বেলকুচিতে পানির লাইনে রহস্যময় গ্যাস ও আগুন: চাঞ্চল্য ও ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের প্রস্তুতি

বেলকুচিতে পানির লাইনে রহস্যময় গ্যাস ও আগুন: চাঞ্চল্য ও ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের প্রস্তুতি
ছবি: সংগৃহীত
 সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি- শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

সিরাজগঞ্জ: ভূগর্ভস্থ প্রাকৃতিক সম্পদের এক নতুন সমীকরণের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এখন সিরাজগঞ্জের বেলকুচি অঞ্চল। জেলাজুড়ে এখন একটিই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু, আর তা হলো পানির পাইপলাইন বেয়ে উঠে আসা অবিকল প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো এক রহস্যময় দাহ্য পদার্থ। সিরাজগঞ্জের বেলকুচি পৌরসভা এলাকায় সদ্য স্থাপিত একটি নিরাপদ পানির পাম্পের পাইপলাইনে হঠাৎ করেই এই অবিকল গ্যাস সদৃশ উপাদানের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। এই অলৌকিক ও চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই পুরো মহকুমা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে ব্যাপক কৌতূহল, বিস্ময় এবং একই সাথে এক ধরণের অজানা আতঙ্ক বিরাজ করছে। ঘটনাটি এতটাই নাটকীয় রূপ নিয়েছে যে, এটি বর্তমানে সিরাজগঞ্জের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে আলোচনার প্রধান বিষয় বা ‘টপ অব দ্য টাউন’-এ পরিণত হয়েছে। ভূগর্ভ থেকে পানির বদলে দাহ্য গ্যাস বের হওয়ার এই ঘটনাটি কোনো সাধারণ পকেট গ্যাস নাকি কোনো বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রের আগাম বার্তা, তা নিয়ে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে বিশেষজ্ঞ মহলে।

আরও পড়ুন: অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র রুখতে পুরান ঢাকায় ওলামাদের নতুন প্ল্যাটফর্ম ‘ইত্তিফাকুল মাদারিস’ গঠন

​গত ৯ই জুলাই, বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে ঘটনাটির প্রথম সূত্রপাত ঘটে। এরপর বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে ৪টার দিকে বেলকুচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং বেলকুচি ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে উত্তরাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (NWGCL) ডিজিএম পদমর্যাদার কারিগরি প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তারা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ও প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে পাইপলাইন থেকে নির্গত পদার্থটিতে গ্যাসের অস্তিত্বের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত করেছেন। উদ্ভুত পরিস্থিতির সংবেদনশীলতা এবং যেকোনো ধরণের বড় দুর্ঘটনা এড়াতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উক্ত পানির পাম্পটির কার্যক্রম আপাদত সম্পূর্ণভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

​ঘটনার রোমাঞ্চকর সূত্রপাত: যেভাবে পানির লাইনে দাউ দাউ করে জ্বলল আগুন

​স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী, পৌরসভার কর্মচারী এবং থানা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার দুপুরে বেলকুচি থানা সংলগ্ন অত্যন্ত ব্যস্ততম ‘মাজেম মিয়ার গড়ান’ নামক এলাকায় নতুন স্থাপিত পানির পাম্পের প্রধান সরবরাহ লাইনে হঠাৎ কিছু অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়। পাম্পের সঙ্গে সংযুক্ত মাটির নিচের প্রধান পাইপলাইনটির একটি নির্দিষ্ট অংশ থেকে অনবরত বুদবুদ বা পানির ভুড়ভুড়ি উঠছিল। স্বাভাবিক পানির লাইনে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ও তীব্র বুদবুদ দেখে সেখানে উপস্থিত স্থানীয় কিছু অতিউৎসাহী যুবকের মনে সন্দেহের দানা বাঁধে।

​কৌতূহলবশত এবং পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে স্থানীয় এক বাসিন্দা একটি দিয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে ওই বুদবুদ ওঠা পানির উৎসের মুখে ধরেন। আর তা ধরার সাথে সাথেই ঘটে এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড। পানির কণা ভেদ করে তীব্র গতিতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। পানির পাইপ থেকে এভাবে আগুনের শিখা বের হতে দেখে চারপাশের মানুষের মাঝে মুহূর্তের মধ্যে হুলস্থুল পড়ে যায়। খবরটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লে শত শত উৎসুক জনতা এই বিরল ও অদ্ভুত দৃশ্যটি নিজের চোখে দেখার জন্য সেখানে ভিড় জমাতে শুরু করেন।

​পরিস্থিতি বেগতিক দেখে স্থানীয় সচেতন নাগরিকেরা তাৎক্ষণিকভাবে বেলকুচি পৌরসভা কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন। খবর পাওয়ার পরপরই পৌরসভার দায়িত্বে থাকা প্রধান প্রকৌশলী (ইঞ্জিনিয়ার) দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তিনি নিজের চোখে পানির পাইপের ভেতর থেকে অনবরত আগুন জ্বলতে দেখে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নেন এবং কালক্ষেপণ না করে উপজেলা প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসকে জরুরি বার্তা পাঠান।

​প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ ও ফায়ার সার্ভিসের নিরাপত্তা বেষ্টনী

​পানির লাইনে আগুনের খবর পাওয়া মাত্রই বেলকুচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরিন জাহান এবং বেলকুচি ফায়ার সার্ভিসের একটি চৌকস উদ্ধারকারী দল দ্রুততম সময়ের মধ্যে থানা সংলগ্ন ওই দুর্ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছায়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা প্রথমে আগুনের তীব্রতা এবং এর ছড়িয়ে পড়ার সক্ষমতা পরীক্ষা করেন। তারা চারপাশের সাধারণ জনতাকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে দিয়ে এলাকাটিকে একটি সাময়িক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় নিয়ে আসেন।

​যেহেতু স্থানটি বেলকুচি থানার অত্যন্ত কাছাকাছি এবং একটি জনবহুল এলাকা, তাই যেকোনো ধরণের বড় বিস্ফোরণ বা ভূগর্ভস্থ বিপর্যয় এড়াতে পানির পাম্পের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং পাম্পের চারপাশ সিলগালা করে দেওয়া হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে নিশ্চিত হন যে, এটি কোনো সাধারণ পানির লাইনের ত্রুটি নয়, বরং এর পেছনে নিশ্চিতভাবেই কোনো গ্যাসীয় উপাদানের প্রাকৃতিক উৎস জড়িত রয়েছে। ফলশ্রুতিতে তিনি অনতিবিলম্বে সরকারের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের আওতাধীন উত্তরাঞ্চল গ্যাস কোম্পানির বিশেষজ্ঞ দলকে তলব করেন।

​উত্তরাঞ্চল গ্যাস কোম্পানির প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ ও কারিগরি মূল্যায়ন

​উপজেলা প্রশাসনের জরুরি আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে উত্তরাঞ্চল গ্যাস কোম্পানির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) হিল্লোল বাবুর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত টিম বেলকুচির মাজেম মিয়ার গড়ান এলাকায় এসে পৌঁছায়। তারা ফায়ার সার্ভিসের সার্বিক কারিগরি সহায়তায় পানির পাইপলাইন থেকে নির্গত হওয়া গ্যাস ও বুদবুদের ওপর প্রথম দফার প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করেন।

​প্রাথমিক পরীক্ষা শেষে উত্তরাঞ্চল গ্যাস কোম্পানির ডিজিএম হিল্লোল সংবাদমাধ্যমকে জানান:

  • ​প্রাথমিকভাবে সংগৃহীত নমুনা এবং দহন ক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করে পানির লাইনে শতভাগ প্রাকৃতিক বা মিথেন গ্যাসের মতো কোনো অস্তিত্বের প্রাথমিক আলামত পাওয়া গেছে।
  • ​তবে এটি কোনো ভূগর্ভস্থ পকেট গ্যাস (সাময়িক আবদ্ধ গ্যাস) নাকি মাটির গভীরে থাকা কোনো স্থায়ী ও বিশাল বড় প্রাকৃতিক গ্যাসের খনি বা রিজার্ভার থেকে লিক হয়ে উঠে আসছে, তা এই মুহূর্তেই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
  • ​এর সুনির্দিষ্ট উৎস এবং এটি ঠিক কী ধরনের রাসায়নিক গ্যাস, তা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করতে ল্যাবরেটরি টেস্ট এবং আরও উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।

​শুক্রবারের চূড়ান্ত পরীক্ষা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘বাপেক্স’ (BAPEX) এর সম্পৃক্ততা

​কারিগরি দলটির প্রধান আরও জানান যে, এই গ্যাসীয় উপাদানের স্থায়িত্ব পরীক্ষা করার জন্য আজ ১০ই জুলাই, শুক্রবার বিকেল ঠিক ৪টার দিকে পুনরায় একটি চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ পরীক্ষা চালানো হবে। এই পরীক্ষায় দেখা হবে যে, গত ২৪ ঘণ্টায় মাটির নিচের গ্যাসের চাপ একই রকম আছে কি না এবং পানিতে এখনও আগের মতো আগুন জ্বলছে কি না।

আরও পড়ুন: কুমিল্লায় ফুটবল উন্মাদনার নির্মম পরিণতি: আর্জেন্টিনা সমর্থকদের হামলায় মিশরের সমর্থক নিহত

​ডিজিএম হিল্লোল এবং ইউএনও আফরিন জাহান উভয়েই নিশ্চিত করেছেন যে, শুক্রবার বিকালের এই দ্বিতীয় দফার পরীক্ষাতেও যদি পানির লাইনে আগুনের তীব্রতা এবং গ্যাসের নিয়মিত উপস্থিতি বজায় থাকে, তবে বিষয়টি আর স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পরবর্তী জরুরি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠান ‘বাপেক্স’ (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড)-কে অফিশিয়াল চিঠির মাধ্যমে বিষয়টি জানানো হবে এবং তাদের একটি বিশেষজ্ঞ দলকে সিরাজগঞ্জে আসার জন্য আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হবে। বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিকেরা অত্যাধুনিক সিসমিক সার্ভে ও ড্রিলিংয়ের মাধ্যমে মাটির গভীরের আসল রহস্য উদ্ঘাটন করবেন।

​পকেট গ্যাস বনাম প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র: একটি ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

​বাংলাদেশের বিভিন্ন সমতল বা নদীমাতৃক অঞ্চলে মাঝেমধ্যেই গভীর নলকূপ কিংবা পানির পাম্প বসানোর সময় এমন গ্যাস বের হওয়ার ঘটনা ঘটে থাকে। ভূবিজ্ঞানীদের মতে, মাটির নিচে বহু বছর ধরে গাছপালা, জৈব আবর্জনা বা পলিমাটি চাপা পড়ে থাকার কারণে এক ধরণের মিথেন গ্যাস তৈরি হয়, যা ‘মার্শ গ্যাস’ বা ‘পকেট গ্যাস’ নামে পরিচিত। এই ধরণের গ্যাসের স্থায়িত্ব সাধারণত খুব কম সময়ের জন্য হয় এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এর চাপ শেষ হয়ে যায়।

​তবে সিরাজগঞ্জ ও যমুনা নদীর অববাহিকা অঞ্চলটি ভূতাত্ত্বিক কাঠামোর দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও সম্ভাবনাময়। তাই বেলকুচির এই ঘটনাটিকে একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা। যদি শুক্রবারের পরীক্ষায় গ্যাসের প্রেশার বা চাপ অপরিবর্তিত থাকে, তবে ধারণা করা যেতে পারে যে মাটির গভীরের কোনো মূল গ্যাস স্তর থেকে পাইপলাইনের ফাটল দিয়ে গ্যাস উপরে উঠে আসছে। যদি সত্যিই বাপেক্সের অনুসন্ধানে এখানে কোনো বড় গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান মেলে, তবে তা সিরাজগঞ্জ তথা সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।

​এলাকাবাসীর সুরক্ষায় প্রশাসনের কঠোর নির্দেশনা

​বেলকুচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরিন জাহান ঘটনার সত্যতা ও ভয়াবহতা স্বীকার করে স্থানীয় জনগণের উদ্দেশ্যে কিছু জরুরি নির্দেশনাবলী জারি করেছেন:

  • ​সাধারণ মানুষকে কৌতূহলবশত পাম্পের আশেপাশে না যাওয়ার জন্য এবং সেখানে কোনো প্রকার দিয়াশলাই, লাইটার বা আগুন নিয়ে খেলা না করার জন্য কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
  • ​পানির পাম্পটি পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে, তাই বিকল্প উৎস থেকে পানি সংগ্রহের জন্য পৌরবাসীকে অনুরোধ করা হয়েছে।
  • ​যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য বেলকুচি থানা পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের একটি বিশেষ দল সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখছে।

​"দিগন্ত বাংলা নিউজ" মনে করে, জাতীয় সম্পদের সুরক্ষা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের এই দ্রুত উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এখন দেখার বিষয়, আজ বিকালের পরীক্ষায় বাপেক্সের আগমনী বার্তা নিশ্চিত হয় কি না। বেলকুচির মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা এই প্রাকৃতিক রহস্যের চূড়ান্ত জট খুলতে আমাদের আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে।

নিউজ সূত্র: বেলকুচি উপজেলা প্রশাসন, উত্তরাঞ্চল গ্যাস কোম্পানির কারিগরি টিম ও স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন