অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র রুখতে পুরান ঢাকায় ওলামাদের নতুন প্ল্যাটফর্ম ‘ইত্তিফাকুল মাদারিস’ গঠন

অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র রুখতে পুরান ঢাকায় ওলামাদের নতুন প্ল্যাটফর্ম ‘ইত্তিফাকুল মাদারিস’ গঠন
ছবি: সংগৃহীত
প্রতিবেদন- শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

ঢাকা: বর্তমান সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে দেশের ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা, কওমি মাদ্রাসা এবং দ্বীনি পরিমণ্ডলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার লক্ষ্যে পরিচালিত যেকোনো ধরনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার এবং সূক্ষ্ম চক্রান্ত সম্মিলিত শক্তির মাধ্যমে নস্যাৎ করা হবে। কোনো ধরনের অন্যায় আচরণ বা নেতিবাচক প্রচারণাকে আর হেলাফেলা করা হবে না, বরং ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর স্বার্থে ওলামায়ে কেরাম এখন থেকে সম্পূর্ণ সোচ্চার ভূমিকা পালন করবেন। রাজধানী ঢাকার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা পুরান ঢাকার শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরাম এবং মাদ্রাসার দায়িত্বশীল জিম্মাদারদের এক উচ্চপর্যায়ের নজিরবিহীন মতবিনিময় সভায় এই সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে। সভায় বক্তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ইসলামী শিক্ষার মূল ভিত্তি কওমি মাদ্রাসাগুলো দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করে আসছে, তাই এর বিরুদ্ধে যেকোনো চক্রান্ত রুখে দিতে ওলামা সমাজ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সজাগ ও ঐক্যবদ্ধ।

​আজ ৯ই জুলাই, বৃহস্পতিবার সকাল দশটায় পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান লালবাগ জামিয়ায় (জামিয়া শারঈয়্যাহ মালিবাগ ও লালবাগ কেল্লা সংলগ্ন দ্বীনি আঙিনা) এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী ওলামা সম্মেলন ও মতবিনিময় সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। ‘পুরান ঢাকা ইমাম ওলামা পরিষদ’-এর বিশেষ উদ্যোগে এবং ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এই সভায় পুরান ঢাকার বিভিন্ন জোন ও থানার অন্তর্গত শীর্ষস্থানীয় মাদ্রাসাসমূহের মুহতামিম, নায়েবে মুহতামিম এবং প্রধান জিম্মাদারগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন।

​সভার সভাপতিত্ব ও বর্তমান প্রেক্ষাপটের চুলচেরা বিশ্লেষণ

​গুরুত্বপূর্ণ এই ওলামা ও জিম্মাদার মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন দেশের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন ও সমাজ সংস্কারক মুফতী সাখাওয়াত হোসাইন রাজী। সভাপতির বক্তব্যে তিনি বর্তমান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা এবং আলেম-উলামাদের সামাজিক মর্যাদাকে কেন্দ্র করে চলমান নানামুখী নেতিবাচক প্রোপাগান্ডা ও উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বাস্তবমুখী বিশ্লেষণ পেশ করেন।

আরও পড়ুন: ভ্রমণ মানেই আনন্দ ও বিড়ম্বনা: প্রকৃতির সান্নিধ্যে মনস্তাত্ত্বিক মুক্তি ও জীবন দর্শন

​সভায় উপস্থিত বিভিন্ন মাদ্রাসার প্রধানগণ কওমি মাদ্রাসা, দ্বীনি শিক্ষা ও আলেম সমাজের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং বিভিন্ন স্তরে চলমান নিয়মতান্ত্রিক অপপ্রচারের গভীরতা ও এর নেপথ্য কারণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই পর্যালোচনায় ওলামায়ে কেরাম একমত হন যে, মাদ্রাসাগুলোর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা মজবুত করার পাশাপাশি বাইরের যেকোনো অন্যায্য আক্রমণের বিরুদ্ধে আইনানুগ ও নিয়মতান্ত্রিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

​'ইত্তিফাকুল মাদারিস পুরান ঢাকা' গঠন ও মূল সিদ্ধান্তসমূহ

​লালবাগ জামিয়ার এই ঐতিহাসিক মতবিনিময় সভায় উপস্থিত সকল জিম্মাদার ও ওলামায়ে কেরাম সর্বসম্মতিক্রমে এই মর্মে দৃঢ় প্রত্যয় ও মত প্রকাশ করেন যে, মাদ্রাসা ও দ্বীনি অঙ্গনের বিরুদ্ধে পরিচালিত যেকোনো অপপ্রচার, ষড়যন্ত্র বা অন্যায় আচরণ কোনো অবস্থাতেই বরদাশত করা হবে না। তবে এই প্রতিরোধ হবে সম্পূর্ণ আইনানুগ, নিয়মতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ এবং সুশৃঙ্খল। উসকানিমূলক কোনো ফাঁদে পা না দিয়ে ওলামা সমাজ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে।

​সভায় সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি এবং পারস্পরিক যোগাযোগ ও সমন্বয়কে আরও গতিশীল করতে বেশ কয়েকটি যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়:

  • আঞ্চলিক সমন্বয় প্ল্যাটফর্ম গঠন: পুরান ঢাকার সর্বস্তরের মাদ্রাসাসমূহের মধ্যে সুদৃঢ় ও কার্যকর সমন্বয় সাধনের লক্ষ্যে একটি শক্তিশালী স্থায়ী অরাজনৈতিক সাংগঠনিক প্ল্যাটফর্ম গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। উপস্থিত সকলের সহমতের ভিত্তিতে এই নতুন মোর্চা ও সমন্বয় প্ল্যাটফর্মের নামকরণ করা হয় “ইত্তিফাকুল মাদারিস পুরান ঢাকা”
  • ১৫ সদস্যবিশিষ্ট আঞ্চলিক টিম: বৃহত্তর এই সমন্বয় প্রক্রিয়াকে সুচারুভাবে পরিচালনা করতে এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুবিধার্থে ১৫ সদস্যের একটি অত্যন্ত দক্ষ ও প্রভাবশালী 'আঞ্চলিক সমন্বয় টিম' গঠন করা হয়েছে।
  • থানা ভিত্তিক উপ-কমিটি: মাঠপর্যায়ে প্রতিটি মাদ্রাসার সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রাখতে পুরান ঢাকার প্রতিটি থানার জন্য আলাদা আলাদা 'থানা ভিত্তিক সমন্বয় টিম' বা উপ-কমিটি গঠন করার সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়।
  • যোগাযোগের আধুনিকায়ন ও সহযোগিতা: মাদ্রাসাগুলোর মধ্যে কেবল সংকটকালীন সময়েই নয়, বরং সাধারণ সময়েও পারস্পরিক শিক্ষা-সংস্কৃতি, প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ, অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা তৈরি ও সার্বিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়।

​আগামী ৫ দিনের বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রাম ও পরিকল্পনা সভা

​মতবিনিময় সভায় কেবল কমিটি গঠনের মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি, বরং মাঠপর্যায়ের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বা ডেডলাইন নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন গঠিত ফোরামের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে পুরান ঢাকার অলিতে-গলিতে অবস্থিত ছোট-বড় সকল কওমি ও দ্বীনি মাদ্রাসার দায়িত্বশীলদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা হবে এবং এই সমন্বয় কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করা হবে।

আরও পড়ুন: রেমিট্যান্সে অবিশ্বাস্য গতি: মাত্র ৬ দিনেই এলো ৭০ কোটি ডলার

​এরই ধারাবাহিকতায়, আগামী মঙ্গলবার সকাল ঠিক ১০টায় ঐতিহ্যবাহী লালবাগ জামিয়া প্রাঙ্গণেই পুরান ঢাকার মাদ্রাসাসমূহের একটি অত্যন্ত বৃহৎ এবং সর্বাত্মক 'পরিকল্পনা সভা' অনুষ্ঠিত হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আগামী মঙ্গলবারের ওই বিশেষ বর্ধিত সভা থেকেই উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং ইসলামী শিক্ষার সুরক্ষায় ভবিষ্যৎ চূড়ান্ত করণীয়, রূপরেখা ও নানামুখী কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে।

​“ইত্তিফাকুল মাদারিস পুরান ঢাকা”-এর প্রধান সমন্বয়কবৃন্দ

​নতুন গঠিত এই শক্তিশালী আঞ্চলিক ধর্মীয় সমন্বয় প্ল্যাটফর্মকে গতিশীল করতে এবং ওলামা সমাজের ঐক্য ধরে রাখতে পুরান ঢাকার ৯ জন শীর্ষস্থানীয় মুহতামিম ও আলেমকে প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে।

​গুরুত্বপূর্ণ এই সমন্বয়ক প্যানেলে যারা স্থান পেয়েছেন তারা হলেন:

১. মুফতী হোসাইন সোহরাব – সম্মানিত মুহতামিম, জামিয়া শরিফিয়া আরাবিয়া, লালবাগ, ঢাকা।

২. মুফতী আব্দুল জব্বার – সম্মানিত মুহতামিম, আল-জামিয়া মাযহারুল উলূম, সিদ্দিকবাজার, ঢাকা।

৩. মুফতী তানভীর আহমদ সিদ্দিকী – সম্মানিত মুহতামিম, জামিয়া ইসলামিয়া দারুল হক, ঢাকা।

৪. মাওলানা মিজানুর রহমান – সম্মানিত মুহতামিম, মারকাযুল আবরার, পোস্তা, লালবাগ, ঢাকা।

৫. মুফতী আফজাল হোসাইন – সম্মানিত মুহতামিম, জামিয়া মুনাওয়ারা, ঢাকা।

৬. মাওলানা নাসির বিন নূর – সম্মানিত মুহতামিম, রওজাতুল উলূম মাদ্রাসা, হাজারীবাগ, ঢাকা।

৭. মুফতী আকরাম হোসাইন – সম্মানিত মুহতামিম, জামিয়াতুস সুন্নাহ, কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা।

৮. মুফতী মামুন রহমানী – সম্মানিত মুহতামিম, জামিয়া ইসলামিয়া, নবাবগঞ্জ, ঢাকা।

৯. মুফতী সাইফুল্লাহ হাবিবী – সম্মানিত মুহতামিম, জামিয়া রাব্বানিয়া দারুস সুফফাহ, হাজারীবাগ, ঢাকা।

​সমাপনী বার্তা ও ঐক্যের নতুন দিগন্ত

​জনসাধারণ ও ওলামা সমাজের উদ্দেশ্যে ফোরামের নেতৃবৃন্দ বলেন, কওমি মাদ্রাসাগুলো এদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং নৈতিক সমাজ গঠনে সবসময় অতন্দ্র প্রহরীর মতো কাজ করেছে। একটি মহল রাজনৈতিক বা সামাজিক ফায়দা হাসিলের জন্য বারবার এই পবিত্র অঙ্গনকে টার্গেট করে প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর অপচেষ্টা চালায়। পুরান ঢাকার ওলামা সমাজের এই ঐতিহাসিক ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস ও 'ইত্তিফাকুল মাদারিস পুরান ঢাকা' গঠনের সিদ্ধান্ত ঢাকার গণ্ডি পেরিয়ে দেশজুড়ে কওমি অঙ্গনের সুরক্ষায় একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন সাধারণ ইসলামপ্রিয় জনতা। আগামী মঙ্গলবারের সভার দিকে এখন তাকিয়ে আছেন পুরান ঢাকার সর্বস্তরের তৌহিদী জনতা ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা।

নিউজ সূত্র: পুরান ঢাকা ইমাম ওলামা পরিষদের অফিশিয়াল প্রেস রিলিজ।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন