৪ বছর পর পরীমণির বিস্ফোরক পোস্ট: সত্য প্রকাশের পর রাষ্ট্রের কাছে কঠিন প্রশ্ন

৪ বছর পর পরীমণির বিস্ফোরক পোস্ট: সত্য প্রকাশের পর রাষ্ট্রের কাছে কঠিন প্রশ্ন
ছবি: সংগৃহীত
 প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

৪ বছর পর পরীমণির বিস্ফোরক বার্তা: হারানো সম্মান ও মানসিক শান্তির দায়ে রাষ্ট্রের মুখোমুখি ঢালিউড নায়িকা

ঢাকা: দীর্ঘ চার বছর আগের এক অন্ধকার অধ্যায় নিয়ে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে দেশের শোবিজ অঙ্গন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে। ২০২১ সালের ৪ঠা আগস্ট ঢাকাই চলচ্চিত্রের অন্যতম আলোচিত ও জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা পরীমণির বনানীর বাসভবনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাটকীয় অভিযান, পরবর্তী সময়ে তাকে গ্রেপ্তার এবং দীর্ঘ ২৮ দিনের কারাবাসের সেই ট্রমাটিক স্মৃতি আবারও জনসমক্ষে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে বুকের ভেতর চেপে রাখা সেই কষ্টের ও অন্যায়ের স্মৃতিকে পেছনে ফেলে এবার সরাসরি সত্য ও ন্যায়বিচারের দাবিতে গর্জে উঠেছেন এই অভিনেত্রী।

​শনিবার (১১ জুলাই) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক দীর্ঘ ও আবেগঘন পোস্টে পরীমণি তার জীবনের সবচেয়ে বিপর্যয়কর সেই অধ্যায়ের নেপথ্যের সত্যতা দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরেন। একটি অনলাইন টক শোতে র‍্যাবের সাবেক এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তির পর অভিনেত্রী এই প্রতিক্রিয়া জানান। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, তিনি কোনো প্রতিশোধ চান না, বরং চান সমাজে যেন আর কোনো নির্দোষ মানুষ এমন রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক জুলুমের শিকার না হয়।

সাবেক র‍্যাব কর্মকর্তার স্বীকারোক্তি ও পরীমণির ধন্যবাদ

​পরীমণির এই নতুন করে সরব হওয়ার পেছনে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে সম্প্রতি একটি অনলাইন মাধ্যমে প্রচারিত টক শো। সেই টক শোতে র‍্যাবের সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল খাইরুল ইসলাম একটি অতি সংবেদনশীল ও সত্য তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি প্রকাশ্যে স্বীকার করেন যে, তৎকালীন র‍্যাবের মহাপরিচালক (DG) এবং পরবর্তী সময়ে সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের সরাসরি ও বিশেষ নির্দেশে পরীমণির বাসায় ওই দীর্ঘ অভিযান চালানো হয়েছিল এবং তাকে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে রক্তাক্ত ফ্রাইডে: পৃথক স্থানে গৃহবধূ ও নিখোঁজ যুবকের মরদেহ উদ্ধার, স্বামী আটক

​এই সত্যটি প্রকাশ্যে আসায় লেফটেন্যান্ট কর্নেল খাইরুল ইসলামকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছেন পরীমণি। তিনি তার পোস্টে উল্লেখ করেন, এই স্বীকারোক্তির মাধ্যমে আজ দেশের সাধারণ মানুষ এবং তার ভক্তরা জানতে পেরেছেন যে তার সাথে সেদিন কী পরিমাণ অন্যায় করা হয়েছিল। যা এতদিন কেবল একটি মহল সাজানো নাটক হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, তা আজ আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকর্তাদের মুখ থেকেই সত্য হিসেবে প্রমাণিত হলো।

‘আল্লাহ আর আমি ছাড়া কেউ বুঝবে না সেই ২৮ দিনের যন্ত্রণা’

​ফেসবুক পোস্টে পরীমণি তার কারাবাস এবং তদন্তের নামে দীর্ঘ মানসিক ও সামাজিক নির্যাতনের কথা অত্যন্ত আবেগঘন ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি লিখেছেন, এই ঘটনাটি তার জীবনের এমন এক কালিমালিপ্ত অধ্যায় যা তাকে একজন পেশাদার শিল্পী, একজন স্বাধীন নারী এবং সর্বোপরি একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে ভেতর থেকে গভীরভাবে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল।

​সেদিনের সেই সাজানো ঘটনার কারণে তার ব্যক্তিগত জীবন স্থবির হয়ে পড়েছিল, সামাজিক সম্মান ধূলিসাৎ করা হয়েছিল এবং তার দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রমে গড়া পেশাগত ক্যারিয়ার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরীমণি তার পোস্টে লিখেছেন:

​"পরবর্তী সময়ে সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন মামলায় আমাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে টানা ২৮ দিন অন্ধকার কারাগারে বন্দি রাখা হয়েছিল। সেই নরকতুল্য অভিজ্ঞতা আমার জীবনকে কতটা বিপর্যস্ত, ক্ষতবিক্ষত ও ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল, তা একমাত্র মহান আল্লাহ এবং আমি ছাড়া এই পৃথিবীর আর কোনো মানুষের পক্ষে পুরোপুরি উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।"


সামাজিক হেনস্তা ও ভুক্তভোগীর জীবন

​২০২১ সালের সেই ঘটনার পর থেকে আজ পর্যন্ত পরীমণি নিজেকে একজন নিয়তি তাড়িত ভুক্তভোগী (Victim) হিসেবেই দেখছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সে সময় যেভাবে প্রচার মাধ্যমের একাংশ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাকে অপদস্থ করা হয়েছিল, তা অত্যন্ত লজ্জাজনক। একজন নারীর চরিত্র, নৈতিকতা এবং আত্মসম্মান নিয়ে যেভাবে প্রকাশ্য আদালতে এবং সমাজে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিচারহীনতা ও সামাজিক নিষ্ঠুরতার এক বেদনাদায়ক ও কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। দীর্ঘ চার বছর ধরে তিনি এই অপবাদের মানসিক বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছেন, যার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি ছিল না।

রাষ্ট্রের কাঠগড়ায় পরীমণির ৩টি মৌলিক প্রশ্ন

​বর্তমান দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এবং সত্য উন্মোচনের এই ক্ষণে পরীমণি সরাসরি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক ও বিচার ব্যবস্থার দিকে কয়েকটি মৌলিক ও তীক্ষ্ণ প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন। একজন নাগরিক হিসেবে তার এই প্রশ্নগুলো আজ দেশের সচেতন সমাজকেও ভাবিয়ে তুলছে:

  • ১. হারানো দিন ফিরিয়ে দেওয়ার প্রশ্ন: পরীমণি জানতে চেয়েছেন, অন্যায়ভাবে তার জীবন থেকে কেড়ে নেওয়া সেই অন্ধকার দিনগুলো এবং বিভীষিকাময় সময়গুলো কি রাষ্ট্র বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাকে আর কখনো ফিরিয়ে দিতে পারবে?
  • ২. মানসিক শান্তি ও সম্মানের ক্ষতিপূরণ: যে সামাজিক মর্যাদা, আত্মসম্মান এবং মানসিক প্রশান্তি তিনি চিরতরে হারিয়েছেন, তা কি কোনোদিন কোনো মূল্যে ফিরে পাওয়া সম্ভব?
  • ৩. অসত্য ধারণার দায়ভার: সাধারণ মানুষের মনে মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে পরীমণিকে নিয়ে যে নেতিবাচক, অসত্য, বিভ্রান্তিকর ও চরম বিতর্কিত ধারণা তৈরি করা হয়েছিল, রাষ্ট্র কি আজ তার সেই সামাজিক ক্ষতির দায় নেবে?

প্রতিশাধ নয়, পরীমণি চান সুশাসন ও ন্যায়বিচার

​সাধারণত এই ধরনের ঘটনার পর মানুষের মনে ক্ষোভ বা প্রতিশোধের স্পৃহা জাগা স্বাভাবিক। তবে পরীমণি এখানে ব্যতিক্রমী ও পরিপক্ব মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, অতীত নিয়ে তিনি কারো বিরুদ্ধে কোনো ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নিতে চান না। তিনি কাউকে সামাজিকভাবে ছোট বা অপমানিত করার পক্ষেও নন।

আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জে যাত্রীবাহী বাসের পেছনে সজোরে ধাক্কা: অটোরিকশার মা-ছেলে নিহত, আহত ৩

​অভিনেত্রীর একমাত্র চাওয়া হলো দেশের বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও সুশাসন। তিনি চান, ভবিষ্যতে যেন আর কোনো সাধারণ নাগরিক বা কোনো নির্দোষ মানুষ এই ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহার, মিথ্যা মামলা কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক ষড়যন্ত্রের শিকার না হন। পরীমণির এই অবস্থান মূলত দেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এক শান্তিপূর্ণ কিন্তু শক্তিশালী প্রতিবাদ।

কঠিন সময়ের সহযাত্রীদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা

​জীবনের সেই চরমতম সংকটের সময়ে যারা তার পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে ভুলেননি এই ঢালিউড তারকা। কারাবাস ও আইনি লড়াইয়ের দিনগুলোতে তার পরিবার, গুটি কয়েকজন বিশ্বস্ত বন্ধু, সহকর্মী, বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিক সমাজ এবং দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা কোটি ভক্তদের প্রতি তিনি আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। তাদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও সমর্থনই তাকে বেঁচে থাকার এবং নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি জুগিয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

মুক্ত আকাশে ডান মেলে বাঁচার নতুন প্রত্যয়

​পোস্টের শেষাংশে পরীমণি তার জীবনের আগামী দিনগুলোর এক চমৎকার ও ইতিবাচক রোডম্যাপ প্রকাশ করেছেন। তিনি অতীতের সমস্ত বিষণ্ণতা ও মানসিক ক্ষত ঝেড়ে ফেলে নতুন উদ্যমে সামনে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

​পরীমণি লিখেছেন, তিনি আর কোনো বৃত্তে বন্দি থাকতে চান না, বরং নিজের নামের সার্থকতা বজায় রেখে মুক্ত আকাশে পরীর মতোই ডানা মেলে উড়তে চান। বর্তমান সময়ে তার পুরো পৃথিবী জুড়ে রয়েছে তার কাজ, তার স্নেহের সন্তান, পরিবার এবং তার প্রিয় দর্শক। এই চার দেয়ালের ভালোবাসাকে পুঁজি করেই তিনি তার বাকি জীবনটি অত্যন্ত সুন্দর, সম্মানজনক ও শান্তিপূর্ণভাবে অতিবাহিত করতে চান।

​পরীমণির এই ফেসবুক পোস্টটি প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা ব্যাপক ভাইরাল হয়েছে। সাধারণ নেটিজেন থেকে শুরু করে বিনোদন জগতের তারকারা পরীমণির এই সাহসিকতাকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন এবং তার তোলা প্রশ্নগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত ও সাবেক প্রশাসনের দোষীদের বিচার দাবি করছেন।

নিউজ সূত্র: পরীমণির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন