শাহজাদপুরে রক্তাক্ত ফ্রাইডে: পৃথক স্থানে গৃহবধূ ও নিখোঁজ যুবকের মরদেহ উদ্ধার, স্বামী আটক

শাহজাদপুরে রক্তাক্ত ফ্রাইডে: পৃথক স্থানে গৃহবধূ ও নিখোঁজ যুবকের মরদেহ উদ্ধার, স্বামী আটক
ছবি: সংগৃহীত
 প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

শাহজাদপুর: সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলায় একই দিনে পৃথক দুটি স্থান থেকে এক গৃহবধূ ও এক যুবকের রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধারকে কেন্দ্র করে এক অভূতপূর্ব চাঞ্চল্য ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে উপজেলার দুটি ভিন্ন ইউনিয়ন থেকে এই দুটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়, যা স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জনমনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। থানা পুলিশের ক্ষিপ্র তৎপরতায় একটি ঘটনায় ইতিমধ্যেই অভিযুক্ত স্বামীকে গ্রেফতার করা সম্ভব হলেও, অন্য ঘটনাটির নেপথ্যে থাকা খুনিদের চিহ্নিত করতে অন্ধকারে রয়েছে প্রশাসন। শুক্রবার (১০ই জুলাই) শাহজাদপুর থানা পুলিশ উপজেলার গাড়াদহ ইউনিয়ন এবং হাবিবুল্লাহনগর ইউনিয়ন থেকে এই দুটি পৃথক মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠিয়েছে। এই জোড়া মৃত্যুর ঘটনায় দুটি পরিবারে নেমে এসেছে চরম শোকের মাতম এবং পুরো এলাকা জুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। শাহজাদপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুল ইসলাম পৃথক এই দুটি উদ্ধার অভিযানের বিষয়টি অফিশিয়ালি নিশ্চিত করেছেন।

​প্রথম ঘটনা: মশিপুর গ্রামে বসতবাড়িতে গৃহবধূ মিমকে নির্মম হত্যা

​শাহজাদপুর উপজেলার গাড়াদহ ইউনিয়নের মশিপুর গ্রামে একটি ঘরের ভেতর থেকে ১৮ বছর বয়সী এক তরুণী গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতের নাম মিম খাতুন। তিনি মশিপুর মধ্যপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রাসেলের স্ত্রী এবং একই উপজেলার উত্তরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল আলীমের মেয়ে। বিয়ের মাত্র কিছুদিনের মাথায় বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর ঘরে আসা মিমের এই আকস্মিক ও রক্তাক্ত পরিণতি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তাঁর স্বজনেরা।

আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে পারিবারিক কলহের নৃশংস পরিণতি: ১৮ বছরের গৃহবধূ মিমকে গলাটিপে হত্যা, ঘাতক স্বামী আটক

​গত ৯ই জুলাই রাতের কোনো এক সময়ে এই বর্বরোচিত ঘটনাটি ঘটে। নিহতের বাবার পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মিম খাতুনের সাথে তাঁর স্বামী রাসেলের পারিবারিক ও দাম্পত্য নানা বিষয় নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই মনস্তাত্ত্বিক ও পারিবারিক কোন্দল চলছিল। ঘটনার রাতেও তাদের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ ও ঝগড়াঝাঁটি হয় বলে প্রতিবেশীরা আভাস পেয়েছেন। মিমের বাবার পরিবারের সরাসরি অভিযোগ, রাসেলের পরিবারের সদস্যরা পরিকল্পিতভাবে মিমকে শারীরিক নির্যাতন করার পর একপর্যায়ে গলা টিপে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে।

​বাবার বাড়ির স্বজনেরা জানান, মিমের মৃত্যুর খবর পেয়ে তারা যখন রাসেলের বাড়িতে ছুটে যান, তখন মিমের নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখেন। মিমের গলায় একাধিক গভীর দাগ এবং শরীরের বিভিন্ন সংবেদনশীল স্থানে আঘাতের সুনির্দিষ্ট চিহ্ন ছিল, যা এটি একটি স্পষ্ট ও নির্মম হত্যাকাণ্ড হিসেবে প্রমাণ করে। খবর পেয়ে শাহজাদপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল দ্রুত মশিপুর গ্রামে যায় এবং লাশের প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। এই ঘটনায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে একটি নিয়মিত হত্যা মামলা দায়ের করা হলে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত স্বামী রাসেলকে আটক করে।

​দ্বিতীয় ঘটনা: ফুটবল খেলা দেখতে গিয়ে নিখোঁজ, ২ দিন পর মিলল সবুজের রক্তাক্ত লাশ

​গৃহবধূ হত্যার রেশ কাটতে না কাটতেই শাহজাদপুরের হাবিবুল্লাহনগর ইউনিয়নের হাসাকোলা গ্রামে আরেকটি লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের খবর প্রকাশ্যে আসে। গত দুই দিন ধরে নিখোঁজ থাকা সবুজ হোসেন (৩৫) নামে এক যুবকের রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহত সবুজ হোসেন উপজেলার রতনকান্দি উত্তরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রহিম সরকারের ছেলে।

​সবুজের পারিবারিক সূত্র এবং তাঁর স্ত্রী মোছাঃ মিতু খাতুনের দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, গত বুধবার (৮ই জুলাই) রাত ১০টার দিকে অত্যন্ত স্বাভাবিক মুডে স্থানীয় একটি মাঠে বড় পর্দায় ফুটবল খেলা দেখার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন সবুজ। কিন্তু খেলা শেষ হওয়ার নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে গেলেও তিনি আর ঘরে ফিরে আসেননি। গভীর রাত পর্যন্ত সবুজের মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তীব্র উৎকণ্ঠা দেখা দেয়। বৃহস্পতিবার দিনভর আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ি এবং সবুজের সম্ভাব্য সমস্ত যাতায়াতের জায়গায় হন্যে হয়ে খোঁজাখুঁজি করেও তাঁর কোনো সন্ধান মেলাতে পারেনি পরিবার।

​অবশেষে শুক্রবার সকালে হাসাকোলা গ্রামের নান্নুর বাড়ির উত্তর পাশের রাস্তার ঢালে, একটি খালের পাড়ে অজ্ঞাতনামা এক যুবকের রক্তাক্ত লাশ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় বাসিন্দারা চিৎকার শুরু করেন। মুহূর্তের মধ্যে গ্রামবাসীরা সেখানে জড়ো হন এবং শাহজাদপুর থানা পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাশটি উদ্ধার করার পর সবুজের পরিবারের সদস্যরা এসে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করেন। নিহতের চোখ সম্পূর্ণ উপড়ে ফেলার মতো আঘাত এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে ধারালো বা ভারী কোনো বস্তু দিয়ে আঘাতের একাধিক গভীর চিহ্ন রয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, বুধবার রাতে খেলা দেখে ফেরার পথে বা অন্য কোনো নির্জন স্থানে তাকে কুপিয়ে ও নির্যাতন করে হত্যা করার পর লাশটি এই খালের পাড়ে ফেলে রেখে গেছে ঘাতকেরা।

​পুলিশের তদন্ত প্রক্রিয়া ও ওসির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য

​শাহজাদপুরে একই দিনে এই দুটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে শাহজাদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেছেন। তিনি জানান, পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে দুটি ব্যবস্থাপনাই হত্যাকাণ্ড হিসেবে পরিলক্ষিত হচ্ছে।

আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জে বজ্রপাতে পুকুরে মাছ ধরার সময় স্কুলছাত্রের অকাল মৃত্যু

​তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে ওসির বক্তব্য ও গৃহীত পদক্ষেপসমূহ নিচে দেওয়া হলো:

  • মশিপুর গৃহবধূ হত্যা মামলা: ওসির তথ্যমতে, মশিপুরের গৃহবধূ মিম খাতুনের গলায় একাধিক কালশিটে ও শ্বাসরোধের দাগ রয়েছে। এই ঘটনায় নিহতের পিতার এজাহারের ভিত্তিতে থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন এবং দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় একটি নিয়মিত হত্যা মামলা রুজু করা হয়েছে। মামলার প্রধান আসামি ও নিহতের স্বামী রাসেলকে ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
  • হাসাকোলা গ্রামের লাশ উদ্ধার: শুক্রবার সকালে হাসাকোলা গ্রামের নান্নুর বাড়ির রাস্তার উত্তর পাশের খালের পাড় থেকে সবুজের লাশ উদ্ধারের সময় তাঁর চোখ ও শরীরে মারাত্মক আঘাতের আলামত পাওয়া গেছে। অজ্ঞাতনামা খুনিদের চিহ্নিত করতে পুলিশের ক্রাইম সিনের বিশেষ টিম পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণ ও আলামত সংগ্রহ করেছে।
  • ময়নাতদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া: আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের জন্য এবং মৃত্যুর প্রকৃত বৈজ্ঞানিক কারণ ও সময় নিশ্চিত করতে লাশ দুটিকে সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পেলে মামলার চার্জশিট গঠনে সুবিধা হবে।
  • বিশেষ অভিযান পরিচালনা: দুটি ভিন্ন অপরাধের নেপথ্যে থাকা প্রকৃত অপরাধীদের, বিশেষ করে সবুজের হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত মূল আসামিদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের একাধিক টিম ইতিমধ্যেই মাঠে নেমেছে এবং বিশেষ অভিযান শুরু করেছে।

​সামাজিক অবক্ষয় ও নিরাপত্তার প্রশ্নে সম্পাদকীয় উদ্বেগ

​সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে একই দিনে পৃথক দুটি স্থানে নারী ও যুবকের এই ধরণের রক্তাক্ত লাশ উদ্ধারের ঘটনা গ্রামীণ সমাজের নৈতিক অবক্ষয় এবং নিরাপত্তার সংকটকে নতুন করে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। একদিকে সামান্য পারিবারিক কলহের জেরে ১৮ বছরের এক তরুণী গৃহবধূর জীবন কেড়ে নেওয়ার মতো সহনশীলতাহীন মানসিকতা, অন্যদিকে খেলা দেখতে গিয়ে এক যুবকের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া—দুটি ঘটনাই সাধারণ মানুষের মাঝে এক গভীর ভীতি তৈরি করেছে। বিশেষ করে, রাতে যুবকদের ঘরের বাইরে চলাচল এবং পারিবারিক বিরোধের ক্ষেত্রে সামাজিক সালিশি ব্যবস্থার দুর্বলতা এই অপরাধগুলোকে আরও উস্কে দিচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় সমাজবিজ্ঞানীরা। "দিগন্ত বাংলা নিউজ" মনে করে, অপরাধী যেই হোক না কেন, প্রশাসনের উচিত কোনো প্রকার রাজনৈতিক বা সামাজিক চাপের ঊর্ধ্বে উঠে মিম ও সবুজের খুনিদের দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা, যাতে শাহজাদপুরের মাটিতে এমন বর্বরতার পুনরাবৃত্তি আর না ঘটে।

নিউজ সূত্র: শাহজাদপুর থানা পুলিশ ও স্থানীয় প্রতিনিধি।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন