রেমিট্যান্সে অবিশ্বাস্য গতি: মাত্র ৬ দিনেই এলো ৭০ কোটি ডলার

রেমিট্যান্সে অবিশ্বাস্য গতি: মাত্র ৬ দিনেই এলো ৭০ কোটি ডলার
ছবি: সংগৃহীত
 অর্থনীতি ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

​বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্বস্তির সুবাতাস বইয়ে দিয়ে নতুন অর্থবছরের শুরুতেই প্রবাসী আয়ে বা রেমিট্যান্সে বড় ধরনের সুসংবাদ এসেছে। চলতি জুলাই মাসের প্রথম ছয় দিনেই বৈধ পথে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের জোয়ার লক্ষ্য করা গেছে। এই সামান্য সময়ে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন প্রায় ৭০ কোটি মার্কিন ডলার, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ডলার সংকট কাটাতে বিশাল ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা।

​গত মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিশিয়াল মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান দেশের এই ইতিবাচক অর্থনৈতিক সূচকটি গণমাধ্যমের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসীদের এই রেমিট্যান্স পাঠানোর ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি মাস শেষে প্রবাসী আয়ের পরিমাণ এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।

​জুলাইয়ের শুরুতেই রেমিট্যান্সে বিশাল লাফ

​বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি জুলাই মাসের প্রথম ৬ দিনে (১ জুলাই থেকে ৬ জুলাই) দেশের প্রবাসী কর্মীরা মোট ৬৯ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে পাঠিয়েছেন। এই হিসাব অনুযায়ী, চলতি মাসের প্রতিদিন গড়ে দেশে এসেছে ১১ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স।

​গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবারের চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। ২০২৪ সালের জুলাই মাসের প্রথম ৬ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৪২ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার। অর্থাৎ, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি হয়েছে চোখ ধাঁধানো। ব্যাংকিং খাতের আধুনিকায়ন, ডলারের ক্রলিং পেগ পদ্ধতি এবং হুন্ডি প্রতিরোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর অবস্থানের কারণেই প্রবাসীরা এখন বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠাতে বেশি উৎসাহিত হচ্ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

​বিদায়ী অর্থবছরে (২০২৫-২৬) রেমিট্যান্সের ঐতিহাসিক মহিরুহ

​সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরটি বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের ইতিহাসে এক স্বর্ণালী অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই পুরো অর্থবছর জুড়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীরা রেকর্ড পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠিয়েছেন।

আরও পড়ুন: সুন্দরবনের মধু আহরণে বড় ধস: ৫ বছরে উৎপাদন কমেছে ৬০%, ঝুঁকিতে জিআই পণ্যের গৌরব

​কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চূড়ান্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩ হাজার ৫৫৬ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার (যা প্রায় ৩৫.৫৬ বিলিয়ন ডলার)। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে যেকোনো একটি নির্দিষ্ট অর্থবছরে অর্জিত সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়ের রেকর্ড। এর আগে কোনো অর্থবছরেই এত বিশাল অংকের রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হয়নি। এই প্রবাহ দেশের অভ্যন্তরীণ ডলারের বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে।

​জুন মাসের খাতভিত্তিক রেমিট্যান্সের চালচিত্র

​চলতি বছরের সদ্য সমাপ্ত জুন মাসেও দেশে রেমিট্যান্সের ধারা যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। জুন মাসে সব মিলিয়ে দেশে এসেছে ২৮১ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। এই বিশাল অংকের অর্থ দেশের বিভিন্ন ধরনের ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে প্রবেশ করেছে। জুন মাসের ব্যাংকভিত্তিক রেমিট্যান্সের একটি সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান নিচে দেওয়া হলো:

  • রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকসমূহ: দেশের সরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে জুন মাসে এসেছে ৫১ কোটি ৫১ লাখ মার্কিন ডলার।
  • বিশেষায়িত ব্যাংকসমূহ: একমাত্র বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর (যেমন: বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক) মাধ্যমে এসেছে ৪৪ কোটি ১৬ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার।
  • বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহ: বরাবরের মতোই রেমিট্যান্স আহরণে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে বেসরকারি ব্যাংকগুলো। জুনে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ১৮৫ কোটি ৩৫ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার।
  • বিদেশি খাতের ব্যাংকসমূহ: বাংলাদেশে მოქმედ বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে তুলনামূলক কম, যার পরিমাণ ৬৬ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলার।

​বিগত মাসগুলোর রেমিট্যান্স প্রবাহের বিস্তারিত পর্যালোচনা

​২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষার্ধ এবং নতুন অর্থবছরের শুরু—সব মিলিয়ে গত এক বছর ধরে রেমিট্যান্সের গ্রাফ ছিল ঊর্ধ্বমুখী। নিচে বিগত মাসগুলোর প্রবাসী আয়ের একটি ধারাবাহিক বিবরণ তুলে ধরা হলো, যা দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার চিত্র স্পষ্ট করে:

​মে ২০২৬: ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ

​গত মে মাসে দেশে প্রবাসী আয়ের ঢল নেমেছিল। ওই মাসে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন মোট ৩৪২ কোটি ৫০ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। এটি দেশের ইতিহাসে কোনো একটি একক মাসে আসা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রবাসী আয় হিসেবে রেকর্ডভুক্ত হয়েছে। ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে প্রবাসীরা পরিবার-পরিজনের কাছে বেশি অর্থ পাঠানোয় এই বিপুল অঙ্কের রেমিট্যান্স দেশে আসে।

​এপ্রিল ২০২৬: ধারাবাহিকতা বজায়

​এপ্রিল মাসেও দেশের প্রবাসী আয়ের গতি সচল ছিল। এই মাসে প্রবাসীদের হাত ধরে দেশে এসেছে ৩১২ কোটি ৭৩ লাখ মার্কিন ডলার।

​মার্চ ২০২৬: সর্বকালের সব রেকর্ড ভঙ্গ

​চলতি বছরের মার্চ মাসটি ছিল বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল মাস। এই এক মাসে দেশে এসেছে রেকর্ডসংখ্যক ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে যেকোনো একটি একক মাসে আসা সর্বকালের সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়। পবিত্র রমজান ও ঈদুল ফিতরের আগে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের কারণেই এই অভাবনীয় মাইলফলক স্পর্শ করা সম্ভব হয়েছিল।

​জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি ২০২৬: ৩০০ কোটির গণ্ডি পার

​বছরের শুরু থেকেই রেমিট্যান্সের গতি ছিল দারুণ। জানুয়ারি মাসে দেশে এসেছিল ৩১৭ কোটি ৯ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার। এর পরের মাস ফেব্রুয়ারিতেও সেই ধারা বজায় ছিল এবং দেশে আসে ৩০২ কোটি ৭ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স।

আরও পড়ুন: কুষ্টিয়ায় তরুণ ফুটবল সমর্থকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার: এলাকায় শোকের ছায়া

​গত বছরের শেষ প্রান্তিকের (২০২৫) রেমিট্যান্স চিত্র

​২০২৫ সালের শেষদিকের মাসগুলোতেও রেমিট্যান্সের গতি দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রেখেছিল।

  • ডিসেম্বর ২০২৫: বছরের শেষ মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩২২ কোটি ৬৭ লাখ মার্কিন ডলার।
  • নভেম্বর ২০২৫: এই মাসে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ২৮৮ কোটি ৯৫ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার।
  • অক্টোবর ২০২৫: অক্টোবর মাসে দেশে আসা প্রবাসী আয়ের পরিমাণ ছিল ২৫৬ কোটি ৩৪ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার।
  • সেপ্টেম্বর ২০২৫: এই মাসে দেশে এসেছিল ২৬৮ কোটি ৫৮ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স।
  • আগস্ট ২০২৫: আগস্ট মাসে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ২৪২ কোটি ১৮ লাখ ৯০ হাজার মার্কিন ডলার।
  • জুলাই ২০২৫: গত অর্থবছরের প্রথম মাস অর্থাৎ জুলাইয়ে দেশে এসেছিল ২৪৭ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার।

​দেশের অর্থনীতিতে এই রেমিট্যান্সের প্রভাব ও গুরুত্ব

​টানা কয়েক মাস ধরে রেমিট্যান্সের এই বিশাল ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক একটি বার্তা। সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রেমিট্যান্সের এই ধারাবাহিক বৃদ্ধির ফলে কয়েকটি সরাসরি সুফল পাচ্ছে বাংলাদেশ:

​১. রিজার্ভের ওপর চাপ হ্রাস: দীর্ঘদিন ধরে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে যে শঙ্কা ছিল, রেমিট্যান্সের এই জোয়ারের কারণে তা অনেকটাই কেটে যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গ্রস রিজার্ভ আবার শক্তিশালী অবস্থানে ফিরতে শুরু করেছে।

২. ডলারের বাজার স্থিতিশীলতা: বাজারে মার্কিন ডলারের তীব্র সংকট কাটতে শুরু করেছে। এর ফলে আমদানিকারকরা প্রয়োজনীয় এলসি (Letter of Credit) বা ঋণপত্র সহজে খুলতে পারছেন।

৩. গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হওয়া: প্রবাসীদের পাঠানো এই অর্থ সরাসরি দেশের তৃণমূল বা গ্রামীণ অর্থনীতিতে পৌঁছায়। ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে এবং অভ্যন্তরীণ বাজার চাঙ্গা হচ্ছে।

​বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রবাসীদের জন্য ব্যাংকিং সেবা আরও সহজ করা, রেমিট্যান্সের ওপর সরকারি প্রণোদনা প্রদান এবং হুন্ডির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রাখার কারণেই এই অভাবনীয় সাফল্য এসেছে। আগামী দিনগুলোতেও রেমিট্যান্সের এই ইতিবাচক ধারা বজায় থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক প্রেস বিজ্ঞপ্তি।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন