অপরাধ ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি: মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় চার বছর বয়সী এক অবুঝ ও নিষ্পাপ শিশুকে পিচ ফলের লোভ দেখিয়ে নির্মমভাবে যৌন নির্যাতন করার এক ভয়াবহ ও ন্যাক্কারজনক অভিযোগ উঠেছে ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধের বিরুদ্ধে। এই অমানবিক ও স্পর্শকাতর ঘটনায় ভুক্তভোগী শিশুটির পরিবার বাদী হয়ে গতকাল ৬ জুলাই (সোমবার) দিবাগত গভীর রাতে ঘিওর থানায় একটি সুনির্দিষ্ট ও লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। মানিকগঞ্জের ঘিওর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মীর মাহবুবুর রহমান আজ মঙ্গলবার গণমাধ্যমকে এই অভিযোগ প্রাপ্তির বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
আরও পড়ুন: সাভারে এনসিপির সমাবেশে হামলার তীব্র নিন্দা জামায়াতের, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
লোমহর্ষক ও জঘন্য এই ঘটনার প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম আব্দুল গনি (৬০)। সে ঘিওর উপজেলার বানিয়াজুরী ইউনিয়নের অন্তর্গত উত্তর তরা এলাকার মৃত গেতা মিয়ার ছেলে বলে স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।
বিদ্যালয়ের বারান্দা থেকে শিশু উধাও ও ঘটনার বিবরণ
পারিবারিক ও স্থানীয় বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, গত ২৬ জুন মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার উত্তর তরা এলাকায় এই নির্মম ও দুঃখজনক ঘটনাটি ঘটেছিল। লোকলজ্জা এবং সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে ভুক্তভোগী শিশুটির মা ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে জানান, ওই দিন তিনি উত্তর তরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া তার বড় মেয়েকে নিয়ে স্কুলে গিয়েছিলেন। সেই সময় তার সাথে ছিল তার ৪ বছর বয়সী ছোট মেয়েটিও। বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর পর তিনি তার ছোট মেয়েকে সাময়িকভাবে ভবনের বারান্দায় বসিয়ে রেখে বড় মেয়ের পড়াশোনার বিষয়ে কথা বলতে শ্রেণিকক্ষের ভেতরে যান।
শিক্ষকের সাথে কথা বলা শেষে তিনি যখন শ্রেণিকক্ষ থেকে বের হন, তখন বারান্দার নির্দিষ্ট স্থানে ছোট মেয়েকে আর দেখতে পাননি। আচমকা মেয়েকে না পেয়ে তিনি চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং চারদিকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। দীর্ঘক্ষণ খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে বড় মেয়ে হঠাৎ দেখতে পায় যে, একই এলাকার বাসিন্দা অভিযুক্ত আব্দুল গনি মিয়ার কোলে বসে আছে তার ছোট বোন এবং সেই সময় শিশুটির হাতে একটি তাজা পিচ ফল শোভা পাচ্ছিল।
অসুস্থতা ও হাসপাতালে যৌন নির্যাতনের প্রমাণ
ভুক্তভোগীর পরিবার আরও জানায়, ওই দিন স্কুল ছুটির পর বড় ও ছোট মেয়েকে সাথে নিয়ে মা যখন বাড়ি ফিরে আসেন, তার কিছুক্ষণ পর থেকেই ৪ বছরের শিশুটি তীব্রভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে শিশুটির স্বাভাবিক প্রস্রাব ও পায়খানা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় এবং সে ব্যথায় ও যন্ত্রণায় কুঁকড়ে কাঁদতে শুরু করে। মেয়ের শারীরিক পরিস্থিতি দ্রুত আশঙ্কাজনক ও অবনতির দিকে যেতে দেখে পরদিন সকালে পরিবারের সদস্যরা তাকে দ্রুত মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিয়ে যান এবং সেখানে তাকে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা বিভিন্ন শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পরীক্ষা শেষে ভুক্তভোগী পরিবারকে স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, শিশুটি অত্যন্ত নির্মম ও পাশবিক যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা ও সচেতন মহলের প্রতিরোধ
এদিকে, এই ন্যাক্কারজনক ও স্পর্শকাতর ঘটনাটি এলাকায় জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় সমাজের একটি প্রভাবশালী ও স্বার্থান্বেষী মহল পুরো বিষয়টি সামাজিকভাবে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য ভুক্তভোগী পরিবারকে নানাভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করে। তবে ঘটনার তীব্র নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা এবং সামাজিক অবক্ষয় অনুধাবন করে উত্তর তরা এলাকার সচেতন নাগরিক, যুবক ও সমাজসেবীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
আরও পড়ুন: কুষ্টিয়ায় তরুণ ফুটবল সমর্থকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার: এলাকায় শোকের ছায়া
এলাকার সচেতন মহলের সুদৃঢ় অবস্থানের কারণে অপরাধীর পক্ষে নেওয়া সেই অশুভ চক্রটির সমস্ত অপচেষ্টা ও সালিশির নামে ধামাচাপা দেওয়ার নাটক সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয় এবং পুরো ঘটনাটি প্রকাশ্য রূপ নেয়। বর্তমানে এই পাশবিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘিওর উপজেলার সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ, অসন্তোষ ও চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয় জনতা অবিলম্বে এই ধর্ষক ও লম্পট বৃদ্ধের দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছেন।
এই বিষয়ে স্থানীয় বানিয়াজুরী ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. সাজ্জাদ হোসেন স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের জানান:
"আমি ঘটনাটি সামাজিকভাবে ও লোকমুখে শুনেছি। তবে ভুক্তভোগী শিশুটির মা-বাবাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমার সুনির্দিষ্ট বক্তব্য হলো—এই ধরণের জঘন্য অপরাধের সাথে জড়িত অপরাধী যেই হোক না কেন, তাকে অনতিবিলম্বে আইনের আওতায় এনে কঠিন ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অপরাধ করার সাহস না পায়।"
অন্যদিকে, পুরো ঘটনা প্রসঙ্গে ঘিওর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মীর মাহবুবুর রহমান বলেন, "ভুক্তভোগী শিশুটির পরিবারের পক্ষ থেকে আমরা একটি লিখিত অভিযোগ হাতে পেয়েছি। যেহেতু বিষয়টি শিশু নির্যাতন এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল, তাই পুলিশ প্রশাসন একে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে তদন্ত কাজ শুরু করেছে। প্রাথমিক তদন্ত ও সত্যতা সাপেক্ষে অপরাধী আব্দুল গনির বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় কঠোর আইনগত ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অপরাধীকে গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।"
সংক্ষিপ্ত সংবাদ সূত্র: মানিকগঞ্জ জেলা পুলিশ ও ভুক্তভোগী পরিবার।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।