খেলাধুলা ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
স্পোর্টস ডেস্ক: ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের শেষ ষোলোর মঞ্চে এক অবিশ্বাস্য, রোমহর্ষক ও মহানাটকীয় ম্যাচ উপভোগ করেছে ফুটবল বিশ্ব। তবে মাঠের সেই তুমুল লড়াইকে ছাপিয়ে এখন ফুটবল দুনিয়ায় তোলপাড় সৃষ্টি করেছে ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলন। রাউন্ড অব ১৬-এর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জীবন-মরণ ম্যাচে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হয়েছিল উত্তর আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী দল মিশর। মাঠে দুর্দান্ত নৈপুণ্য প্রদর্শন করে একপর্যায়ে ২-০ গোলে এগিয়ে গিয়েও শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার অতিমানবীয় প্রত্যাবর্তনের কাছে ৩-২ ব্যবধানে হেরে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেছে মিশর।
ম্যাচের একবারে শেষ মুহূর্তে এসে মাত্র ১৩ মিনিট ১৫ সেকেন্ডের এক অবিশ্বাস্য ঝড়ে টানা তিনটি গোল করে কোয়ার্টার ফাইনাল বা শেষ আটের টিকিট নিশ্চিত করে লিওনেল মেসির দল। তবে এই নাটকীয় পরাজয়কে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না মিশরের প্রধান কোচ হোসাম হাসান। ম্যাচ শেষে আয়োজিত অফিশিয়াল সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা (FIFA) এবং আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ম্যাচ কারচুপির এক মারাত্মক ও বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
ফিফার বাণিজ্যিক স্বার্থ ও মেসিকে টিকিয়ে রাখার তত্ত্ব
সংবাদ সম্মেলনে ক্ষোভে ফেটে পড়া মিশরীয় কোচ হোসাম হাসান সরাসরি অভিযোগ করে বলেন যে—এই ম্যাচটি কোনো স্বাভাবিক ফুটবল ম্যাচ ছিল না; বরং এটি ছিল সম্পূর্ণভাবে একটি সুপরিকল্পিত কারচুপির শিকার। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা তাদের নিজস্ব ব্যবসায়িক স্বার্থ, স্পন্সরশিপ এবং মিলিয়ন ডলারের রেভিনিউ বা মুনাফা সচল রাখার উদ্দেশ্যে লিওনেল মেসি এবং আর্জেন্টিনাকে যেকোনো মূল্যে এই বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে টিকিয়ে রাখতে চায়।
ফিফার তীব্র সমালোচনা করে হোসাম হাসান ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন:
"নিজেদের বিলিয়ন ডলারের ব্যবসার স্বার্থ সুরক্ষায় ফিফা চায় আর্জেন্টিনা ও লিওনেল মেসি যেন টুর্নামেন্টের শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে। যদি তারা রেফারি ও ব্যাকস্টেজ দিয়ে আগে থেকেই আর্জেন্টিনার জয় সুনিশ্চিত করে রাখতে চায়, তবে আমাদের মতো অন্য দেশগুলোকে এই বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করার জন্য আমন্ত্রণ জানানোর কী দরকার ছিল? এটি ফুটবল সংস্কৃতির জন্য এক লজ্জাজনক অধ্যায়।"
তিনি আরও যোগ করেন যে—পুরো ম্যাচজুড়ে তাঁর দল আর্জেন্টিনার চেয়ে অনেক বেশি আক্রমণাত্মক ও ভালো ফুটবল উপহার দিয়েছে। পুরো বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ টেলিভিশনের পর্দায় এই ম্যাচের রেফারিংয়ের নগ্ন রূপ দেখেছে। ফুটবল আজ মিশরের প্রতি বিন্দুমাত্র ন্যায্য বা সুবিচার করেনি বলে মনে করেন তিনি।
বিতর্কিত রেফারিং ও বাতিল গোলের বিবরণ
ম্যাচ পরিচালনাকারী রেফারিদের পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নিজের তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করার সময় হোসাম হাসান বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ও বিতর্কিত ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেন:
বৈধ গোল বাতিল: দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরু হওয়ার ঠিক পরপরই মিশরের তারকা ফুটবলার জিকোর করা একটি দুর্দান্ত গোল সম্পূর্ণ অন্যায় ও অন্যায্যভাবে বাতিল করে দেওয়া হয়। অথচ রিপ্লেতে দেখা গেছে সেটি শতভাগ একটি বৈধ গোল ছিল।
পেনাল্টি না দেওয়া: ম্যাচের শেষ দিকে যখন মিশর সমতায় ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে লড়ছিল, তখন আর্জেন্টিনার ডি-বক্সের ভেতরে তাদের একজন খেলোয়াড়কে অবৈধভাবে বাধা দেওয়া হয়। এটি অত্যন্ত পরিষ্কার একটি পেনাল্টি পাওয়ার মতো ফাউল হলেও রেফারি বা ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR) তা সম্পূর্ণ এড়িয়ে যান।
মিশরীয় কোচের দাবি, জিকোর সেই বৈধ গোলটি যদি বাতিল করা না হতো এবং শেষ মুহূর্তের সেই নিশ্চিত পেনাল্টিটি যদি রেফারি তাদের পক্ষে দিতেন, তবে ম্যাচের ফলাফল সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত।
আরও পড়ুন: অক্টোবরে শুরু হচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন: রোডম্যাপ চূড়ান্ত করছে ইসি
প্রতিবাদের মুখে বিশ্বকাপের বাকি ম্যাচ বয়কটের ঘোষণা
সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে এসে আন্তর্জাতিক ফুটবলের এই সর্বোচ্চ আসরে চলমান রেফারিং ও ফিফার পক্ষপাতমূলক আচরণের কঠোর প্রতিবাদের অংশ হিসেবে এক নজিরবিহীন ঘোষণা দেন হোসাম হাসান। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, তিনি এই ২০২৬ বিশ্বকাপের বাকি থাকা অন্য কোনো ম্যাচ আর সশরীরে বা টেলিভিশনের পর্দায় উপভোগ করবেন না।
নিজের শিষ্যদের নিয়ে গর্ব প্রকাশ করে তিনি বলেন, "আমি আমার বীর খেলোয়াড়দের ম্যাচ শেষে ড্রেসিংরুমে বলেছি যে—যদি ফুটবলের মাঠে শতভাগ সততা ও ন্যায্যতা বজায় থাকত, তবে আমরা আজ শুধু আর্জেন্টিনা নয়, বিশ্বের যেকোনো এক নম্বর ও শক্তিশালী ফুটবল দলের বিপক্ষেও বুক চিতিয়ে লড়াই করে জয় ছিনিয়ে আনতে পারতাম।"
তবে মাঠের বাইরে মিশর কোচের তোলা এই ধরণের গুরুতর ও স্পর্শকাতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিশ্ব ফুটবলের গভর্নিং বডি ফিফা কিংবা উক্ত ম্যাচের ম্যাচ অফিসিয়ালদের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত তাৎক্ষণিক কোনো অফিশিয়াল প্রতিক্রিয়া বা মন্তব্য পাওয়া যায়নি। এই ম্যাচ ও সংবাদ সম্মেলনের পর ফুটবল বিশ্বে রেফারিংয়ের মান নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধে উঠেছে।
সংক্ষিপ্ত সংবাদ সূত্র: আন্তর্জাতিক ক্রীড়া মাধ্যম গোল ডটকম ও ফিফা প্রেস মিট।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।