জুলাই বিপ্লবের স্মৃতিচারণ: বাঁচলে গাজী মরলে শহীদ ভেবেই গুলির সামনে দাঁড়িয়েছিলাম

জুলাই বিপ্লবের স্মৃতিচারণ: বাঁচলে গাজী মরলে শহীদ ভেবেই গুলির সামনে দাঁড়িয়েছিলাম
ছবি: সংগৃহীত

রাজনীতি ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

ঢাকা: "আমাদের ভেতরের মানসিক শক্তি আর দেশপ্রেম তখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, মনের মধ্যে শুধু একটা কথাই বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল—বাঁচলে গাজী, মরলে শহীদ হব, তবুও স্বৈরাচারের দমন-পীড়নের সামনে এক চুলও পিছপা হব না। পুরানা পল্টনের পানির ট্যাংকের আশেপাশে তখন হাজার হাজার ছাত্র-জনতা একত্রিত হয়েছিল ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের অন্যায় ও নির্মম জুলুমের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে। ঠিক তখনই অপর দিক থেকে নির্বিচারে ও অনবরত গুলি ছুঁড়তে শুরু করে পুলিশ।" ২০২৪ সালের রক্তঝরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সেই ভয়ঙ্কর ও ঐতিহাসিক দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এভাবেই নিজের ভেতরের আবেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন আসাদ বিন রনি।

আরও পড়ুন: জামালপুরে গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মামলা: ৭ আসামির মৃত্যুদণ্ডের ঐতিহাসিক রায়

তিনি সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক হিসেবে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। বর্তমানে তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় সংগঠক হিসেবে নিজের রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি জুলাই বিপ্লবের সেই রক্তক্ষয়ী দিনগুলোর এমন কিছু সত্য ঘটনা তুলে ধরেছেন, যা শুনলে আজও গা শিউরে ওঠে।

চোখের সামনে মৃত্যুর মিছিল ও আকাশপথের বর্বরতা

আসাদ বিন রনি অত্যন্ত বিষণ্ণতা ও ভারাক্রান্ত হৃদয়ে সেদিনের সেই নির্মম হত্যাযজ্ঞের বিবরণ দিচ্ছিলেন। তিনি বলেন, "পুলিশের অনবরত বুলেটের আঘাতের পরও আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা বুক চিতিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ আমার ঠিক ডান পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক আন্দোলনকারী ভাইয়ের মাথার এক পাশে তীব্র গতিতে একটি বুলেট এসে লাগে এবং সেটি মুহূর্তের মধ্যে অন্য পাশ দিয়ে মগজসহ বের হয়ে যায়। নিজের চোখের সামনে দেখলাম একটি তাজা প্রাণ কীভাবে ঝরে গেল, মাথা থেকে মগজ ছিটকে বের হয়ে এল। ঠিক একই সময়ে আমার পাশে থাকা আরেক ছোট ভাইয়ের হাতে আরেকটি গুলি লাগে। এই সব ভয়ঙ্কর দৃশ্য আমি জীবনে বেঁচে থাকা পর্যন্ত কোনোদিনও ভুলতে পারব না।"

তিনি আরও জানান যে, স্বৈরাচারী সরকারের নির্মমতা শুধু স্থলপথেই সীমাবদ্ধ ছিল না। রামপুরা এলাকায় যখন সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্ত মিছিল বের করেছিলেন, তখন তৎকালীন সরকারের নির্দেশে আকাশপথে হেলিকপ্টার থেকেও আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছড়ো হয়েছিল। রনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে যে বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছেন, হাজার হাজার মায়ের কোল যেভাবে খালি করেছেন, সেই ভুক্তভোগী মায়েরা শত বছর বেঁচে থাকলেও তাঁকে কোনোদিন ক্ষমা করবেন না। দেশের মাটিতে শেখ হাসিনার ফাঁসি নিশ্চিত করতেই হবে, এটিই শহীদদের প্রতি আসল বিচার।"

বিপ্লবের দুই বছর পর বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সফলতার দুই বছর পার হলেও, বিপ্লবের মূল চেতনা এবং সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা কতটুকু পূরণ হয়েছে তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন এই সাবেক ছাত্র নেতা। আসাদ বিন রনি বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন:

"২০২৪ সালের জুলাইয়ের সেই গণআন্দোলন কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনের জন্য ছিল না; তা ছিল দীর্ঘদিনের অপশাসন, বৈষম্য এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এক আমূল সংস্কারের আন্দোলন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা লাভ করার পর তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার সেই কাঙ্ক্ষিত সংস্কারের পথ থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। এই সরকার যেভাবে জুলাই বিপ্লবের শহীদদের আত্মত্যাগ এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ে এক ধরণের ঠাট্টা-মশকরা শুরু করেছে, তাতে সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম নিচ্ছে। বর্তমান নীতিনির্ধারকদের এই ধরণের উদাসীন আচরণ ও রাজনৈতিক চাল চালার প্রবণতা দেখে মনে হচ্ছে, তারা দেশকে এক চরম অনিশ্চয়তা এবং একটি সশস্ত্র গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।"

পল্টন মোড়: আন্দোলনের অন্যতম উত্তপ্ত কেন্দ্রবিন্দু

২০২৪ সালের সেই ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন কৌশলগত এলাকা যেমন—যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, মিরপুর, বাড্ডা এবং রামপুরায় তুলনামূলকভাবে সহিংসতার মাত্রা এবং লাশের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। তবে ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে ঢাকার পল্টন মোড় এবং সংলগ্ন পুরানা পল্টন এলাকাটি আন্দোলনের সময় সবসময়ই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর সংহতি সমাবেশ, শিক্ষার্থীদের ঝটিকা মিছিল, স্লোগান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তীব্র ধরপাকড় ও টিয়ারশেল নিক্ষেপের কারণে এই এলাকাটি ২৪ ঘণ্টাই উত্তপ্ত থাকত।

বিশেষ করে ২১ জুলাই যখন তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকার দেশজুড়ে ‘দেখামাত্র গুলি’ (শুট অন সাইট) করার মতো এক অসাংবিধানিক ও নির্মম নির্দেশনা জারি করে, তখন চারদিকের পরিস্থিতি আরও ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে। পল্টন সংলগ্ন গুলিস্তান, জিরো পয়েন্ট এবং পুরানা পল্টন মোড়ে বিক্ষোভকারী সাধারণ জনতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তুমুল ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ চলছিল। চারদিকে তখন শুধু সাউন্ড গ্রেনেড আর বুলেটের শব্দে এক যুদ্ধক্ষেত্রের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।

কিশোর আমিনের আত্মত্যাগ ও স্বৈরাচারের পতন

সেই রক্তক্ষয়ী দিনগুলোতে কেবল রাজনৈতিক কর্মী বা ছাত্ররাই নয়, বরং অসংখ্য সাধারণ ও নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী মানুষও ফ্যাসিবাদের নির্মম বুলেটের শিকার হয়েছিলেন। তেমনই এক দুর্ভাগ্যজনক ও বেদনাদায়ক শিকার ছিল মাত্র ১৬ বছর বয়সী কিশোর আমিন। ২১ জুলাইয়ের সেই তীব্র উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে আমিন বিশেষ দরকারে ওই এলাকা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। কিন্তু কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ চারদিক থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর এলোপাতাড়ি গুলি শুরু হয়।

আরও পড়ুন: বরগুনায় সংরক্ষিত বন দখল ও গাছ কাটার মামলা: ইউপি সদস্যসহ ৫ জন কারাগারে

অবুঝ কিশোর আমিন জীবন বাঁচানোর কোনো সুযোগ পাওয়ার আগেই একটি তাজা বুলেট তার বুক ভেদ করে আরপার হয়ে চলে যায়। রক্তাক্ত অবস্থায় সে পিচঢালা রাজপথে লুটিয়ে পড়লে স্থানীয় আন্দোলনকারীরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে তাকে উদ্ধার করার জন্য এগিয়ে যান। কিন্তু বুকের ক্ষতটি অত্যন্ত গভীর হওয়ায় এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে হাসপাতালের নেওয়ার সুযোগ না পেয়ে ঘটনাস্থলেই আমিনের মৃত্যু হয়।

আমিনের মতো অসংখ্য খেটে খাওয়া মানুষের এই নির্মম ও নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ সেদিন আন্দোলনকে এক ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যায়। এই নিষ্পাপ কিশোরের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে পল্টন ও তার আশেপাশের এলাকায় আন্দোলন আরও বেশি বেগবান ও তীব্র আকার ধারণ করে। একের পর এক বুলেটের আঘাতে শত শত সাধারণ মানুষের প্রাণহানি ও রক্তপাত দেখে দেশের আপামর জনতা আর ঘরে বসে থাকতে পারেননি। অবশেষে ৫ আগস্ট লাখো মানুষের এক অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক জনস্রোত যখন ঢাকার রাজপথ দখল করে গণভবনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে, তখন তীব্র গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন তৎকালীন স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। হাজারো শহীদের তাজা রক্ত আর হাজার হাজার পঙ্গুত্ব বরণ করা মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাঙালি জাতি লাভ করে স্বৈরাচারমুক্ত এক নতুন বাংলাদেশ, যা ইতিহাসে ‘জুলাই বিপ্লব’ নামে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

সংক্ষিপ্ত সংবাদ সূত্র: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়কের সাক্ষাৎকার।

1 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন