ব্রেকিং নিউজ

মাদারীপুরে থানা থেকে গ্রিল কেটে নারী আসামির পলায়ন: কেরাণীগঞ্জে ধরে পাঠালো কারাগারে

মাদারীপুরে থানা থেকে গ্রিল কেটে নারী আসামির পলায়ন: কেরাণীগঞ্জে ধরে পাঠালো কারাগারে
ছবি: সংগৃহীত
 প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

থানা হেফাজতের নিরাপত্তা ভেঙে জানালার গ্রিল কেটে আসামির দুঃসাহসিক পলায়ন: ঢাকার কেরাণীগঞ্জে মাদারীপুর পুলিশের বিশেষ অভিযানে পুনরায় গ্রেপ্তার

মাদারীপুর: জেলা সদরের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে থানা হেফাজত থেকে গ্রিল কেটে পালিয়ে যাওয়া সেই বহুল আলোচিত নারী আসামিকে অবশেষে পুনরায় আইনের আওতায় আনা হয়েছে। মাদারীপুর জেলা পুলিশের একটি চৌকস ও বিশেষ অনুসন্ধানী দল তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় রাজধানী ঢাকার কেরাণীগঞ্জ এলাকার একটি গোপন আস্তানায় সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে তাকে পুনরায় গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।

​শনিবার (১১ জুলাই) দুপুরের দিকে মাদারীপুর মডেল থানার শীর্ষ কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিকভাবে এই চাঞ্চল্যকর পুনরুত্থানের বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। এই পলায়নের ঘটনায় প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হওয়ায় দায়িত্বে চরম গাফিলতির দায়ে ইতিমধ্যেই দুই পুলিশ সদস্যকে তাৎক্ষণিকভাবে ক্লোজড বা প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে।

গ্রেপ্তারকৃত আসামির পারিবারিক ও সামাজিক পরিচয়

​পুলিশের বিশেষ গোয়েন্দা সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজত থেকে সুকৌশলে পালিয়ে যাওয়া এবং পরবর্তীতে পুনরায় গ্রেপ্তার হওয়া ওই নারী আসামির নাম হাসিনা বেগম (৩৫)। তিনি মূলত মাদারীপুর পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত থানতলী আবাসিক এলাকার বাসিন্দা হবি হাওলাদারের কন্যা। পারিবারিক সূত্রে তিনি মাদারীপুর সদর উপজেলার অধীনস্থ ঝাউদি ইউনিয়নের কালাইমারা গ্রামীণ জনপদের বাসিন্দা আল-আমিনের সহধর্মিণী। তার বিরুদ্ধে এলাকায় একাধিক সমাজবিরোধী কার্যক্রমের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

আরও পড়ুন: খুলনায় ১০ম শ্রেণির ছাত্রীকে হত্যার পর বস্তাবন্দি করলেন মা-বাবা: নেপথ্যে মাদক ও পারিবারিক কলহ

যে প্রেক্ষাপটে প্রাথমিক আটক ও থানা হস্তান্তর

​ঘটনার বিবরণে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে মাদারীপুর সদর মডেল থানার আওতাধীন ইটেরপুল পুলিশ ফাঁড়ির একটি দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করে। উক্ত ফাঁড়ির দায়িত্বে থাকা উপপরিদর্শক (এসআই) মোকসেদুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানে অনৈতিক ও অসামাজিক কার্যকলাপে লিপ্ত থাকার সুনির্দিষ্ট ও প্রত্যক্ষ অভিযোগে হাসিনা বেগমকে হাতেনাতে আটক করা হয়। আটকের পর আইনি প্রক্রিয়া শুরু করার লক্ষ্যে ও নিয়মিত মামলা রুজু করার উদ্দেশ্যে ওই রাতেই তাকে ইটেরপুল ফাঁড়ি থেকে জেলা সদরের মূল মডেল থানায় স্থানান্তর করা হয়েছিল।

অবকাঠামোগত সংকট ও যেভাবে ফাঁকি দেওয়া হলো পুলিশের নিরাপত্তা

​অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাদারীপুর সদর মডেল থানার মূল প্রশাসনিক ভবনটি বর্তমানে সম্পূর্ণ নতুনভাবে নির্মাণাধীন অবস্থায় রয়েছে। এই কারণে থানার দৈনন্দিন ও দাপ্তরিক কার্যাবলী সাময়িকভাবে সচল রাখার স্বার্থে ওসির সরকারি বাসভবনের নিচতলার অংশটিকে অস্থায়ী থানা কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অস্থায়ী এই কার্যালয়ে সাধারণ বন্দিদের সুরক্ষার জন্য আধুনিক বা স্থায়ী কোনো হাজতখানা (Lock-up) নেই। আর এই কাঠামোগত দুর্বলতার সুযোগটিই গ্রহণ করেছিলেন ওই চতুর নারী আসামি।

  • অস্থায়ী বন্দিশালা: সুনির্দিষ্ট লক-আপ সুবিধা না থাকায় আটক হাসিনা বেগমকে থানার বারান্দা সংলগ্ন একটি অস্থায়ী কক্ষে বিশেষ পুলিশি নজরদারিতে রাখা হয়েছিল।
  • সুযোগ সন্ধান: রাতের গভীরতায় চারপাশ যখন নিস্তব্ধ হয়ে আসে এবং নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা প্রহরীদের মনোযোগে সামান্য বিচ্যুতি ঘটে, তখনই হাসিনা বেগম পলায়নের ছক কষেন।
  • গ্রিল কেটে চম্পট: আনুমানিক রাত দেড়টার (১:৩০ AM) দিকে কক্ষের জানালার লোহার শলাকা বা গ্রিল অত্যন্ত সুকৌশলে ও নিঃশব্দে ভেঙে ফেলেন তিনি। এরপর অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে থানা প্রাঙ্গণ থেকে দ্রুত পালিয়ে গিয়ে আত্মগোপন করেন।

প্রশাসনিক ব্যবস্থা: দায়িত্বে অবহেলায় দুই পুলিশ সদস্য ক্লোজড

​থানা প্রাঙ্গণ এবং খোদ পুলিশি হেফাজত থেকে একজন গুরুত্বপূর্ণ আসামি গ্রিল কেটে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি প্রকাশ পাওয়া মাত্রই জেলা পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের মধ্যে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়। কর্তব্যে চরম অবহেলা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা এবং গাফিলতির প্রাথমিক সত্যতা মেলায় শুক্রবার (১০ জুলাই) একটি শাস্তিমূলক আদেশ জারি করা হয়।

​উক্ত আদেশের অধীনে মাদারীপুর সদর মডেল থানায় সেই রাতে কর্মরত ডিউটি অফিসার রমজান আলী সজল এবং তার সাথে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত একজন কনস্টেবলকে অনতিবিলম্বে থানা থেকে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করা হয়। বিভাগীয় ব্যবস্থার অংশ হিসেবে তাদেরকে মাদারীপুর জেলা পুলিশ লাইন্সে বাধ্যতামূলকভাবে সংযুক্ত করা হয়েছে।

তদন্তে উচ্চপর্যায়ের ৩ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন

​নিরাপত্তার এই মারাত্মক ত্রুটির নেপথ্যে অন্য কোনো অভ্যন্তরীণ যোগসাজশ বা গভীর গাফিলতি রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে মাদারীপুরের পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান অত্যন্ত কঠোর ও জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন। তার নির্দেশে পুরো ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের স্বার্থে ৩ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

আরও পড়ুন:  সাতকানিয়ায় বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শনে ডা. শফিক: মাঠের কষ্ট কাগজে অনুধাবন অসম্ভব

​এই তদন্ত কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফারিহা রফিক ভাবনাকে। জেলা পুলিশের এই শীর্ষ কর্মকর্তাকে আগামী ৩টি কার্যদিবসের (Working Days) মধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সংশ্লিষ্টদের সাক্ষ্য গ্রহণ এবং সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটি বিশ্লেষণ করে একটি সুনির্দিষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন পুলিশ সুপারের দপ্তরে পেশ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কেরাণীগঞ্জে সাঁড়াশি অভিযান ও পুনরায় জেলহাজতে প্রেরণ

​আসামি পলায়নের পরপরই মাদারীপুর জেলা পুলিশের একাধিক গোয়েন্দা ও তল্লাশি দল তাকে পুনরায় গ্রেপ্তারের জন্য মাঠে নামে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, মোবাইল লোকেশন ট্র্যাকিং এবং নিজস্ব গোপন সোর্সের মাধ্যমে পুলিশ নিশ্চিত হয় যে, হাসিনা বেগম মাদারীপুর ছেড়ে সড়ক পথে পালিয়ে গিয়ে রাজধানী ঢাকার কেরাণীগঞ্জ এলাকার একটি আবাসিক বাসায় আত্মগোপন করে আছেন।

​এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে শুক্রবার রাতে মাদারীপুর সদর থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল ঢাকার কেরাণীগঞ্জের ওই নির্দিষ্ট আস্তানায় আকস্মিক ও সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে। পুলিশের নিখুঁত জালে অবরুদ্ধ হয়ে শেষ পর্যন্ত পুনরায় গ্রেপ্তার হন পলাতক হাসিনা বেগম। গ্রেপ্তারের পর রাতেই তাকে কড়া নিরাপত্তায় মাদারীপুরে নিয়ে আসা হয় এবং শনিবার বিকেলের দিকে বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে তাকে সুনির্দিষ্ট মামলায় মাদারীপুর জেলা কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে।

মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) চূড়ান্ত বক্তব্য

​সমগ্র আইনগত পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ ব্যবস্থার বিষয়ে মাদারীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ গণমাধ্যমকে স্পষ্টভাবে জানান:

​"পলাতক আসামিকে আমাদের বিশেষ দল অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ঢাকা থেকে পুনরায় সনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। থানা থেকে তার পলায়নের মূল কারণ ও নিরাপত্তার ত্রুটি খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে। তদন্ত কমিটির আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন জমা হওয়ার পর, দায়িত্বে অবহেলাকারী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কনস্টেবলের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক কঠোর বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"


নিউজ সূত্র: মাদারীপুর সদর মডেল থানা পুলিশ প্রশাসন।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন