খুলনায় ১০ম শ্রেণির ছাত্রীকে হত্যার পর বস্তাবন্দি করলেন মা-বাবা: নেপথ্যে মাদক ও পারিবারিক কলহ

খুলনায় ১০ম শ্রেণির ছাত্রীকে হত্যার পর বস্তাবন্দি করলেন মা-বাবা: নেপথ্যে মাদক ও পারিবারিক কলহ
ছবি: সংগৃহীত
 প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

খুলনায় ১০ম শ্রেণির ছাত্রীকে পিটিয়ে হত্যার পর বস্তাবন্দি করলেন জন্মদাতা মা-বাবা: নেপথ্যে মাদকাসক্তি ও পারিবারিক নির্মমতা

খুলনা: খুলনায় দশম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে নির্মমভাবে হত্যা করার পর ঘটনাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার উদ্দেশ্যে মরদেহ বস্তাবন্দি করে ফেলে দেওয়ার এক লোমহর্ষক ও শিউরে ওঠার মতো ঘটনা উন্মোচন করেছে পুলিশ। নিহত ওই কিশোরীর নাম আরফানা হোসেন নির্জনা। নিজের আপন কন্যাকে পিটিয়ে ও মাথায় আঘাত করে হত্যা করার পর অপরাধ ঢাকতে মা-বাবা মিলে লাশ বস্তায় ভরে লোকচক্ষুর আড়ালে ফেলে এসেছিল। এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের মাকে পুলিশ ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে এবং তিনি আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে ঘটনার পর থেকেই ঘাতক বাবা পলাতক রয়েছেন এবং তাকে আইনের আওতায় আনতে পুলিশের জোরদার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

​শনিবার খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) কার্যালয়ে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য ও তদন্তের বিস্তারিত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন।

যেভাবে উদ্ধার হয় বস্তাবন্দি মরদেহ ও মামলার সূত্রপাত

​পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ জুলাই নগরীর নিরালা প্রান্তিক আবাসিক এলাকার তিন নম্বর রোডে একটি পরিত্যক্ত স্থানে বস্তাবন্দি অবস্থায় এক অজ্ঞাত পরিচয় কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। এই নির্মম ঘটনার পর অপরাধীদের শনাক্ত করতে ও বিচার নিশ্চিত করতে গত ১০ জুলাই পুলিশ নিজে বাদী হয়ে একটি অজ্ঞাতনামা হত্যা মামলা দায়ের করে।

আরও পড়ুন: ৪ বছর পর পরীমণির বিস্ফোরক পোস্ট: সত্য প্রকাশের পর রাষ্ট্রের কাছে কঠিন প্রশ্ন

​পরবর্তী সময়ে নিবিড় তদন্তের মাধ্যমে পুলিশ জানতে পারে যে, উদ্ধারকৃত বস্তাবন্দি নিথর দেহটি আরফানা হোসেন নির্জনা নামের এক কিশোরীর, যিনি দশম শ্রেণিতে পড়াশোনা করতেন। নির্জনা খুলনা নগরীর বসুপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. আলিম হোসেন আকাশ এবং আরিফা ইয়াসমিন সীমা দম্পতির একমাত্র কন্যাসন্তান ছিলেন।

জিজ্ঞাসাবাদে মায়ের বিভ্রান্তি ও পরবর্তীতে আদালতের স্বীকারোক্তি

​হত্যাকাণ্ডের শিকার নির্জনার পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর পুলিশ তদন্তের অংশ হিসেবে নিহতের মা আরিফা ইয়াসমিন সীমাকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নিজের অপরাধ আড়াল করার জন্য সীমা পুলিশকে নানা ধরনের বিভ্রান্তিমূলক ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চালান।

​তবে পুলিশের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের ম্যারাথন ও কৌশলী জিজ্ঞাসাবাদের মুখে একপর্যায়ে তিনি ভেঙে পড়েন এবং নিজের মেয়েকে স্বামীসহ মিলে নির্মমভাবে হত্যা করার সত্য কাহিনী স্বীকার করেন। পরবর্তীতে পুলিশ তাকে আদালতে হাজির করলে তিনি জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে বিচারকের নিকট নিজের দোষ স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা অনুযায়ী স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন।

হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা পারিবারিক কলহ ও কারণসমূহ

​পুলিশের সংবাদ সম্মেলনে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে জানানো হয় যে, এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পেছনে দীর্ঘদিনের পারিবারিক অশান্তি, কলহ এবং মা-বাবার মাদকাসক্তি প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। জিজ্ঞাসাবাদে নিহতের মা সীমার দেওয়া তথ্য ও পুলিশের অনুসন্ধানে যে কারণগুলো উঠে এসেছে তা নিচে তুলে ধরা হলো:

  • অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ে ও প্রেমের সম্পর্ক: নিহতের মা সীমার দাবি অনুযায়ী, নির্জনা যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশোনা করতেন, তখন তিনি এক বিবাহিত ছেলের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং পরবর্তীতে তাকে বিয়েও করেন।
  • নতুন সম্পর্কের গুঞ্জন ও নিখোঁজ থাকা: সেই সম্পর্কের টানাপোড়েনের পর বর্তমান সময়ে রনি নামের আরেকটি ছেলের সাথে নির্জনার নতুন করে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই সম্পর্কের জের ধরে ঘটনার আগে টানা তিন দিন নির্জনা নিজের বাড়ির বাইরে অবস্থান করছিলেন।
  • তীব্র পারিবারিক কলহ: তিন দিন নিখোঁজ থাকার পর নির্জনা বাসায় ফিরলে তা নিয়ে পরিবারের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এটি নিয়ে ঘটনার রাতে মা ও বাবার সাথে মেয়ের তীব্র বাদানুবাদ ও পারিবারিক কলহের সৃষ্টি হয়।

ঘটনার ভয়াল রাত: যেভাবে কেড়ে নেওয়া হলো নির্জনার প্রাণ

​স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, ঘটনার রাতে তিন দিন পর মেয়ে ঘরে ফিরলে মা আরিফা ইয়াসমিন সীমার সাথে নির্জনার প্রচণ্ড বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে মা সীমা মেয়েকে প্রচণ্ড মারধর করতে শুরু করেন।

​ঘরজুড়ে চলা এই পারিবারিক সহিংসতার মাঝেই পাশের রুম থেকে নির্জনার বাবা মো. আলিম হোসেন আকাশ একটি শক্ত কাঠের বাতা (কাঠের টুকরো বা লাঠি) এনে নির্জনাকে লক্ষ্য করে সজোরে আঘাত করেন। দুর্ভাগ্যবশত, সেই কাঠের বাতার আঘাতটি সরাসরি নির্জনার মাথায় গিয়ে লাগে। মাথার ভেতরে গভীর ক্ষত তৈরি হওয়ায় এবং সেখান থেকে অনবরত অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হতে থাকায় কিছুক্ষণের মধ্যেই ছটফট করতে করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে দশম শ্রেণির এই ছাত্রী।

অপরাধ ঢাকতে লাশ গুমের অপচেষ্টা এবং মা-বাবার মাদকাসক্তি

​মেয়ে মারা যাওয়ার পর ঘাতক মা-বাবা চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তারা নিজেদের আইনি শাস্তি থেকে বাঁচাতে এবং পুরো ঘটনাটিকে অন্য খাতে প্রবাহিত করার জন্য এক হীন পরিকল্পনা করেন। তারা রাতের আঁধারে নির্জনার মরদেহটি একটি বড় বস্তার ভেতর ভরে শক্ত করে মুখ আটকে দেয়। এরপর সুযোগ বুঝে ঘর থেকে বের হয়ে নগরীর নিরালা প্রান্তিক আবাসিক এলাকার তিন নম্বর রোডের এক নির্জন স্থানে বস্তাবন্দি লাশটি ফেলে দিয়ে আসে, যেন কেউ তাদের সন্দেহ করতে না পারে।

আরও পড়ুন: বেলকুচিতে পানির লাইনে রহস্যময় গ্যাস ও আগুন: চাঞ্চল্য ও ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের প্রস্তুতি

​পুলিশের তদন্তে আরও একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। জানা গেছে, নির্জনার বাবা মো. আলিম হোসেন আকাশ এবং মা আরিফা ইয়াসমিন সীমা— দুজনেই তীব্রভাবে মাদকাসক্ত ছিলেন। মাদকাসক্তির ফলে তাদের স্বাভাবিক চিন্তাভাবনা লোপ পেয়েছিল এবং দীর্ঘদিনের পারিবারিক কলহের সাথে এই মাদকাসক্তি যুক্ত হয়েই শেষ পর্যন্ত তাদের একমাত্র সন্তানকে খুন করার মতো জঘন্যতম অপরাধের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

পলাতক বাবার খোঁজে পুলিশের চিরুনি অভিযান

​পুলিশের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আরও জানান, নিহত নির্জনার বাবা মো. আলিম হোসেন আকাশ মূলত তার শ্বশুরবাড়ি এলাকাতেই বসবাস করতেন এবং সেখানে ছোটখাটো একটি ব্যবসা পরিচালনা করতেন। ঘটনার পর এবং স্ত্রীর আটকের খবর পেয়েই আকাশ এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান। বর্তমানে ঘাতক বাবা পলাতক রয়েছেন। পুলিশ কমিশনার জাহিদুল হাসান স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, পলাতক খুনি মো. আলিম হোসেন আকাশকে যেকোনো মূল্যে গ্রেপ্তার করতে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে এবং বিভিন্ন সম্ভাব্য স্থানে চিরুনি অভিযান চালানো হচ্ছে। খুব দ্রুতই তাকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেছে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ।

নিউজ সূত্র: খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (KMP) সংবাদ সম্মেলন।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন