সিরাজগঞ্জ ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
শাহজাদপুর প্রতিনিধি: সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলায় এক কোমলমতি ও অবুঝ স্কুলছাত্রীকে পাশবিক নির্যাতনের এক অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক ও জঘন্যতম ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। উপজেলার রূপবাটি ইউনিয়নে অবস্থিত খামার সালনীলা গ্রামে মাত্র ১১ বছর বয়সী এক চতুর্থ/পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীকে একা পেয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে। এই পৈশাচিক অপরাধের সাথে জড়িত থাকার মূল অভিযুক্তি উঠেছে ওই গ্রামেরই এক সুপরিচিত পল্লি চিকিৎসকের বিরুদ্ধে, যার নাম রফিকুল ইসলাম।
এই লজ্জাজনক ও অমানবিক ঘটনার পর ভুক্তভোগী নাবালিকা শিশুর নিরাপত্তা এবং শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে শাহজাদপুর থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর থেকে পুরো শাহজাদপুর উপজেলা জুড়ে সাধারণ মানুষ এবং সচেতন মহলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় বইছে।
বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে জোরপূর্বক অপহরণ ও পাশবিকতা
শাহজাদপুর থানায় দায়েরকৃত মামলার আনুষ্ঠানিক এজাহার, ভুক্তভোগী শিশুর পরিবার এবং স্থানীয় বিশ্বস্ত সূত্র থেকে জানা যায়, লোমহর্ষক এই ঘটনাটি ঘটেছিল গত ২৮ জুন সকালবেলা। খামার সালনীলা গ্রামের ওই ১১ বছর বয়সী শিশুটি প্রতিদিনের মতো সকালের দিকে বাড়ি থেকে বের হয়ে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। সে যখন গ্রামের একটি নির্জন ও কাঁচা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল, তখন পূর্বপরিকল্পিতভাবে ওত পেতে থাকা একই গ্রামের বাসিন্দা ও পল্লি চিকিৎসক রফিকুল ইসলাম শিশুটির পথ আগলে দাঁড়ায়।
আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে পূর্ব শত্রুতার জেরে কৃষকের খড়ের গাদায় আগুন: লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি
চারপাশে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ না থাকার সুযোগটি কাজে লাগিয়ে অভিযুক্ত রফিকুল ওই শিশুটিকে মুখ চেপে ধরে জোরপূর্বক টেনে-হিঁচড়ে নিজের নির্জন বাড়ির ভেতরে নিয়ে যায়। সেখানে অসহায় ও অবুঝ শিশুটির ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হয় এবং তাকে নির্মমভাবে ধর্ষণ করা হয় বলে গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে।
প্রাণনাশের হুমকি ও ভয়ের সংস্কৃতি
পাশবিক নির্যাতন শেষ করার পর অপরাধী রফিকুল ইসলাম অত্যন্ত চতুরতার সাথে শিশুটিকে এক ভয়ানক মানসিক চাপের মুখে ফেলে দেয়। নির্যাতনের শিকার হওয়া শিশুটি যাতে এই জঘন্যতম অপরাধের কথা কারো কাছে প্রকাশ করতে না পারে, সে জন্য রফিকুল তাকে কঠোর ভাষায় শাসায়।
অভিযোগে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে:
ঘটনাটি যদি শিশুটি তার মা-বাবা, ভাই-বোন বা গ্রামের কাউকে জানায়, তবে তাকে এবং তার পরিবারের সদস্যদের খুন করা হবে।
এই ধরণের চরম প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার কারণে ভয়ে ও আতঙ্কে কাঁপতে থাকা শিশুটি প্রচণ্ড মানসিক ট্রমার মধ্যে চলে যায়।
যার ফলে সে প্রথম কয়েকদিন লোকলজ্জা এবং জীবনের নিরাপত্তার ভয়ে বিষয়টি নিজের পরিবারের কাছে সম্পূর্ণ গোপন রাখতে বাধ্য হয়।
মায়ের কাছে কান্নাভেজা স্বীকারোক্তি ও হাসপাতালে চিকিৎসা
ঘটনার পর থেকে শিশুটির আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করেন তার মা ও পরিবারের সদস্যরা। সে স্বাভাবিকভাবে খাওয়া-দাওয়া ও কথা বলা বন্ধ করে দেয় এবং সবসময় ঘরের এক কোণে আতঙ্কিত অবস্থায় বসে থাকত। মেয়ের এই পরিবর্তন দেখে মায়ের মনে সন্দেহের দানা বাঁধে। পরবর্তীতে অনেক স্নেহের সাথে জিজ্ঞাসাবাদ করার একপর্যায়ে মায়ের বুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে ১১ বছর বয়সী ওই শিশুটি। সে পল্লি চিকিৎসক রফিকুল ইসলামের করা সেই পৈশাচিক নির্যাতনের সম্পূর্ণ বিবরণ মায়ের কাছে অত্যন্ত নিখুঁত ও স্পষ্টভাবে খুলে বলে।
মেয়ের মুখে এই ভয়াবহ নির্যাতনের কাহিনী শোনার পর পরিবারটি স্তব্ধ হয়ে পড়ে। শিশুটির শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক ও গুরুতর মনে হওয়ায় মা-বাবা কালবিলম্ব না করে তাকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য এবং ডাক্তারি পরীক্ষার (মেডিকেল টেস্ট) উদ্দেশ্যে স্থানীয় সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখানে চিকিৎসকদের একটি বিশেষ দল ভুক্তভোগী এই নাবালিকা শিশুর প্রয়োজনীয় শারীরিক পরীক্ষা সম্পন্ন করেন।
শাহজাদপুর থানায় নিয়মিত মামলা ও আসামির পলায়ন
হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসাগত প্রমাণ ও ছাড়পত্র সংগ্রহের পর, ভুক্তভোগী শিশুর মা বাদী হয়ে শাহজাদপুর মডেল থানায় হাজির হন। তিনি পল্লি চিকিৎসক রফিকুল ইসলামকে একমাত্র এবং প্রধান আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় একটি এজাহার দায়ের করেন। পুলিশ লিখিত অভিযোগটি আমলে নিয়ে অনতিবিলম্বে তা নিয়মিত মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করে।
আরও পড়ুন: জাতীয় জাদুঘরে লিওনেল মেসির স্বাক্ষরিত জার্সি: ফুটবলপ্রেমীদের উপচে পড়া ভিড়
এদিকে মামলা দায়েরের খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই অভিযুক্ত পল্লি চিকিৎসক রফিকুল ইসলাম নিজের চেম্বার ও বাড়িঘর তালাবদ্ধ করে এলাকা ছেড়ে দ্রুত আত্মগোপনে চলে গেছে। খামার সালনীলা গ্রামের সাধারণ মানুষ ও সচেতন যুবসমাজ এই ঘটনার পর চরম ক্ষুব্ধ। তারা দাবি করেছেন, একজন চিকিৎসক সমাজের সেবক হওয়ার কথা, কিন্তু চিকিৎসার আড়ালে এমন পক্বচরিত্রের মানুষ সমাজে ঘুরে বেড়ানো চরম বিপজ্জনক। ভুক্তভোগী পরিবারটি এখন তীব্র নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এবং তারা প্রশাসনের কাছে আসামিকে দ্রুত গ্রেফতারসহ সর্বোচ্চ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নিয়ে ওসির বক্তব্য
শাহজাদপুর উপজেলায় স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের এই স্পর্শকাতর মামলার বিষয়ে শাহজাদপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুল ইসলাম গণমাধ্যমের কাছে তাঁর শক্ত অবস্থানের কথা ব্যক্ত করেছেন। তিনি জানান, ঘটনাটি জানার পরপরই পুলিশের একটি বিশেষ টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং ভুক্তভোগী শিশুর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়েছে।
ওসি সাইফুল ইসলাম আরও বলেন:
"১১ বছরের একটি কন্যা শিশুর সাথে এই ধরণের আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমরা অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এবং নিখুঁতভাবে তদন্ত করছি। ভুক্তভোগীর মেডিকেল রিপোর্টের আলামত সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিললে বা প্রমাণিত হওয়া মাত্রই আমরা আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করব। পলাতক আসামি রফিকুল ইসলামকে গ্রেফতার করতে পুলিশের একাধিক টিম ইতিমধ্যেই বিভিন্ন স্থানে অভিযান শুরু করেছে। অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাকে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না।"
পুলিশের এই আশ্বাসের পর স্থানীয় মানুষজন আশা করছেন যে প্রশাসন দ্রুততার সাথে অপরাধীকে খাঁচায় বন্দি করবে এবং দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী এই নিষ্পাপ শিশুটি তার ওপর হওয়া অন্যায়ের সঠিক বিচার পাবে।
সংক্ষিপ্ত সংবাদ সূত্র: শাহজাদপুর থানা পুলিশ ও ভুক্তভোগীর পরিবার।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।