অপরাধ ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
কুমিল্লা প্রতিনিধি: চলমান ২০২৬ ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে দেশের মাঠপর্যায়ের ফুটবল সমর্থকদের মাঝে উন্মাদনা ও আবেগ যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই এই ফুটবলকে কেন্দ্র করে কুমিল্লায় ঘটে গেছে এক চরম অনাকাঙ্ক্ষিত ও লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। ফুটবল খেলায় দল সমর্থন নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যকার তীব্র বাগবিতণ্ডা ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার একপর্যায়ে প্রতিপক্ষের বর্বরোচিত ও নির্মম হামলায় মো. শরিফুল ইসলাম নামের ৩২ বছর বয়সী এক হতভাগ্য যুবক নিহত হয়েছেন।
আরও পড়ুন: ফিফা ও আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ মিশর কোচের, বিশ্বকাপ বয়কটের ঘোষণা
গতকাল মঙ্গলবার (৭ জুলাই, ২০২৬) রাতে কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের অন্তর্গত ধনপুর এলাকায় এই মর্মান্তিক ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনাটি ঘটে। নিহত শরিফুল ইসলাম চলমান বিশ্বকাপে উত্তর আফ্রিকার দেশ মিশরের একজন কট্টর ও একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
নিহতের বিস্তারিত পরিচয় ও ঘটনার সূত্রপাত
পুলিশ ও স্থানীয় পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ফুটবল উন্মাদনার বলি হওয়া শরিফুল ইসলাম মূলত নীলফামারী জেলার জলঢাকা উপজেলার উত্তর চেরাংগা এলাকার বাসিন্দা মতিউর রহমানের ছেলে। তবে জীবিকার তাগিদে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কুমিল্লায় অবস্থান করছিলেন এবং কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের মঠপুস্করনী এলাকায় সপরিবারে একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করে আসছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাতে যখন বিশ্বমঞ্চে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং মিশরের মধ্যকার হাইভোল্টেজ নকআউট ম্যাচটি চলছিল, তখন ধনপুর এলাকার একটি স্থানীয় পয়েন্টে বসে বেশ কয়েকজন যুবক একসাথে খেলা দেখছিলেন। ম্যাচ চলাকালীন সময়ে খেলার জয়-পরাজয় ও পারফরম্যান্স নিয়ে আর্জেন্টিনা সমর্থক এবং মিশরের সমর্থক শরিফুল ইসলামের মধ্যে হঠাৎ করেই তীব্র কথা-কাটাকাটি ও বাকযুদ্ধ শুরু হয়। খেলা দেখার সেই উত্তেজনা একপর্যায়ে ব্যক্তিগত আক্রোশে রূপ নেয় এবং দুই পক্ষের সমর্থকরা লাঠিসোঁটা নিয়ে মারাত্মক সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এ সময় খেলা দেখতে আসা স্থানীয় বাসিন্দা ও আর্জেন্টিনার সক্রিয় সমর্থক হিসেবে পরিচিত বাবু এবং মাইন উদ্দিন মালু নামের দুই ব্যক্তি আকস্মিকভাবে শরিফুল ইসলামের মাথায় শক্ত কাঠের লাঠি বা ভারী বস্তু দিয়ে প্রচণ্ড আঘাত করেন বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে।
চিকিৎসকের ঘোষণা ও এলাকায় তীব্র ক্ষোভ
মাথায় মারাত্মক আঘাত পাওয়ার পরপরই শরিফুল ইসলাম রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং অচেতন হয়ে যান। এই অবস্থা দেখে হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে স্থানীয় আশপাশের বাসিন্দারা অত্যন্ত গুরুতর ও আশঙ্কাজনক অবস্থায় শরিফুলকে উদ্ধার করে দ্রুত কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
আরও পড়ুন: সাভারে এনসিপির সমাবেশে হামলার তীব্র নিন্দা জামায়াতের, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
খেলার মতো একটি বিনোদনমূলক বিষয়কে কেন্দ্র করে এমন একটি তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো এলাকায় তীব্র শোকের ছায়া নেমে আসে এবং স্থানীয়দের মাঝে চরম ক্ষোভ ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা হান্নান গণমাধ্যমকে বলেন:
"একটি আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে এমন তুচ্ছ ও সামান্য বিরোধের জেরে এই ধরণের নির্মম হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমরাও তো আজীবন খেলা দেখে আসছি, খেলায় হার-জিত থাকবেই, তাই বলে খুনাখুনি করতে হবে! আমরা অবিলম্বে এই ঘটনার সাথে জড়িত বাবু ও মাইন উদ্দিন মালুসহ সকল অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।"
আইনি পদক্ষেপ ও পুলিশের বক্তব্য
হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার সাথে সাথেই কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল কুমেক হাসপাতাল ও ঘটনার মূল উৎপত্তিস্থল ধনপুর এলাকা পরিদর্শন করেছে। পুলিশ সদস্যরা নিহতের মরদেহের প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত শেষে মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত হওয়ার জন্য মরদেহটি হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে।
পুরো ঘটনা প্রসঙ্গে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার দিগন্ত বাংলা নিউজকে জানান, "ফুটবল ম্যাচ দেখাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মারামারিতে এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। খবর পাওয়ার পর থেকেই ঘটনার সঙ্গে জড়িত অভিযুক্ত বাবু ও মাইন উদ্দিন মালুসহ অন্যান্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের একাধিক টিম মাঠে নেমেছে এবং বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরসহ প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে।"
সংবাদ সূত্র: কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ ও কুমেক হাসপাতাল।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।