খেলাধুলা ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
স্পোর্টস ডেস্ক: উত্তর আমেরিকায় চলমান ‘ফিফা বিশ্বযজ্ঞ ২০২৬’ এর নকআউট পর্বের চরম উত্তেজনার মাঝেই বড় ধরনের শাস্তিমূলক পদক্ষেপের মুখে পড়েছে আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় ফুটবল দল। টুর্নামেন্টের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাউন্ড অব ১৬ বা শেষ ষোলোর ম্যাচে ইউরোপের শক্তিশালী দল বেলজিয়ামের মুখোমুখি হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে মার্কিন শিবিরের দুই হেভিওয়েট ও প্রভাবশালী কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা (FIFA)। ফুটবলের বৈশ্বিক মহামঞ্চে শৃঙ্খলা ও নিয়মকানুনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতেই ফিফার পক্ষ থেকে এই আকস্মিক ও কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
আরও পড়ুন: সলঙ্গায় ভাড়া বাসায় গোপন আস্তানা: সংঘবদ্ধ নারী ছিনতাইকারী চক্রের ১১ সদস্য গ্রেপ্তার
ফিফার এই আকস্মিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আওতায় পড়া মার্কিন দুই কর্মকর্তা হলেন—যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলের বর্তমান সফল ম্যানেজার স্যাম জাপাটকা এবং ইউএস সকার ফেডারেশনের (US Soccer Federation) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বিষয়ক সহসভাপতি ফ্র্যাঙ্ক প্যানেল।
ফিফার শাস্তিমূলক তালিকা থেকে ফাঁস হওয়া তথ্য
মার্কিন ফুটবলের এই শীর্ষ দুই প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তার বরখাস্ত হওয়ার চাঞ্চল্যকর বিষয়টি প্রথম প্রকাশ্যে আসে যখন ফিফা তাদের অফিশিয়াল ‘ডিসিপ্লিনারি প্রিভিউ’ বা শৃঙ্খলামূলক শাস্তির হালনাগাদ তথ্য তালিকা প্রকাশ করে। তবে বিশ্ব ফুটবলের গভর্নিং বডি ফিফা এখন পর্যন্ত এই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নেওয়া এমন চূড়ান্ত ও কঠোর ব্যবস্থার পেছনের সুনির্দিষ্ট বা আসল কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমের কাছে খোলসা করেনি।
তবে বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, গ্রুপ পর্বে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের আগের ম্যাচটি শেষ হওয়ার পর ফিফার অত্যন্ত কঠোর ও সংবেদনশীল ‘ম্যাচ প্রোটোকল’ চরমভাবে লঙ্ঘন করেছিলেন এই দুই কর্মকর্তা। অভিযোগ রয়েছে, তারা ম্যাচ কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া স্টেডিয়ামের নির্ধারিত সীমাবদ্ধ বা সংরক্ষিত উচ্চ নিরাপত্তা বলয়ে (Restricted Area) প্রবেশ করেছিলেন। আর এই অমার্জনীয় সাংগঠনিক ভুলের কারণেই টুর্নামেন্টের মাঝপথেই তাদের ওপর ফিফার নিষেধাজ্ঞার খড়্গ নেমে আসে।
বালোগুন বিতর্ক ও ইউএস সকার ফেডারেশনের ব্যাখ্যা
আন্তর্জাতিক ফুটবল বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশের মতে, এই নাটকীয় ঘটনার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের তারকা ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনকে (Folarin Balogun) কেন্দ্র করে সৃষ্টি হওয়া সাম্প্রতিক বিতর্কের একটি গভীর সংযোগ থাকতে পারে। উল্লেখ্য, বসনিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে সরাসরি লাল কার্ড দেখার পর মাঠ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন বালোগুন। তবে ফিফার নিয়মনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ম্যাচ শেষে তিনি মাঠে প্রবেশ করেন এবং সতীর্থদের সাথে বিজয় উল্লাসে মেতে ওঠেন, যা ফিফার আচরণবিধির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ধারণা করা হচ্ছে, দলের ম্যানেজার ও নিরাপত্তা প্রধান হিসেবে বালোগুনকে এই নিয়মবহির্ভূত কাজে বাধা না দেওয়ার খেসারত দিতে হচ্ছে এই দুই কর্মকর্তাকে।
অবশ্য এই বিষয়ে ইউএস সকার ফেডারেশন এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে বিষয়টি কিছুটা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। মার্কিন সকার ফেডারেশনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে—এই দুই কর্মকর্তার সাময়িক বরখাস্তের ঘটনার সঙ্গে ফরোয়ার্ড বালোগুনের ওপর থাকা ম্যাচ নিষেধাজ্ঞা কিংবা বেলজিয়ামের বিপক্ষে তাকে একাদশে খেলানোর বা না খেলানোর কোনো ধরনের আইনি সম্পর্ক নেই।
বরখাস্তের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও লজ্জাজনক সত্যটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করলেও এর নেপথ্য কারণ নিয়ে মার্কিন ফুটবল ফেডারেশন বিস্তারিত বা খোলামেলা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তাদের সাধারণ ভাষ্য, এটি যেহেতু টুর্নামেন্ট চলাকালীন ঘটনা, তাই বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে ফিফার আইনি এখতিয়ারভুক্ত এবং তারা ফিফার সিদ্ধান্তকে সম্মান জানায়। অন্যদিকে, ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটিও এই স্পর্শকাতর ইস্যুটি নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রেস রিলিজ বা পূর্ণাঙ্গ বিবৃতি প্রদান করেনি।
আরও পড়ুন: এআই চিপের অভাবনীয় জোয়ার: মুনাফায় রেকর্ড গড়ল প্রযুক্তি জায়ান্ট স্যামসাং
অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের প্রোফাইল ও বিশ্বকাপ থেকে বিদায়
যে দুই মার্কিন কর্মকর্তার ওপর ফিফা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তারা দুজনেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে অত্যন্ত অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত:
স্যাম জাপাটকা: তিনি ২০১৫ সাল থেকে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে ইউএস সকার ফেডারেশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক উইঙে যুক্ত রয়েছেন। পরবর্তীতে তাঁর কাজের দক্ষতার কারণে ২০২০ সাল থেকে তিনি মার্কিন পুরুষ জাতীয় ফুটবল দলের প্রধান ম্যানেজারের মতো হাই-প্রোফাইল দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
ফ্র্যাঙ্ক প্যানেল: তিনি দলের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার প্রধান নিয়ন্ত্রক ছিলেন। মার্কিন ফুটবলে যোগ দেওয়ার আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থা ‘সিক্রেট সার্ভিস’ (Secret Service) এবং গোয়েন্দা সংস্থা ‘সিআইএ’ (CIA)-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর কাউন্টার-টেররিজম পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
বিশ্বকাপের নকআউটের মতো মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে বেলজিয়ামের মুখোমুখি হওয়ার ঠিক আগে মাঠের বাইরে এমন বড় ধরনের প্রশাসনিক ধাক্কা ও বিশৃঙ্খলা মার্কিন দলের ওপর চরম মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেছিল। যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে মাঠের পারফরম্যান্সেও। নকআউটের সেই বাঁচা-মরার লড়াইয়ে বেলজিয়ামের কাছে ৪-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে লজ্জাজনকভাবে বিদায় নেয় স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র। দলটির এই ভরাডুবির পর ডাগআউটে এবং ব্যাকস্টেজ ম্যানেজমেন্টে এই দুই অভিজ্ঞ কর্মকর্তার অনুপস্থিতি নিয়ে বর্তমানে মার্কিন ফুটবল মহলে ও সমর্থকদের মাঝে তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। অনেক ফুটবল বিশ্লেষক ফিফার এই তাৎক্ষণিক ও একতরফা সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন এবং বিষয়টিকে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থার নিয়ম প্রয়োগের ক্ষেত্রে এক ধরণের পক্ষপাতমূলক বা অসঙ্গতিপূর্ণ আচরণের উদাহরণ হিসেবে অভিহিত করছেন।
সংক্ষিপ্ত সংবাদ সূত্র: আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেডারেশন (ফিফা) ডিসিপ্লিনারি রিপোর্ট।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।