সাভারে এনসিপির সমাবেশে হামলার তীব্র নিন্দা জামায়াতের, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

সাভারে এনসিপির সমাবেশে হামলার তীব্র নিন্দা জামায়াতের, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
ছবি: সংগৃহীত

রাজনীতি ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

ঢাকা: ঢাকার অদূরে শিল্পাঞ্চল সাভারে ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’র (এনসিপি) পদযাত্রা পরবর্তী এক শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাবেশে আকস্মিক ও বর্বরোচিত ককটেল হামলার ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। এই ন্যাক্কারজনক ও কাপুরুষোচিত হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির পক্ষ থেকে অনতিবিলম্বে একটি নিরেট ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এই হামলার নেপথ্যে থাকা প্রকৃত অপরাধী ও মূল কুশীলবদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানানো হয়েছে। একই সাথে, দেশের অন্যতম একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে আয়োজিত এমন একটি জনাকীর্ণ সমাবেশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারায় স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

আজ মঙ্গলবার (৭ জুলাই, ২০২৬) সংবাদ মাধ্যমে পাঠানো এক বিশেষ ও আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার সাভারের এই সন্ত্রাসী হামলার বিষয়ে নিজেদের দলীয় অবস্থান স্পষ্ট করেন এবং প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করেন।

আরও পড়ুন: সাভারে এনসিপির জনসভায় দুর্বৃত্তদের ককটেল হামলা: আহত একাধিক নেতাকর্মী

সহিংসতার তীব্র নিন্দা ও আহতদের প্রতি গভীর সমবেদনা

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার তাঁর বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, গত ৬ জুলাই (সোমবার) রাতে সাভারের তারাপুর ঈদগাহ মাঠ এলাকায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পদযাত্রা পরবর্তী সাধারণ সমাবেশে যে ধরণের বর্বরোচিত ও কাপুরুষোচিত ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে, তা অত্যন্ত নিন্দনীয়, গভীর উদ্বেগজনক এবং সভ্য সমাজের জন্য চরম ন্যাক্কারজনক একটি অধ্যায়। এই অনাকাঙ্ক্ষিত বোমাবাজির ঘটনায় দলটির বেশ কয়েকজন সাধারণ নেতাকর্মী ও সমর্থক স্প্লিন্টারের আঘাতে রক্তাক্ত ও মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন।

বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন:

"সাভারের এই সন্ত্রাসী হামলায় ইতোমধ্যে এনসিপির চারজন কর্মীর অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক এবং তারা বর্তমানে হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আমি জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এই বর্বরোচিত ও সন্ত্রাসী হামলার তীব্রতম নিন্দা, ধিক্কার ও ক্ষোভ প্রকাশ করছি। একই সাথে, হামলায় আহত হওয়া সমস্ত নেতাকর্মীদের দ্রুত ও সম্পূর্ণ রোগমুক্তি ও আরোগ্য কামনা করছি এবং তাদের পরিবার ও দলের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।"

প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ

বিবৃতিতে জামায়াতের শীর্ষ এই নেতা সাভারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি এবং এই হামলার পেছনে গভীর কোনো প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক যোগসাজশ রয়েছে কিনা, তা নিয়ে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, একটি নিবন্ধিত বা স্বীকৃত রাজনৈতিক দলের সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচিতে এ ধরনের অতর্কিত হামলা চালানো দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটি চরম ও উদ্বেগজনক চিত্র ফুটিয়ে তোলে।

প্রশাসনের রহস্যজনক আচরণ এবং গাফিলতির চিত্র তুলে ধরতে তিনি বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পয়েন্ট উল্লেখ করেন:

  • আকস্মিক বিদ্যুৎ বিভ্রাট: সমাবেশের কার্যক্রম শুরু হওয়ার ঠিক প্রাক্কালে হঠাৎ করে পুরো এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া বা লোডশেডিং হওয়া কোনো সাধারণ বা স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে না।

  • পরিকল্পিত ককটেল বিস্ফোরণ: বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার ঠিক পরপরই ঘুটঘুটে অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে মূল মঞ্চের ঠিক সামনে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো প্রমাণ করে যে, এটি একটি পূর্বপরিকল্পিত ব্লুপ্রিন্ট বা নীল নকশার অংশ ছিল।

  • নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থতা: জাতীয় সংসদের বর্তমান বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের মতো একজন ভিআইপি এবং গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিত্বের উপস্থিতিতে আয়োজিত একটি জনসভায় পর্যাপ্ত পুলিশি নিরাপত্তা দিতে না পারা স্থানীয় সিভিল ও পুলিশ প্রশাসনের একটি স্পষ্ট ও ক্ষমার অযোগ্য ব্যর্থতা।

মিয়া গোলাম পরওয়ার সরাসরি অভিযোগের আঙুল তুলে বলেন, সমাবেশের শুরুতে হুট করে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার ঘটনা দেশবাসীর মনে এই সন্দেহের উদ্রেক করে যে—এই ঘটনার পেছনে স্থানীয় প্রশাসনের কোনো একটি অংশের বা বিদ্যুৎ বিভাগের প্রচ্ছন্ন যোগসাজশ বা পরোক্ষ সহযোগিতা থাকতে পারে। দেশের সাধারণ মানুষ মনে করে, প্রশাসনের ভেতর লুকিয়ে থাকা অশুভ শক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সবুজ সংকেত ও সহায়তার কারণেই সন্ত্রাসীরা এত বড় একটি জনসভায় প্রকাশ্যে বোমাবাজি করার মতো দুঃসাহস দেখাতে পেরেছে।

নতুন বাংলাদেশের মূল শর্ত ও স্থিতিশীলতার আহ্বান

সাবেক এই সংসদ সদস্য তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকেই দেশ গড়ার নতুন রূপরেখা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা যে একটি সুস্থ, গণতান্ত্রিক, মানবিক ও বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখছি, তার প্রথম এবং প্রধান শর্তই হলো ভিন্নমতের প্রতি পরম শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা এবং দেশের সকল রাজনৈতিক দলের জন্য একটি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও অবাধ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা। রাজনীতিতে কোনো ধরণের সহিংসতা, নৈরাজ্য, বোমাবাজি ও খুনের কালো পরিকল্পনা কোনোভাবেই প্রগতিশীল সমাজের জন্য কাম্য বা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আরও পড়ুন: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে হালাল উপার্জনের আধুনিক উপায়সমূহ

তিনি দেশের সমস্ত মহলকে উদ্দেশ্য করে এক কঠোর রাজনৈতিক হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইতিহাস সাক্ষী রয়েছে—অতীতে এ দেশে যারা ককটেল, বারুদ, বন্দুক ও বোমাবাজির নোংরা রাজনীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছে কিংবা এর মাধ্যমে ফায়দা লোটার চেষ্টা করেছে, তাদের চূড়ান্ত পরিণতি কখনোই শুভ বা কল্যাণকর হয়নি। সুতরাং, দমন-পীড়নের সেই পুরনো অন্ধকার অধ্যায়কে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না।

বিবৃতির শেষাংশে অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার সরকারের নীতিনির্ধারক ও প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়ে বলেন, কোনো রকম রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব বা অনুরাগ-বিরাগের বশবর্তী না হয়ে, সাভারের এই হামলার ঘটনার একটি আন্তর্জাতিক মানের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও জুডিশিয়াল তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। সমাবেশস্থলে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পেছনের প্রকৃত রহস্য এবং এই কাপুরুষোচিত হামলার নেপথ্যে থাকা গডফাদার বা কুশীলবদের অনতিবিলম্বে খুঁজে বের করতে হবে। প্রশাসনের সহায়তায় হামলা হয়েছে বলে যে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, তা খতিয়ে দেখে প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা দেশে দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং সাধারণ জনগণের জানমালের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে আরও কঠোর, নিরপেক্ষ ও কার্যকরী ভূমিকা পালন করার জোরালো আহ্বান জানাচ্ছি।

সংবাদ সূত্র: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে প্রেরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তি।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন