ঢাকা: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জেলা চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া অঞ্চলে সাম্প্রতিক অতিবর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্টি হয়েছে এক প্রলয়ঙ্কারী বন্যা পরিস্থিতি। এই আকস্মিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে লাখো মানুষ এখন সম্পূর্ণ পানিবন্দী এবং চরম মানবিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। বন্যাকবলিত এই সমস্ত অসহায় ও বিপন্ন মানুষের দুঃখ-দুর্দশা সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করতে এবং তাদের প্রতি মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে উপদ্রুত এলাকায় ছুটে গেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের অন্যতম প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। আজ ১০ই জুলাই, শুক্রবার সকাল থেকেই তিনি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার বিভিন্ন প্রত্যন্ত ও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বন্যাকবলিত ইউনিয়নসমূহ পরিদর্শন করেন এবং দুর্গত ও সর্বস্ব হারানো মানুষের মাঝে ব্যক্তিগতভাবে ত্রাণসামগ্রী ও জরুরি নগদ অর্থ সহায়তা বিতরণ করেন।
আরও পড়ুন: বেলকুচিতে পানির লাইনে রহস্যময় গ্যাস ও আগুন: চাঞ্চল্য ও ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের প্রস্তুতি
পরিদর্শনকালে এক আবেগঘন পরিবেশে ধাবমান মানুষের উদ্দেশ্যে জামায়াত আমির অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন যে, তিনি এই মুহূর্তে দুর্গত এলাকায় কোনো প্রকার রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল বা সস্তা রাজনীতি করতে আসেননি। বরং একজন সাধারণ নাগরিক এবং মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে চরম সংকটে পড়া দেশবাসীর পাশে ভাই হিসেবে এসে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বলেন, মানুষের বাস্তব দুর্ভোগ ও জীবনসংগ্রামের প্রকৃত চিত্র কোনোদিনও কেবল ঘরের কোণে বসে কাগজে-কলমে বা ফাইলের পাতায় পড়ে পুরোপুরি অনুধাবন করা সম্ভব নয়। মাঠপর্যায়ে এসে সরাসরি ভুক্তভোগীদের চোখের পানি এবং তাদের যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখচ্ছবি না দেখলে এই তীব্র মানবিক কষ্ট অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করা যায় না।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি ও আমিরের গভীর উদ্বেগ
গত কয়েকদিনের একটানা মুষলধারে বৃষ্টিপাত এবং পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি ঢলের তীব্রতায় দক্ষিণ চট্টগ্রামের নদীগুলোর বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। গ্রামীণ রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, ফসলি জমি এবং মাছের ঘের সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এই সংকটময় পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ডা. শফিকুর রহমান জানান, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ার সর্বস্তরের মানুষ যে অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছেন, তা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক।
তিনি বন্যাকবলিত এলাকার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া সাধারণ মানুষের সাথে সরাসরি কথা বলেন, তাদের দুঃখ-দুর্দশার বিবরণ শোনেন এবং তাদের পুনর্বাসনের বিষয়ে খোঁজখবর নেন। জামায়াত আমির উল্লেখ করেন, সংবাদমাধ্যম বা দাপ্তরিক রিপোর্টে বন্যার যে চিত্র ফুটে ওঠে, বাস্তবতার ধুলোবালি ও কাদার ময়দানে দাঁড়িয়ে দেখা চিত্রটি তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি ভয়াবহ ও বেদনাদায়ক। মানুষের ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে, ঘরে একমুঠো খাবার নেই এবং বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এই অবস্থায় ঘরে বসে কেবল শোক প্রকাশ করার কোনো সুযোগ নেই, বরং সবাইকে সম্মিলিতভাবে মাঠপর্যায়ে কাজে নামতে হবে।
জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা ও রাষ্ট্রীয় তৎপরতা
বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি জানান যে, গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে চট্টগ্রামের এই ভয়াবহ ও ভয়াবহ রূপ ধারণ করা বন্যা পরিস্থিতি অত্যন্ত জোরালোভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সংসদের ফ্লোরে দুর্গত মানুষের জন্য জরুরি সহায়তার দাবি জানানো হয়।
এরই পরিপ্রক্ষিতে সরকারের পক্ষ থেকেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়েছে। সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ৩০০ ধারা অনুযায়ী সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি, উদ্ধার অভিযান এবং সরকারি ত্রাণ তৎপরতা নিয়ে একটি বিস্তারিত ও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রদান করা হয়েছে। জামায়াত আমির আশা প্রকাশ করেন যে, সংসদে এই আলোচনার পর সরকারি সাহায্য ও উদ্ধার কার্যক্রমের গতি আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
দুর্গতদের পুনর্বাসনে সরকারের প্রতি চার দফা জরুরি আহ্বান
বন্যাদুর্গত এলাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শেষে ডা. শফিকুর রহমান সরকারের প্রতি এবং স্থানীয় জেলা প্রশাসনের প্রতি অতি দ্রুত কিছু কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য জোরালো আহ্বান জানান।
প্রশাসনের উদ্দেশ্যে তাঁর প্রধান দাবি ও পরামর্শগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
- উদ্ধার কার্যক্রমের গতি বৃদ্ধি: প্রত্যন্ত ও দুর্গম যেসব অঞ্চলে এখনও হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় আটকে আছেন, সেখানে স্পিডবোট ও দক্ষ উদ্ধারকারী দলের মাধ্যমে দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে।
- পর্যাপ্ত ত্রাণ ও জরুরি চিকিৎসা: বন্যাকবলিত প্রতিটি পয়েন্টে যেন পর্যাপ্ত পরিমাণে শুকনো খাবার, চাল-ডাল এবং বিশুদ্ধ পানি পৌঁছায় তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে জরুরি মেডিকেল টিম গঠন করতে হবে।
- অগ্রাধিকারভিত্তিক বিশেষ সেবা: আশ্রয়কেন্দ্র এবং উপদ্রুত এলাকায় থাকা শিশু, গর্ভবতী নারী, প্রবীণ বা বৃদ্ধ জনগোষ্ঠী এবং গুরুতর অসুস্থ মানুষদের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিতে বিশেষ পুষ্টিকর খাদ্য, ওষুধ ও কার্যকর সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
- দীর্ঘমেয়াদী টেকসই পুনর্বাসন: বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথেই ক্ষতিগ্রস্তদের ঘরবাড়ি মেরামত, কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণ এবং সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা করে তাদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ নিশ্চিত করতে হবে।
পাহাড়ধস ও দুর্ঘটনায় নিহতদের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ
সাম্প্রতিক এই অতিবৃষ্টি ও বন্যার সমসাময়িক সময়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক পাহাড়ধস এবং নৌ ও সড়ক দুর্ঘটনায় যারা অকালে প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের স্মরণ করে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই থাবায় যারা নিজেদের আপনজনকে হারিয়েছেন, তাদের এই অপূরণীয় ক্ষতি কোনো কিছু দিয়েই পূরণ করা সম্ভব নয়।
আরও পড়ুন: জুলাই বিপ্লবের স্মৃতিচারণ: বাঁচলে গাজী মরলে শহীদ ভেবেই গুলির সামনে
তিনি নিহতদের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করেন এবং পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলার দরবারে দোয়া করেন যেন তিনি শোকসন্তপ্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে এই কঠিন বিপর্যয় ও মানসিক আঘাত সহ্য করার এবং ধৈর্য ধারণ করার তৌফিক দান করেন। জামায়াত আমির প্রতিশ্রুতি দেন যে, সরকারি সহায়তার পাশাপাশি তাদের সংগঠনের পক্ষ থেকেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে।
শীর্ষনেতৃবৃন্দের উপস্থিতি ও সমন্বিত টিম গঠন
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার এই বৃহৎ ত্রাণ বিতরণ ও মতবিনিময় কর্মসূচিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয়, মহানগর এবং জেলা পর্যায়ের একঝাঁক শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ আমিরের সাথে সার্বক্ষণিক উপস্থিত ছিলেন।
উক্ত প্রতিনিধি দলে উপস্থিত ছিলেন:
১. মোহাম্মদ শাহজাহান – অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
২. শাহজাহান চৌধুরী – সংসদীয় পার্টির সেক্রেটারি এবং সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনের জনপ্রিয় সংসদ সদস্য।
৩. নজরুল ইসলাম – আমির, চট্টগ্রাম মহানগরী শাখা।
৪. জাফর সাদেক – কেন্দ্রীয় টিম সদস্য, চট্টগ্রাম অঞ্চল।
৫. আনোয়ারুল আলম – আমির, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা শাখা।
৬. আলাউদ্দিন সিকদার – আমির, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা শাখা।
নেতৃবৃন্দ প্রত্যেকেই নিজস্ব স্তরে টিম গঠন করে সাতকানিয়ার অলিতে-গলিতে স্বশরীরে গিয়ে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানোর কাজ তদারকি করেন। সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী তাঁর নির্বাচনী এলাকার জনগণের পাশে দাঁড়ানোর জন্য কেন্দ্রীয় আমিরকে বিশেষ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন এবং স্থানীয় প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে দ্রুত বাঁধ মেরামতের আশ্বাস দেন।
সমাপনী ও মানবিক ঐক্যের আহ্বান
পরিশেষে, ডা. শফিকুর রহমান দেশের সকল বিত্তবান শ্রেণী, শিল্পপতি এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেন, দুর্যোগ কোনো রাজনৈতিক সীমানা মেনে আসে না। এটি একটি জাতীয় সংকট। তাই দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল ভেদাভেদ ভুলে এই মুহূর্তে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বন্যার্ত মানুষের পাশে এসে দাঁড়ানো প্রতিটি বিবেকবান নাগরিকের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব। জামায়াতে ইসলামী দেশের যেকোনো সংকটে জনগণের পাশে ছিল এবং আগামীতেও থাকবে। সাতকানিয়ার এই বন্যার্ত মানুষের মুখে যতদিন হাসি না ফুটবে, ততদিন তাদের পাশে থেকে পুনর্বাসন কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি তাঁর সফর সমাপ্ত করেন।
নিউজ সূত্র: সাতকানিয়ায় জামায়াতে ইসলামীর অফিশিয়াল প্রেস উইং ও স্থানীয় প্রতিনিধি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।