক্ষার কথা চিন্তা করে এই নোংরা পরিবেশের মধ্যেই অত্যন্ত ধৈর্য ধরে বসে আছেন। সন্তান পরীক্ষা শেষ করে হল থেকে বের হওয়া মাত্রই যেন তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে একটি পরম তৃপ্তির হাসিমুখে একসাথে বাসায় ফিরতে পারেন, এটাই একজন বাবার জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা। এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে বাবা মো. সাবুল অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন যে, তার প্রিয় ছেলে ভেতরের হলে জীবনের একটি বড় পরীক্ষা দিতে এসেছে, এই অবস্থায় নিজের মন কোনোভাবেই অন্য কোনো কাজে বা ঘরের ভেতরে মানতে চায় না। সশরীরে তিনি এখানে বাইরে বসে থাকলেও তার সমগ্র মন ও প্রাণ যেন হলের ভেতরে ছেলের কলমের ডগায় আটকে আছে। ছেলে পরীক্ষা শেষ করে হল থেকে অক্ষত ও হাসিমুখে বের হলেই তিনি তাকে সাথে নিয়ে পরম শান্তিতে আবার নিজেদের বাসায় ফিরে যাবেন।
বাঙালি সমাজব্যবস্থায় ঠিক এভাবেই প্রতিটি সন্তানের জীবনের ছোট-বড় সকল সফলতার পেছনে পর্দার আড়ালে কোনো ধরনের স্বার্থ ছাড়াই নিঃস্বার্থভাবে নিজেদের সমস্ত ভালোবাসা ও জীবন বিলিয়ে দিয়ে যান আমাদের পরম পূজনীয় বাবা-মায়েরা। পৃথিবীর প্রতিটি বাবা-মা তাদের নিজেদের জীবনের সব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চান, যাতে করে ভবিষ্যতে প্রবীণ বয়সে এই সন্তানরাই আবার তাদের বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে গভীর শ্রদ্ধা, পরম যত্ন ও ভালোবাসার মায়ায় আগলে রাখতে পারে।
নিউজের সূত্র: ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন এইচএসসি পরীক্ষা কেন্দ্র।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।