আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
তেহরান: মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি ও সমকালীন বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় এবং ঐতিহাসিক এক শোকাবহ অধ্যায়ের সূচনা ঘটেছে। সুদীর্ঘ ৩৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে ইরানের একক সর্বোচ্চ ক্ষমতাসীনের পদে অধিষ্ঠিত থাকা দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজার আনুষ্ঠানিকতা অত্যন্ত রাষ্ট্রীয় মর্যাদার সাথে শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ইতোমধ্যেই ইরানের রাজধানী তেহরানের সুবিশাল ও ঐতিহ্যবাহী ইমাম খোমেইনি গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদে তাঁর নিথর ও নিস্প্রাণ মরদেহ নিয়ে আসা হয়েছে। খামেনির এই মহাপ্রয়াণে কেবল ইরান নয়, সমগ্র মুসলিম বিশ্ব তথা বৈশ্বিক রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নজিরবিহীন শোকের আবহ ও তীব্র উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার সমীকরণকে এক সম্পূর্ণ নতুন মেরুকরণের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
আরও পড়ুন: ডিজিটাল সাফল্যের গোপন চাবিকাঠি: কখন পোস্ট করলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিউ ও রিচ বাড়ে
ইরানের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত টেলিভিশন চ্যানেল ‘আইআরআইবি’ (IRIB) এক বিশেষ জরুরি সংবাদ বুলেটিনে জানিয়েছে যে, প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির এই ঐতিহাসিক জানাজার নামাজে অংশ নিতে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ২ কোটিরও বেশি ধর্মপ্রাণ ও শোকার্ত মানুষের রাজধানী তেহরানে সমাগম ঘটতে পারে। কাতারভিত্তিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার বিশেষ প্রতিবেদনেও এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে বলা হয়েছে যে, এই বিশাল গণজমায়েতে শুধুমাত্র রাজধানী তেহরানেরই প্রায় ১ কোটির বেশি স্থানীয় বাসিন্দারা সরাসরি অংশগ্রহণ করবেন। এর পাশাপাশি ইরানের অন্যান্য প্রদেশ এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আরও বিপুল সংখ্যক মানুষের অভূতপূর্ব সমাগম ঘটবে। বিশ্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই পূর্বাভাস সত্যি হয়, তবে এটি হবে আধুনিক মানব ইতিহাসের অন্যতম সর্ববৃহৎ এবং ইরানের বুকে এখন পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সবচেয়ে বড় জানাজার অনুষ্ঠান।
ইরানের রাজধানী তেহরানের পাশাপাশি দেশটির ঐতিহ্যবাহী ও পবিত্র নগরী হিসেবে পরিচিত ‘কুম’ এবং ‘মাশহাদ’ শহরেও একযোগে সমান্তরালভাবে বিশেষ জানাজা ও শোকানুষ্ঠানের ব্যাপক আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছে।
এই সমস্ত পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থানগুলোতেও খামেনির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এবং তাঁর মাগফেরাত কামনায় লাখ লাখ মানুষের স্মরণকালের বৃহত্তম জনসমাগমের আশা করছে দেশটির প্রশাসন।
ইরানের জাতীয় ও ধর্মীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী, এই সমগ্র রাষ্ট্রীয় শোক ও জানাজার দীর্ঘ আনুষ্ঠানিকতা তাঁর নিজ জন্মশহর মাশহাদে অবস্থিত ইসলামের অন্যতম পবিত্র স্থান ‘ইমাম রেজা মাজারে’ চূড়ান্ত দাফনের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হবে।
এর আগে তেহরানের ইমাম খোমেইনি গ্র্যান্ড মোসাল্লা প্রাঙ্গণে খামেনির মরদেহের পাশাপাশি তাঁর পরিবারের অন্যান্য নিহত সদস্যদের সম্মানে মোট ৫টি বিশেষ কফিন সর্বসাধারণের দেখার জন্য উন্মুক্ত ও প্রদর্শন করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় প্রদর্শিত ৫ কফিন: খামেনি ও তার পরিবারের মরদেহ নিয়ে তোলপাড়
ইরানের ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী শাসক হিসেবে টানা ৩৬ বছর সফলভাবে দায়িত্ব পালন করা আলী খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকস্মিক ও পৈশাচিক হামলার প্রথম দিনেই নিহত হন।
ওই ভয়াবহ ও বর্বরোচিত বিমান হামলার পরপরই মূলত সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এক রক্তক্ষয়ী ও বিধ্বংসী যুদ্ধের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে, যা বর্তমানে আরও ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে।
উল্লেখ্য যে, ফেব্রুয়ারি মাসের সেই নির্দিষ্ট হামলায় শুধুমাত্র সর্বোচ্চ নেতাই নন, বরং ইরানের সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর বহু শীর্ষস্থানীয় ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাও একই সাথে নিহত হয়েছিলেন।
আগামী ৪ জুলাই থেকে রাজধানী তেহরানে অত্যন্ত পরিকল্পিত ও আনুষ্ঠানিকভাবে এই জানাজার মূল কর্মসূচি ও রাষ্ট্রীয় বিদায়ের প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে।
তেহরানের আনুষ্ঠানিকতা শেষে আগামী ৭ জুলাই ইরানের ধর্মীয় রাজধানী হিসেবে খ্যাত পবিত্র কুম নগরীতে এক বিশেষ ও ভাবগম্ভীর ধর্মীয় অনুষ্ঠান পরিচালনা করা হবে।
সমস্ত রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে আগামী ৯ জুলাই উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পবিত্র নগরী এবং আলী খামেনির স্মৃতিবিজড়িত জন্মস্থান মাশহাদে তাঁকে চিরতরে সমাহিত বা দাফন করা হবে।
প্রিয় নেতার আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো দেশজুড়ে এক গভীর ও স্তব্ধ শোকের আবহ বিরাজ করছে এবং ইরানের প্রতিটি ছোট-বড় শহরের প্রধান সড়কগুলোতে খামেনির ছবি সংবলিত বিলবোর্ড ও বিশাল পোস্টার টাঙানো হয়েছে।
গত মার্চ মাস থেকেই মূলত এই ঐতিহাসিক শেষকৃত্যের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি ও দাফনের বিলম্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গন ও গণমাধ্যমে নানা ধরনের গুঞ্জন ও জল্পনা-কল্পনা চলছিল।
পবিত্র ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী সাধারণত কোনো মানুষের মৃত্যুর পর সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দাফন করার নিয়ম থাকলেও, ইরানের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার কারণে খামেনির ক্ষেত্রে এই দীর্ঘ ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
যুদ্ধকালীন জরুরি পরিস্থিতি, লাখ লাখ বিদেশি অতিথির আগমন নিশ্চিত করা এবং সর্বোচ্চ নেতার পরিবারের সদস্যদের কফিন একসাথে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিদায় জানানোর জন্যই এই দীর্ঘ সময় নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
নিউজের সূত্র: সিএনএন, মিডল ইস্ট আই এবং আল-জাজিরা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।