আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
তেহরান, ইরান: মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এবং ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সামরিক দ্বৈরথ এবার এক চরম বিপজ্জনক ও সংঘাতময় রূপ ধারণ করেছে। নিজেদের আকাশসীমা সুরক্ষায় এক নজিরবিহীন ও কঠোর পদক্ষেপের অংশ হিসেবে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও হাই-টেক ‘এমকিউ-৯’ (MQ-9 Reaper) ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করেছে ইরানের প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী।
আজ বুধবার (৮ জুলাই, ২০২৬) পারস্য উপসাগরের উপকূলবর্তী ইরানের ঐতিহাসিক বুশেহর (Bushehr) শহরের স্ট্র্যাটেজিক আকাশসীমা থেকে আনুমানিক ৩৫ মিলিয়ন বা ৩ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার মূল্যের এই চালকবিহীন গোয়েন্দা ও যুদ্ধবিমানটি সফলভাবে ধ্বংস করে ইরানের এলিট ফোর্স ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)। আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের হিসাব মতে ও বর্তমান বাজারের বাংলাদেশি মুদ্রায় ধ্বংস হওয়া এই ঘাতক মার্কিন ড্রোনের বাজারমূল্য প্রায় ৪৩২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এই চাঞ্চল্যকর আকাশযুদ্ধের ঘটনার পর মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে নতুন করে সামরিক উত্তেজনার পারদ চরমে পৌঁছেছে।
লঙ্ঘিত আকাশসীমা ও আইআরজিসি’র আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নিখুঁত নিশানা
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-এর কেন্দ্রীয় মুখপত্র হোসেইন মহবি আজ তেহরানে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে এই সফল সামরিক অপারেশনের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি তাঁর বিবৃতিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দাবি করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর চালকবিহীন এই বিশেষ ড্রোনটি আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল আইন সম্পূর্ণরূপে অমান্য করে ইরানের ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে বুশেহর শহরের আকাশসীমায় অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করে।
আরও পড়ুন: ফিফার বড় শাস্তি: বিশ্বকাপ চলাকালে বরখাস্ত যুক্তরাষ্ট্রের দুই শীর্ষ কর্মকর্তা
ইরানি রাডারে অনুপ্রবেশের বিষয়টি ধরা পড়ার সাথে সাথেই আইআরজিসি’র বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (Air Defense System) অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। কোনো প্রকার সময় নষ্ট না করে বাহিনীর নিখুঁত আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যে ড্রোনটিকে সরাসরি মাঝ-আকাশেই আঘাত করা হয় এবং নিমিষেই তা ভূপাতিত করতে সক্ষম হয় ইরানি সেনারা। ইরানের পক্ষ থেকে ওয়াশিংটনকে উদ্দেশ্য করে কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে যে—ভবিষ্যতেও যদি তাদের ভূখণ্ড বা আকাশসীমা লঙ্ঘনের মতো দুঃসাহস দেখানো হয়, তবে তার পরিণতি আরও ভয়াবহ হবে।
কেন এত দামি এই এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন?
আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিজ্ঞান ও সামরিক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন জেনারেল অ্যাটমিক্স কোম্পানির তৈরি এই ‘এমকিউ-৯ রিপার’ (MQ-9 Reaper) ড্রোনটি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম আধুনিক, নিখুঁত ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে সুপরিচিত। এই ড্রোনের অবিশ্বাস্য মূল্য ও খরচের পেছনে বেশ কিছু প্রযুক্তিগত কারণ রয়েছে:
মৌলিক ড্রোনের উৎপাদন খরচ: একটি একদম সাধারণ বা বেসিক কাঠামোর এমকিউ-৯ ড্রোনের কেবল মূল বডি বা কাঠামোর সাধারণ উৎপাদন খরচই প্রায় ১৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৯০ কোটি টাকার কাছাকাছি।
অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন: যখন এই সাধারণ ড্রোনে আমেরিকার অত্যন্ত গোপনীয় ও আধুনিক ‘মাল্টি-স্পেক্ট্রাল টার্গেটিং সিস্টেম’, হাই-রেজোলিউশন থার্মাল ক্যামেরা, জ্যামিং প্রতিরোধী শক্তিশালী থ্রি-ডি রাডার এবং দূরপাল্লার স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন গিয়ার যুক্ত করা হয়, তখন এর কার্যক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়।
হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্রের শক্তি: শুধু গোয়েন্দাগিরিই নয়, এই ড্রোন আকাশ থেকে মাটিতে নিখুঁত হামলা চালানোর জন্য ‘হেলফায়ার’ (Hellfire)-এর মতো অত্যাধুনিক লেজার গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র বহন করে। ফলে সব ধরণের আধুনিক মারণাস্ত্র ও সেন্সর প্যাকসহ একটি সম্পূর্ণ কার্যকরী ও মিশন-রেডি ড্রোনের প্রকৃত বাজারমূল্য অনায়াসেই ৩০ থেকে ৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৩৫০ থেকে ৪৩২ কোটি টাকা) গিয়ে দাঁড়ায়।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের গবেষণা থেকে জানা যায়, বিশেষ বিশেষ মিশন বা হাই-এন্ড ট্র্যাকিং ও ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার প্রযুক্তিসহ সাজানো কিছু বিশেষ সংস্করণের ড্রোন তৈরিতে সর্বোচ্চ ৫০ থেকে ৬৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৬১৭ থেকে ৭৯১ কোটি টাকা) পর্যন্ত বিশাল অর্থ ব্যয় হতে পারে। সাধারণত মার্কিন বিমান বাহিনী এই অত্যাধুনিক ড্রোনগুলো কেবল এককভাবে কেনে না; বরং এর সাথে গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন, চালকদের বিশেষ অপারেটিং সিস্টেম এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন স্যাটেলাইট লিঙ্কের পুরো সেটসহ ব্যাচ বা প্যাকেজ আকারে ক্রয় করে থাকে। এর ফলে সামগ্রিক ড্রোন সিস্টেমের পেছনে মার্কিন কোষাগার থেকে বিপুল পরিমাণ ডলার ব্যয় করতে হয়, যার একটি ইউনিট আজ ইরানের নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে পারস্য উপসাগরে ধূলিসাৎ হয়ে গেল।
আরও পড়ুন: সিংগাইরে সেনাবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন মহড়ায় আকস্মিক পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ
বুশেহর শহরটি ইরানের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। কারণ এখানেই রয়েছে ইরানের একমাত্র সক্রিয় পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ফলে এই অঞ্চলের আকাশে মার্কিন ড্রোনের এই ধরণের গোয়েন্দা তৎপরতা এবং তাকে ইরানের সরাসরি গুলি করে নামানোর ঘটনাকে সাধারণ কোনো ঘটনা হিসেবে দেখছেন না আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। এই ঘটনার পর পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনী এবং ইরানি নৌবাহিনীর মধ্যে সম্ভাব্য সশস্ত্র সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থানরত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতেও বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে বলে বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন এখনো এই ঘটনার বিষয়ে তাদের আনুষ্ঠানিক ও চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়া না জানালেও, ওয়াশিংটনের একটি অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে যে তারা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে। এই সামরিক সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামও হুট করে বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। এখন দেখার বিষয়—নিজেদের ৪৩২ কোটি টাকার এই অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র ধ্বংসের জবাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, নাকি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করে।
সংবাদ সূত্র: আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল-জাজিরা ও আইআরজিসি প্রেস রিলিজ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।